পরিযায়ী পিকাসো

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

পোস্টবক্স। ফেইসবুকের একটি জনপ্রিয় গ্রুপ। এবার প্রাণের বাংলার সঙ্গে তারা গাঁটছড়া বাঁধলেন। প্রাণের বাংলার নিয়মিত বিভাগের সঙ্গে এখন থাকছে  পোস্টবক্স-এর রকমারী বিভাগ। আপনারা লেখা পাঠান পোস্টবক্স-এ। ওখান থেকেই বাছাইকৃত লেখা নিয়েই হচ্ছে আমাদের এই আয়োজন। আপনারা আমাদের সঙ্গে আছেন। থাকুন পোস্টবক্স-এর সঙ্গেও।

মৌসুমী দাশগুপ্তা

লোকটাকে আমি মুখ চেনা চিনি। কার পার্কে তার আর আমার গাড়িটা পাশাপাশি থাকে, সে হিসেবে তাকে আমার car neighbour বলা যেতে পারে। ভাগ্যিস গাড়িদের এখনও মানসম্মান বোধ তৈরি হয়নি, নাহলে তার Porsche convertible কিছুতেই আমার আমার টোল পড়া Picasso গাড়ির পাশে থাকতে চাইতো না। তা হোক, আমার তাতে তেমন হেলদোল নেই। আমার গাড়িটা আমি শুধু ‘পিকাসো’ নামটার জন্যেই কিনেছিলাম, এখন মায়া পড়ে গেছে, টোলটাল খেলেও বুড়ো বেতো ঘোড়াটির মত আমার সাথী হয়ে আছে।

তাছাড়া, এদেশে সংসদের চিফ হুইপ বাইসাইকেল চালিয়ে সংসদে আসে আর নিকম্মা লোকে সরকারি বেনিফিটে BMW হাঁকায়। আমার রুমানিয়ান সহকর্মী বলে এদেশ নাকি কম্যুনিস্ট আমলের রুমানিয়ার চেয়েও বেশি স্যোশালিস্ট। বাহন দিয়ে লোক বিচার সচরাচর হয় না তাই।

যা হোক, গাড়ির চেয়ে লোকটাকে আমার বরাবরই বেশি ইন্টারেস্টিং মনে হয়। একগাল চাপদাঁড়িতে তার বয়স বোঝা মুশকিল, সঙ্গে চোখ আড়াল করা চশমা। হালকা পাতলা দোহারা গড়নের লোকটি গাড়ি পার্ক করেই সঙ্গে সঙ্গে চলে যায় না, বেশ কিছুক্ষণ গাড়িতে বসে থেকে তারপর নেমে বেশ হেলতে দুলতে যায়। যেন তার কোন তাড়া নেই, যেন সে এখন কাজে নয়, বরং হাঁটতে বেরোবে।

হঠাৎ এক ঘোলা, ঝাপসা সকালে দেখি সে আকাশের দিকে ফোনটা তাক করে দাঁড়িয়ে। আকাশে একগাদা ধূসর মেঘ ছাড়া দেখার মত কিচ্ছু নেই। মনে মনে ভাবছি, নিশ্চয়ই মাথায় ছিট, তখনই সে ঘুরে দাঁড়িয়ে আমাকে জিজ্ঞেস করলো, “বলো তো ওই কোণায় মেঘের নীচে ওটা সূর্য, না কি চাঁদ!” আমি একটু বিরক্ত হয়েই বললাম, “এই সকাল নয়টায়, এমন মেঘলা আকাশে চাঁদ দেখবে কেমন করে! ওটা সূর্য!” সে মাথা নেড়ে বললো, “ইশ! সূর্য! কী অবস্থা সূর্যটার! সূর্য বলে মনে হয়?” তারপর নিজের মত রওনা দিলো। আকাশের দিকে তাকিয়ে আমারও সূর্যটার জন্যে মায়া হলো খুব, ঠিক যেন আমার বাবার মতো, কাল আর জরার ভার ঠেলে সরিয়ে আগের মত স্বাধীন জীবনযাপনের অদম্য আকাঙ্ক্ষা যেন তার।

পরদিন থেকে লোকটার সঙ্গে হালকা মাথা নাড়ার সম্পর্ক তৈরি হলো, আরও কিছুদিন গেলে টুকটাক কথার, আরও পরে নিবিড় আবেগের। প্রথম প্রথম আমার খুব অপরাধবোধ হতো কেন যেন, মনে হতো কাজটা ঠিক হচ্ছে না। আসলে ছোটবেলা থেকেই আমরা সম্পর্কগুলোকে নিয়মের ভিতরে রাখতে শিখে গেছি, বেহিসাবি সম্পর্ক তাই এই মধ্য বয়সেও অপরাধী করে রাখে।

আমাদের বেড়ে ওঠা একদম আলাদা পরিবেশে। সে ধনী পিতামাতার ঘরে রাজসুখে বড় হয়েছে, একমাত্র আদরের দুলাল, কিন্তু বড়ই নিঃসঙ্গ ছেলেবেলা। আমরা অনেকগুলো ভাইবোন হুটোপুটি করে ধূলোকাদায় বেড়ে উঠেছি, জাগতিক সম্পদ বেশি কিছু ছিলো না, কিন্তু মধুর একটা শৈশব ছিলো। তার ছোটবেলায় নিজস্ব এক বাচ্চা ঘোড়া ছিলো, আমার ছিলো বাবার হাতে বানানো কাগজের নৌকো। তার এখনও নিজের টুসিটার প্লেন আর তিনটা দামি মডেলের গাড়ি, আমার ওই এক টোল পড়া পিকাসো।

এর মাঝে সে স্বীকার করেছে, গাড়ি পার্ক করে বসে থাকাটা ছিলো তার আমাকে দেখার ছল, মেঘের আড়ালে চাঁদ সূর্যের তফাৎ খুঁজতে যাওয়াটাও কথা বলার অজুহাত, পরিচিত হবার সূত্র। আমি রাগ করতে গিয়ে হেসে ফেলেছি। কে একজন যেন বলেছিলেন, পৃথিবীতে আর কোন নতুন গল্পের ছক বাকি নেই, সব ছকের গল্প বলা হয়ে গেছে। এও তাই ছকে বাঁধা গল্পই, এক নারীকে কাছে টানার জন্যে এক পুরুষের চিরকালীন ছল। আমিও কি চিরকালীন নারীর মতই সব বুঝেও না বোঝার ছলে তাকে প্রশ্রয় দিই নি!


আমাদের বৈপরীত্যই আমাদের আকর্ষণকে বাঁচিয়ে রাখে। আমার মন দিয়ে কাজ করার অভ্যেসটা তার কাছে অদ্ভুত, কারণ সে জানে না পরিযায়ী পাখিদের ডানায় কতটা জোর থাকতে হয়! তারা পাড়ি দিয়ে আসে কত নোনা জলের হ্রদ, কত মরুভূমির মরীচিকা, তাদের স্বপ্নের পথে বাঁধা হয়ে থাকে কত বুক চিতোনো গন্ধমাদন পর্বত! আবার আমার কাছে তার হেলদোল খাওয়া জীবনটা অদ্ভুত, এত সুযোগ, এত সম্ভাবনা নিয়ে সূচনা হলে মানুষ কী আগে বাড়ার আগ্রহটাই হারিয়ে ফেলে!

সে আমাকে স্কি শেখায়, আমি তাকে রঙ তুলিতে আবোলতাবোল আঁচড়ের সুখ। সে আমাকে জাজ মিউজিক এর সৌন্দর্য বোঝানোর চেষ্টা করে, আমি তাকে অপরিণত অনুবাদে শোনাই, “nor riches, neither fame, not even the luxuries, it’s only the innermost mysteries of us, wonders of us, that flows in our veins, making us weary…” (“অর্থ নয়, কীর্তি নয়, স্বচ্ছলতা নয়, আরও এক বিপন্ন বিস্ময়, আমাদের অন্তর্গত রক্তে খেলা করে, আমাদের ক্লান্ত করে…”)।

আমাদের দিন কাটতে থাকে পারস্পরিক আবিষ্কারের সুখে, প্রায় প্রতিটি নাটকের দ্বিতীয় বা তৃতীয় অঙ্কের মতই। অথচ আমাদের আশেপাশে তখন সংঘাত দানা বাঁধছে। মানুষ জীবটা বড়ই একঘেয়ে, একঘেয়ে তার ইতিহাসও। ঘুরে ফিরে কখনও বিশ্বমানবতা ফ্যাশনেবল হয়, কখনও জাতীয়তাবাদ, কখনও বা অসহিষ্ণু অন্ধতা। আমাদের ভাগ্যক্রমে আমরা অসহিষ্ণু অন্ধতার চক্রাবর্তে এসে পড়েছি। যে ছোট্ট শহরটিতে আমি গত পনের বছর নির্বিঘ্নে বাস করেছি, যে শহরের প্রায় প্রতিটি মুখ, প্রতিটি ঝরা পাতা আর প্রতিটি নতুন কুঁড়ির সঙ্গে আমার পরিচয় ছিলো, সে শহর হঠাৎ করেই খুব অচেনা হয়ে উঠতে থাকে।

এক রাতে কারা যেন পিকাসোকে ভেঙ্গে রেখে যায়। আমার মন বলে, এ শহর পরিযায়ী পাখির জন্যে শীতল থেকে শীতলতর হয়ে উঠছে, এবার তার উড়াল দেবার পালা। কিন্তু সে মানতে চায় না। তার শেকড় এখানে, সে পরিযায়ী নয়, সে জানে না লঘুত্বের অপমান, শঙ্কা আর আতংক। সে তার আপন আকাশে তার দু সিটার প্লেন নিয়ে ঘুরে বেড়াতে ভালবাসে, তার আপন ভূমিতে নি:শঙ্ক নির্ভরতায় সে তার Porsche থেকে নেমে হেলেদুলে এগিয়ে যায়। সে ছোট্ট ডানায় স্বপ্ন পুরে উড়তে শেখেনি কখনও, জানেনি নতুন ভূমিতে আবাস তৈরির কষ্ট আর আনন্দ।

আমাকে ধরে রাখার অদম্য আগ্রহে সে এক সকালে চমৎকার গন্ধের এক মগ কফির সঙ্গে পিরিচে একটি শিশিরভেজা গোলাপ আর একটা নতুন গাড়ির চাবি নিয়ে এসে আমার ঘুম ভাঙ্গায়। ধোঁয়া ওঠা কফির ওপারে তার ঝাপসা হয়ে আসা মুখে তাকিয়ে আমি ভাবতে থাকি গল্পের পরবর্তী ছক।

ছবি: গুগল

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]