পাওয়া, না-পাওয়া নিয়ে মাথাব্যথা ছিলনা রিনুর

কলকাতা থেকে রিনির ফোন। রিনি মানে বাচিক শিল্পী রিনি বিশ্বাস। প্রাণের বাংলার জন্য ধারাবাহিক ভাবে লিখতে চাচ্ছেন ওর ছেলেবেলার গল্প, বেড়ে ওঠার গল্প। এক কথায় রাজি আমরা। সামনের দিনে মিষ্টি সব লেখার স্বাদ পাবেন প্রাণের বাংলার পাঠকরা। সেইসঙ্গে তো অবশ্যই থাকবে রিনির শহর কলকাতার ভিন্ন কৌণিকের ছবি, থাকবে অন্যরকম কিছু মানুষের গল্প। এখন থেকে প্রাণের বাংলার ‘নির্বাচিত’ বিভাগে নিয়মিত ছাপা হবে ‘আলোক রেখার মতো’ এই ধারাবাহিকটি। আশা করছি আপনাদের ভালো লাগবে – সম্পাদক (প্রাণের বাংলা)

রিনি বিশ্বাস

(কলকাতা থেকে): এক অদ্ভুত রোগ হয়েছে আজকাল; গতকাল কি কি হল সঠিক মনে পড়েনা, অথচ সেই কবেকার ছোটবেলার কতছবি আজও হুবহু চোখে ভেসে ওঠে! সেই কুট্টিবেলা থেকে-পেট্রোলের গন্ধ কোন রকমে রিনুর নাকে গেলেই চিত্তির; গা গুলিয়ে ‘ওয়্যাক’ হয়ে যাবেই! তাহলে কি বাড়ি থেকে বেরোনো রিনুর বন্ধ ছিল একেবারে?! ঠিক তা নয়, এই সমস্যার সমাধানও বের হয়… মাসে এক বা দুবার রিনু যায় ঠাকুমার কাছে আর দিম্মা-দাদুমণির কাছে; মামাবাড়ি যেতে বাস বা ট্যাক্সিতে উঠতে হয়না, যাওয়া যায় দিব্যি মজা করে, ট্রামে চড়ে.. চারু মার্কেট মানে ঠাকুমার কাছে যাওয়ার উপায়টা ছিল আরো মজার… রিক্সা করে… দূরত্ব যে কতটা, তা বড় হবার পর রিনু বুঝতে পারে! এবং অতটা দূরত্ব রিক্সা করে যাওয়া যে বেশ দুঃসাহসিক ছিল সেটা বুঝতেও বেগ পেতে হয়না! মিনিট চল্লিশ থেকে ঘন্টাখানেক – হাওয়া খেতে খেতে, মা-বাবাইয়ের কোলে বসে-রিনু যায় ঠাকুমার বাড়ি। সেখানে এরপর আসে এক নতুন সদস্য-তার কাকিমা..

পাঁচবছরের জন্মদিনে ‘রিনু’

সোনাকাকার বিয়ের খুব বাদামী হয়ে যাওয়া একটা ছবি এখনও রিনু দেখতে পায়….ট্যাক্সি না গাড়ি সেটা মনে পড়েনা, কিন্তু নতুন কাকিমা কাঁদতে কাঁদতে প্রথমবার শ্বশুরবাড়ি আসার সময়-হারিয়ে ফেলে তার চোখের জল মোছার রুমালটা… বোধহয় একপ্রস্থ খোঁজাখুঁজি হয়েছিল, নাহলে কেন এখনও মনে পড়ে ছবিটা; ভালোই হয়েছিল ওই রুমাল হারিয়ে গিয়ে, ভালোবাসার সংসারে আর কখনো কাকিমাকে চোখের জল মুছতে হয়নি তাই…. ভালোবাসার কথা-প্রেমের কথা উঠলেই মা আজও সোনাকাকা-কাকিমার কথা বলে .. দাদুমণি-দিম্মার কাছে মানে মামাবাড়ি ছিল রিনুর আরেকটা বেড়াতে যাওয়ার জায়গা.. কখনো সে থেকেও যেত সেখানে; ভোরবেলা দাদুমণির হাত ধরে কালীঘাট পার্কে হাঁটতে বেরোনোর ফিকে হয়ে আসা উজ্জ্বল একটা ছবি রিনুর মনে এখনও আছে; দাদুমণি ছিলেন সুঠাম-দীর্ঘদেহী-ঋজু পুরুষ; টানটান হয়ে বসে স্নান করতেন ঠান্ডা ড্রামের জল দিয়ে আর বলতেন ‘গঙ্গা গঙ্গা’… কি করে যেন এই ‘গঙ্গা গঙ্গা’ রিনুও অবচেতনে শিখে নিয়েছিল তখনই; পরে রিনুর সদ্যোজাত পুত্রর মাথায় জল ঢালতে ঢালতে এই দুটো শব্দই চলে আসতো তার কি অনায়াসে… মামাবাড়িতে রিনুর একটা দিদিভাই আর একটা দাদামণি আছে; দিদিভাই এর থেকে দাদামণির সঙ্গেই রিনুর ভাব বেশি; আব্দারও…বয়সে অনেকটা বড় দাদামণির কাছে ‘রিনু’ ছিল ‘মিনি’….বাবার বাড়ি আর মায়ের বাড়ি, দুবাড়িতেই রিনু তখন সব্বার ছোট; তাই আদরও বেশি; মা-বাবার সঙ্গে কারুর বাড়ি গেলে তাদেরকে চা বিস্কিট দেওয়া হয়, রিনুর জন্য আসে কাপে করে জল আর বিস্কিট। বড়দের মত সেও ডুবিয়ে ডুবিয়ে বিস্কিট খায়, তবে চায়ে নয়, জলে…. বাবাইয়ের একবার জন্ডিস হল; মশারির মধ্যে একলা ঘরে বাবাই শুয়ে, রিনুকে কাছে যেতে দেয়না কেউ… রিনু দরজায় দাঁড়িয়ে হাত বাড়িয়ে বারবার বলে ‘তোমাকে একবার ছোঁবো? বাবাই?’…. একবার মা বাবার সঙ্গে রিনু গেল সাউথ ইন্ডিয়া বেড়াতে; ট্রেনে চড়ে-কু ঝিক ঝিক! মাদ্রাজে নামার সময় হইহই কান্ড! রিনুর মায়ের চটিজোড়া উধাও! সকালে কামরা পরিস্কার করতে উঠে ময়লার সঙ্গে চটিটিও দিব্যি নিয়ে কেউ নেমে গেছে কোন স্টেশনে! নতুন শহরে নেমেই প্রথম জুতোর দোকানে যেতে হল সেবার; এই বেড়ানোয় রিনু বড় দিদি হয়ে গেল এক কুট্টি ভাইয়ের। ‘মানুদিদি’… মাদ্রাজে যে হোটেলে রিনুরা ছিল সেখানেই উঠেছিল আরো একটি পরিবার, যার একজন এই কুট্টিভাই; সকালে দরজা খোলার পর ফাঁক দিয়ে রিনুকে দেখে সে ডেকে উঠেছিল ‘মানুদিদি’; সেই শুরু… পুরো বেড়ানোয় ওই পরিবারই হয়ে গিয়েছিল রিনুদের পরিবার; কলকাতায় ফিরেও বহুবছর যোগাযোগ ছিল… হয়ত মা বাবাইয়ের সঙ্গে এখনও আছে… এই বেড়াতে যাবার কিছুদিন আগে (নাকি পরে!)।

দিম্মা ঠাকুমা মামী দুই মাসি কাকিমা দিদিরা সবাই মিলে রিনুদের ‘বইঘরে’

রিনুর পাঁচবছরের জন্মদিন হয়; কত লোকজন; কত হইচই আনন্দ! বড়দিভাই-ছোড়দিভাই (রিনুর বড় মাসিমণির দুই মেয়ে) রিনুকে বেনারসী পরিয়ে টুকটুকে কনেবউ সাজিয়ে দিয়েছিল! পরে তা ছবিতে দেখেছে রিনু…ওই অ্যালবামে রিনুর জ্যাঠতুতো চারদিদি আর সোনাকাকার বড় ছেলে – প্রিয়মও আছে… সবাই ছোট্ট, কিন্তু প্রিয়ম তখন একদম কুট্টি! সবে বছরখানেকের! কি যে মিষ্টি সেইসব ছবি! দাঁত নষ্ট হবে বলে রিনুকে ছোটবেলায় লজেন্স-ক্যান্ডি-চকোলেট খেতে দেওয়া হতনা মোটেই; এদিকে জন্মদিনে সেসব অনেকেই উপহার দিয়েছেন রিনুকে! এবার নিশ্চয় রিনু পাবে সেসব! দুঃখের কথা-এমনটা ঘটেনি! সমস্ত ক্যান্ডি-চকোলেট অন্যদের ভালোবেসে দিয়ে দেওয়া হয়, রিনুরই হাত দিয়ে! রিনু অবশ্য পেয়েছিল, তবে নামমাত্র! যা পেল তাতেই সে খুশিতে ডগমগ! পাওয়া, না-পাওয়া নিয়ে ভাগ্যিস কোন মাথাব্যথা কোনদিনই রিনুর ছিলনা; মা-বাবা তা তৈরি হতেই দেননি কোনদিন! তাই আজও একমাত্র ভালোবাসা ছাড়া আর কোন কিছু নিয়েই তেমন আক্ষেপ, আফশোস বা দীর্ঘশ্বাস রিনুর আসেনা… হাঁফাতে হাঁফাতে ফিনিশিং লাইনের দিকে দৌড়োনোতে সে ছোট থেকেই বিশ্বাস করেনা, তাই নির্ভার হয়ে-ধীরেসুস্থে সে হেঁটে চলেছে আজও…

ছবি: সৌজন্যে লেখক

পড়ুন
ছোটবেলা আসলে নরম একটা মনকেমন
ছবিগুলোতে লেগে থাকা আদরগুলো কেমন আজীবন ঘিরে রাখে