পাগল হাওয়া

রুদ্রাক্ষ রহমান, গল্পকার

শুকনো পাতা ঝরে পড়ছে এই শহরতলায়। কোকিল ডাকছে অস্থির গলায়, নাগরিক আঙ্গিনায় ফুটে থাকছে ফুল, হাওয়া বেপরোয়া তস্করের মতো মুহূর্তে লন্ডভন্ড করে দিচ্ছে সব স্থিতি। এই ব্যস্ত, উদভ্রান্ত, অস্থির  শহরে বসন্ত এসেছে। বসন্তের পাগল পাগল রাতে হাওয়ার হাত ধরে আকাশ জুড়ে দাঁড়িয়ে থাকে নক্ষত্রের পাড়া। গলিপথ ধরে হেঁটে যায় নিজেই নিজের কাছে হারিয়ে যাওয়া মানুষ। চিনে নিতে চায় বিগত স্মৃতির মতো তার আপন ঘর। কিন্তু পারে কি? পাগল হাওয়া যে তাকে ডেকে নেয় আরও কোন অচিনপুরে। হাওয়া ডাক দিয়ে গেলে তো ঘর অচেনা হয়ে যায়।
এই পাগল হাওয়ার মতো ডাক দিয়ে যায় কিছু মানুষও। উড়ন্ত ঘূর্ণীর মতো হৃদয়ের মূল ধরে টান দেয় তারা। আলো- অন্ধকারে, অবেলায় তারা ডাকে আমাদেরও এই পাগল হাওয়ার মতো।
এবার প্রাণের বাংলার প্রচ্ছদ আয়োজন সেই পাগল হাওয়া নিয়ে। পাগল হাওয়ার মতো মানুষদের কথা মনে পড়িয়ে দিতে।

এক.
মানুষ বাতাসের সঙ্গে কথা বলতে পারে? পারে নাকি! আর না পারলে অমন লাইন লেখা হলো কী করে ‘পাগল হাওয়া/ কি আমার মতন তুমিও হারিয়ে গেলে?’ মহান সুর স্রষ্টা সলিল চৌধুরী লিখলেন আর সুর দিলেন হাওয়ার সঙ্গে কথা বলার সেই গানে। সুবীর সেনের কণ্ঠে বাংলা গানের ইতিহাসে অমরত্ব পেয়ে গেলো এই গানটি। গানটার একটা হিন্দি রূপান্তর আছে( না জানে কিউ); তবে তাতে পাগল হাওয়ার অস্তিত্ব নেই। সলিল, সময়ের এক পাগল হাওয়া। আরেক পাগল হাওয়ার নাম শচীন দেব বর্মণ। নিজের প্রেমে পড়ার পুলক তিনি জানিয়ে ছিলেন বাতাসকে-হাওয়াকে। ‘শোনো গো দখিন হাওয়া/ প্রেম করেছি আমি’।
যেখানে, যেভাবে যতক্ষণ জীবনে আছি হাওয়া, পাগল হাওয়া আমাদের ঘিরে রেখেছে। সর্বক্ষণ আছে বলে বুঝতে পারি না। মাঝে মাঝে যখন হাওয়ায় টান পড়ে, তখন টের পাওয়া যায় এই বেঁচে থাকার জন্য বাতাস কতটা জরুরি। এমন একটি ভাবনার কথা পড়া হয়েছিলো এসময়ে জাদুকর কবি জয় গোস্বামীর লেখায়। জয় যখন লেখেন, বলে ওঠেন হৃদি ভেসে যায় অলকানন্দা জলে’ তখন তাকে আমার এক পাগল হাওয়া মনে হয়। কী আদর করে তিনি পাতার সঙ্গে কথা বলেন। ‘ঘুমিয়েছ, ঝাউপাতা’? জয়ের মতো আর এমন করে পাতাদের খবর কে নিয়েছেন কবে?

দুই.
পঞ্জিকার পাতার হিসেবে শীত চলে গেলো। গেলো মানে শীত কি এবার সত্যি সত্যি এসেছিলো এই শহরে? পৌষ গেলো মাঘ গেলো শীতের হাওয়াটাই পেলো না এই শহর। শীতের একটা পাগলা টান আছে। পাগল হাওয়া আছে। শীতের বিকেলগুলো, ঠিক সন্ধ্যা নামার আগে আগে হাওয়া শরীর-মন ধরে একটা টান দেয়। কেমন উদাস, একলা করে দেয় মানুষকে। যদি সব ঠিকঠাক থাকতো, তাহলে এখন প্রকৃতিতে বসন্তের হাওয়া বইতো, উতল-এলোমেলো হাওয়া। তাও বইছে কই? ধরা যাক আজ থেকে ২৫ বছর আগে। শীত গিয়ে বসন্ত এসেছে। শাহবাগের পাবলিক লাইব্রেরির আঙিনা। তখন বিকেল বেলা। কোথা থেকে, কোন সুদূরের হাওয়া উড়ে এলো অন্য হাওয়ায় ভর করে। হাওয়ার সে কী দাপট। পাতারা ছন্দ পেলো। এলোমেলো হলো সেই বিকেলের সব। সেই পাগল হাওয়ায় এক কিশোরীর উদ্দাম নৃত্য দেখেছিলাম আমি এবং আমরা ক’জন।

তিন.
একরাতে পাগলা হাওয়ার নাচন দেখবো বলে আমরা ক’জন নদী তীরে শয্যা পেতেছিলাম। আকাশ ভরা ছিলো তারায়। নিচে ছিলো বালুর ওপর দুর্বা ঘাস। রাতভর জল ছুঁয়ে আসা হাওয়ার দাপটে এলোমেলো হয়ে গিয়েছিলাম সবাই। তারপর কে, কখন ঘুমিয়ে পড়েছি মনেই করতে পারছি না।
আরেকবার, হাওয়ার শব্দ শুনবো বলে, পাতার নাচন দেখবো বলে, আমরা চলে গিয়েছিলাম বনের গভীরে। বাতাসও যে গাছে গাছে, পাতায় পাতায় কথা বলে সেই প্রথমবার জানা হয়েছিলো আমার। আর, মরাপাতা, ঝরা পাতাদের জন্য বাতাসের সে কী হাহাকার তারও অস্তিত্ব টের পেয়েছিলাম সে বেলায়।

চার.
চার্লস চ্যাপলিন, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, জীবনানন্দ দাশ, বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়, ঋত্বিক ঘটক, সত্যজিৎ রায়, সলিল চৌধুরী, শচীন দেব বর্মণ, রাজকাপুর, শক্তি চট্টোপাধ্যায়, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, জয় গোস্বামী আর আমাদের আবুল হাসান-সবাই যেন সেই পাগল হাওয়া। আর ওই যে আরেক পাগল হাওয়া একদা দুনিয়া কাঁপিয়ে দিয়েছিলো, সেই ল্যাটিন তরুণের নাম চে গুয়েভারা, চে; আজও দুনিয়াময় তরুণদের বুকের ভেতরের সাহসের নাম তিনি, স্বপ্ন তিনি।
পৃথিবীর বুকে এই পাগল হাওয়াদের রাজ্যপাট একেবারেই আলাদা। এই দুরন্ত হাওয়ার মতো মানুষেরা দুনিয়াজুড়ে সৃষ্টি করেছেন, নতুন পথ, নতুন স্বপ্ন। তাদেও গতিপথে সংঘাত আর ঘর্ষণে যেন জ¦লে উঠেছে আগুন, জ¦লে উঠেছে আলো; দেখা গেছে পথের নিশানা।

‘পাগল হাওয়া’- লেখাটা আপাতত শেষ করা যাক একটা দৃশ্য দিয়ে!
দু’জন মানুষ, হ্যা মানুষইতো;
মাথা নিচু করে হেঁটে যাচ্ছেন সন্ধ্যানামা বিষন্নবেলায়
একা একা দু’জন মানুষ
জীবনানন্দ আর আবুল হাসান
দু’জন বিষন্ন মানুষ!
কোনো এক পাগল হাওয়া তাদের দুজনকে এনেছিলো পৃথিবীতে একবার, তারপর আরেক পাগল হাওয়া টান দিয়ে নিয়ে গেছে বনের গভীর ভেতরে!