পাগল …

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

‘‘ঐ বয়সে আমরা ওকে পাগল বলতে শিখেছিলাম
এখন ওকে মনে পড়ায় কলসের জল আপনি গড়ায়’’

কবি শক্তি চট্টোপাধ্যায় লিখেছিলেন এমন পঙক্তি। পাগল কে? কোথায় সেই পাগলের দেশ? সে দেশে কি গান গেয়ে ঘুরে বেড়ায় রবীন্দ্রনাথের রক্তকরবীর রজ্ঞন? গান লেখেন লালন ফকির? বন্দুক হাতে মানুষের মুক্তির জন্য লড়াই করেন চে গুয়েভারা? কবিতা লেখার জন্য ইউরোপের পথে পথে ঘুরে বেড়ান কিশোর কবি জ্যাঁ আর্তুর র‌্যাঁবো, কলকাতায় শক্তি চট্টোপাধ্যায়? ঢাকা শহরে নিঃসঙ্গ ব্যথায় কাঁপেন বোহেমিয়ান আবুল হাসান, অ্যালেন গিন্সবার্গ ১৯৭১ সালে হাঁটেন যশোর রোডে?

কোপেরনিকাসকে পাগল বলেছিলো মানুষ।সক্রেটিসের হাতে তুলে দেয়া হয়েছিলো বিষের পেয়ালা, বিপ্লবের জন্য পৃথিবী জুড়ে জীবন উৎসর্গ করেছিলো লক্ষ লক্ষ তরুণ। বিক্ষোভের উত্তাল দিনে টপকাতে চেয়েছিলো নিষেধের ব্যারিকেড। এ সবই কি প্রচলিত ধারণাকে প্রত্যাখ্যানের সাহস নাকি মানসিক ভারসাম্য হারানো কিছু মানুষের উদ্ভট খেয়াল? সমাজের যারা অধিপতি, সমাজ যারা গড়েন তাদের মতের সঙ্গে না মিললেই এই সব মানুষদের আখ্যা দেয়া হয় পাগল বলে। আসলে পাগল কি শুধুই মানসিক ভারসাম্য হারানো কোনো ব্যক্তি না প্রচলিত ধারণাকে ভাঙার তীব্র উন্মাদনা?

এবার প্রাণের বাংলার প্রচ্ছদ আয়োজনে রইলো সেই পাগল বা পাগলামী নিয়ে ‘আমি পাগল হবো’।  

এখন থেকে হাজার দুই বছর আগে কোনো মানুষের মুখ দিয়ে ফেনা তুলে অজ্ঞান হয়ে পড়লে লোকে বলতো কোনো আত্মা অথবা খোদ ঈশ্বর তার উপর ভর করেছে। এই অজ্ঞাত রোগকে তারা বলতো ‘ঐশ্বরিক রোগ’। কিন্তু উনিশ শতকে এসে মনোচিকিৎসকরা ডাক্তারী বইয়ের পাতায় সেই ঐশ্বরিক রোগকে বললেন মানসিক ভারসাম্যহীনতা, যাকে আমরা চলতি ভাষায় বলি, পাগলামি। মনুষ্য প্রজাতির মনের মধ্যে কখন ঘরবাড়ি বানাতে শুরু করে এই ভারসাম্যহীনতা?‘আন্ডারস্ট্যান্ডিং ম্যাডনেস’ নামে বইতে বলা হয়েছে, এই ভারসাম্য হারানোর ব্যাপারটা আসলে কমনসেন্স বা সাধারণ বোধ হারিয়ে ফেলা থেকেই মনের মধ্যে হাঁটি হাঁটি পা পা করে এগুতে থাকে। ডাক্তাররা বলেন, বাস্তবতার সঙ্গে সংযোগ হারিয়ে ফেলা। তাহলে ১৯৭১ সালে ঋত্বিক ঘটক যখন কলকাতার রাস্তায় বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের জন্য অর্থ ভিক্ষা করেছিলেন তখন কি তিনি বাস্তবতার সঙ্গে সংযোগ হারিয়ে ফেলেছিলেন?তাকে কেন মাথায় ইলেকট্রিক শক নিয়ে একটা স্যানেটরিয়ামের প্রকোষ্ঠে বন্দী হয়ে থাকতে হয়েছিলো? কেন শুনতে হয়েছিলো ঋত্বিক একটা পাগল?

কোপেরনিকাস পৃথিবীকে জানিয়েছিলেন, সূরযটা পৃথিবীকে ঘিরে ঘুরছে না, পৃথিবী ঘুরছে সূরয়ের চারপাশে। তখনকার ধর্মযাজকরা বলেছিলো, কোপেরনিকাস একটা পাগল। কিন্তু ওরকম পাগল পৃথিবীতে না থাকলে তো  পৃথিবীর ইতিহাস অন্যরকম ভাবে লেখা হতো। তাহলে বলা যায় পৃথিবীতে পাগলের প্রয়োজন আছে! পাগল না থাকলে পৃথিবী সুন্দর হতো না।

মধ্যযুগের শেষে, আধুনিক সময়ের শুরুতে যখনই নতুন করে সমাজ পরিশোধনের প্রশ্ন উঠলো আর মূল্যবোধের ভিত্তিপ্রস্তর ধরে টানাটানি শুরু করলো সমাজপতিরা তখনই সমাজের মূল স্রোত থেকে বিবর্জিত, প্রান্তবাসী হয়ে গেলেন কিছু বেশ্যা, কুষ্ঠরোগী, ভিখিরি আর ভবঘুরে মানুষ। সমাজ থেকে বর্জিত তারা, বার বার নিয়ন্ত্রিত, শাসিত, সুসভ্য সমাজ এদের সন্দেহ করেছে, উনবিংশ থেকে বিংশ শতক অব্দি লক্ষ লক্ষ রোমানি বা রোমা উপজাতীয়, মূলত যাযাবর, জিপসিরা খুন হয়ে চলেছিলেন, সমাজকে পাপ আর দুষ্টতা থেকে মুক্ত করার মহতী উদ্যোগে।

পাগল শব্দটি বেশ অদ্ভুত। তিন অক্ষরের এ শব্দের অভিব্যক্তি বহু বিচিত্র। এটি ব্যক্তির মানবিক অস্তিত্বের এক বিপর্যস্ত অবস্থাকে নির্দেশ করে থাকে। আবার বাংলা ভাষায় খেয়ালী বা ভবঘুরে বোঝাতেও পাগল শব্দের ব্যবহার আছে। কখনো অপমানজনক গালাগাল হিসেবে এর ব্যবহার হয় আবার এ শব্দ দিয়ে পরম মমতারও প্রকাশ ঘটে। জন্মদাত্রী মায়ের কাছে প্রতিটি সন্তানই পাগল। আমার ‘পাগল ছেলে’ বলে প্রত্যেক মা-ই নিজ সন্তানের প্রতি তার গভীর ভালোfবাসা প্রকাশ করেন। সঙ্গীত শিল্পী মান্না দে‘র একটি গানের লাইন ’ধন্য আমি ধন্য যে পাগল তোমার জন্য যে’। পাগল শব্দটি প্রেমের ভিন্ন মাত্রা প্রকা্শ করতেও প্রয়োগ করা হয়। পাগলামি তখন আক্ষরিক অর্থেই রোমান্টিকতার এক অনন্য প্রকাশ হয়ে ওঠে।

তাহলে পাগল কাকে বলে? কাকেই বা বলছি আমরা মানসিক ভারসাম্য হারানো মানুষ। লালন ফকির তো লিখেছিলেন ‘‘আমি পাগল হবো/পাগল নেবো/ যাবো পাগলের দেশে’’। অন্যের টাকা লুট করা, শিশু ধর্ষণের দামামা বাজানো, ধর্মের নামে মূল্যবোধ বিক্রি করে দেয়া সমাজে মানসিক ভারসাম্য হারানো তো নিত্যকার বিষয়। আমরা হারাচ্ছি আর হারাচ্ছি কেবল। লালন ফকির পাগল হতেই এসেছিলেন পৃথিবীতে;পাগল করে রেখে গেলেন সবাইকে। আঁর্তুর র‌্যাঁবো তাঁর একটি চিঠিতে লিখেছিলেন, ‘কবি হবেন দ্রষ্টা, নিজেকে তিনি বানাবেন দ্রষ্টা। নিজেকে তিনি দ্রষ্টা বানাবেন সমস্ত ইন্দ্রিয়ের এক দীর্ঘ বিশাল আর সচেতন ভ্রষ্টতার ভেতর দিয়ে। সব রকমের প্রেম, কষ্ট এবং উন্মাদনার মধ্য দিয়ে। কবি নিজেকে খোঁজেন। নিজের ভেতরের সব বিষকে তিনি খরচ করে ফেলেন, রেখে দেন শুধু তাদের নির্যাস। অকথ্য অত্যাচার করেন নিজের ওপর, যেখানে তার সমস্ত বিশ্বাস প্রয়োজন, সমস্ত অমানুষিক ক্ষমতা, যেখানে তাকে হয়ে উঠতে হয় সমস্ত মানুষের মধ্যে সবচেয়ে বড় রোগী, বিশাল অপরাধী এবং অভিশপ্ত একজন। আর, বিশাল পণ্ডিত। কেননা, তিনি পৌঁছতে পারেন অজানায়’।লিখেছিলেন র‍্যাঁবো, তাঁর শিক্ষক ইজামবারকেও, ‘আমি হলাম অন্য কেউ। কী দুরবস্থা সেই কাঠের টুকরোর, যে হঠাৎ দেখে, সে হয়ে উঠেছে বেহালা।’

কাঠের টুকরোর বেহালা হয়ে ওঠার গল্পটাই কি তাহলে ক্রমশ উন্মাদ হয়ে ওঠা? শক্তি চট্টোপাধ্যায়কে কেউ কেউ বলেন, এক ক্ষ্যাপাটে উন্মাদ কবি। আপাত দৃষ্টে পদ্যের শক্তি পাগলামী দিয়ে মোড়ানো মনে হলেও শক্তির পদ্য আদতে আধুনিক সমাজের বিরুদ্ধে পাগলাটে এক আক্রমণ, সে হোক প্রেম, ঘৃণা কিংবা দ্রোহের পঙক্তি, সব জায়গাতেই এক তেড়েফুড়ে আসা ঝড়ের মতো হাজির কবি। কবিরা এরকমই। ঝড় নিয়ে আসেন। চারপাশের সমাজের পরিচিত কাঠামো তখন তাদের ভয় পেয়ে ক্ষ্যাপা বলে তকমা সেঁটে দিতে চায়। এই পাগল বা ক্ষাপা তাদেরকেও্র বলা হয়েছে যারা চিন্তার ক্ষেত্রে ছিলেন স্বাধীন। প্রচলিত চিন্তাকে তাদের প্রত্যাখ্যান করাটাই আসলে এক বিদ্রোহ। আর এই বিদ্রোহকেই চিহ্নিত করেছে শাসনযন্ত্র পাগলামি বলে। আমাদের আর দশজনের মতো করে ভাবতে চাননি তারা। ভাবনার ক্ষেত্রটা একেবারেই আলাদা ছিলো বলেই সক্রেটিস জীবনের শেষদৃশ্যে পর্দা নামিয়ে এনেছিলেন হেমলকের পেয়ালা হাতে নিয়ে। সক্রেটিসকে মেরে ফেলা সম্ভব হয়েছে কিন্তু তাঁর ভাবনাকে কখনোই নয়। একজন পাগল বা মানসিক ভারসাম্য হারানো মানুষও তো প্রত্যাখ্যান করেন। ভালোবাসা না পেয়ে, অমানবিকতার সঙ্গে প্রত্যেকদিন করমর্দন করতে করতে তিনি একদিন বাস্তব জগতের সঙ্গে সম্পর্ক চুকিয়ে দেন; তার মাথা ইস্তফা দেয়।

তাহলে হিটলারকে কী বলা যায়? কী নামে ডাকা যায় মুসলিনিকে? যারা পৃথিবীর ভবিষ্যতকে হাঁড়িকাঠে চড়াতে চেয়েছিলো তারা কখনোই কাঠ থেকে বেহালা হয়ে উঠতে পারেনি। এই মানুষদের মাথার ভেতরে বাসা বেঁধেছিলো মানসিক রোগ। মানসিক অসুস্থতার চরম লগ্নে তারা নিজেদের হাত রজ্ঞিত করতে চেয়েছিলো মানুষের রক্তে। একটা সময়ে মানুষের মনের রোগ সারাতে মাথার খুলি ফুটো করে দেয়া হতো। সেই মনের রোগ কিন্তু সত্যি সত্যি আমাদের প্রতিদিনকার জীবনে একটা সংকট হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাই বলে মানসিক অসুস্থতার মানেই ‘পাগলামি’ নয়। আমাদের চারপাশে এমন অগণিত মানসিক রোগী ঘুরে বেড়াচ্ছেন যারা বাইরে যথেষ্ট সুস্থ, স্বাভাবিক, যারা এক কাপ চা পান করতে করতেই মনের ভেতরে শত খণ্ডে টুকরো টুকরো হয়ে যেতে পারে। কেউ ঘুণাক্ষরেও নাগাল পাবে না তার ভেতরের অস্থিরতার। বিশেষ বিশেষ মুহূর্তে অকস্মাৎ এদের অসুস্থ সত্ত্বাটি বাইরে বেরিয়ে আসে। অনেক সময় অসুস্থতার শিকার এই ব্যক্তিরা পারস্পারিক ব্যক্তিগত ও সামাজিক সম্পর্কগুলো নষ্টের পেছনে বিশেষ ভূমিকা পালন করেন। এতে তাদের দোষ দেয়া যায় না। বাইরের পৃথিবীর সঙ্গে মনের ভেতরকার সমুদ্রের ঢেউ ভাঙার ফারাকটা তাদের ঠেলে নিয়ে যায় সংযোগহীনতার খাদের কিনারায়। ফিরে আসা যায় না সেখান থেকে। যেমন জ্বরের শরীর থেকে তুলে নেয়া যায় না শীতের অনুভুতি।

চিকিৎসকরা বলছেন, আধুনিক সমাজে বিষয়টাকে বলে ‘স্ট্রেস’। জীবনে বেঁচে থাকার যুদ্ধ, যুদ্ধের মাঠে পরাজয়ের হতাশা পাথরের মতো চেপে ধরে মানুষের মনকে। এই চাপ থেকে মুক্তি নেই আধুনিক মানুষের। মার্কিন লেখক কেন কেসি ১৯৬২ সালে লিখেছিলেন ‘ওয়ান ফ্লিউ ওভার দ্য কাক্কুজ নেস্ট’ উপন্যাসটি। আমেরিকার এক মানসিক হাসপাতালের অত্যাচারী ব্যবস্থাপনার বিরুদ্ধে রোগীদের বিদ্রোহের গল্প। গত শতাব্দীতে লেখা উপন্যাসটি যেন এই পৃথিবীর গল্প। ৬০ বছরে পা রেখেও এই উপন্যাসের কাহিনি এখনো প্রসঙ্গিকতা হারায়নি। তাই তো ২০২০ সালেও হলিউডের পরিচালকদের নির্মাণ করতে হয় জোকার ছবিটি। চারপাশে ঘটে যাওয়া অন্যায়, অবিচার, ভালোবাসাহীনতা আর অমানবিকতার বিরুদ্ধে একজন মানুষ নিজেই হয়ে ওঠে ভয়ংকর এক চরিত্র-জোকার। এতো আমাদেরই গল্প! জোকার চরিত্রে ছায়া ফেলে যায় আমাদেরই আত্মার শীর্ণ রূপ।

গলির মাথায় বসে থাকে লোকটা। একমুখ বিদ্রোহী দাড়ি, চুল হয়তো কামিয়ে নিয়েছে কেউ অথবা কাটা হয়নি কয়েক যুগ। বিড়বিড় করছে তার ঠোঁট, চোখের দৃষ্টি কোথাও পৌঁছায় না। কী বলে মানুষটা? কী তার অভিযোগ? তাকে আমরা বলি পাগল। চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় মানসিক আশ্রয় হারানো একজন মানুষ। কিন্তু এরকম মানসিক স্থিরতা কি আমরাও হারাইনি বহুকাল আগে? এই কি সেই মানুষ যে একদিন কাঠের টুকরো থেকে হয়ে উঠেছিলো বেহালা অথবা বেহালা থেকে কাঠের টুকরো?

ইরাজ আহমেদ
তথ্যসূত্রঃ ইন্টারনেট
ছবিঃ গুগল

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]