পাতালরেল: লন্ডনের শিরা-উপশিরা

ঊর্মি রহমান

প্রাণের বাংলায় ‘দূরের হাওয়া’ কলামে নিয়মিত লিখতে শুরু করলেন উর্মি রহমান। একদা বিবিসি ওয়ার্ল্ড সার্ভিসে কর্মরত উর্মি রহমান ঢাকার বিভিন্ন দৈনিক ও সাপ্তাহিকে সাংবাদিক হিসেবেও কাজ করেছেন। এখন বসবাস করেন কলকাতায়। যুক্ত রয়েছেন নানান সামাজিক ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনের মোর্চায়। দূরের হাওয়া মানেই তো দূর পৃথিবীর গন্ধ। অন্য দেশ, অন্য মানুষ, অন্য সংস্কৃতি। কিন্তু মানুষ তো একই সেই রক্তমাংসে। সমাজ, মানুষ, আন্দোলন আর জীবনের কথাই তিনি লিখবেন প্রাণের বাংলার পৃষ্ঠায়।

আশির দশকের মাঝামাঝি সময়ে বিবিসি’তে যোগ দেবার জন্য লন্ডন এসেছিলাম। তখন সবাই আশ্বাস দিয়ে বলেছিলো, এই প্রকাণ্ড শহরে চলাফেরা করা খুব সহজ। কারণ এখানে আন্ডাগ্রাউন্ড নামে একটি ব্যবস্থা আছে যা প্রায় পুরো শহরটাকে ঘিরে রয়েছে। পরে দেখলাম ঠিক তাই। যেখানেই যেতে চাই, সেই পাতালরেল ধরেই চলে যাওয়া যায়। তখন ইন্টারনেট, গুগুল ইত্যাদি ছিল না। কিন্তু এ টু জেড (A to Z) নামে একটি বই ছিল। সেটা খুললেই দেখা যেতো, যে রাস্তায় যাবো, তার কাছাকাছি কোন্ আন্ডাগ্রাউন্ড স্টেশন আছে। এই পাতালরেলের কথাই বলতে বসেছি। লন্ডনবাসীরা আন্ডাগ্রাউন্ড বা পাতালরেলকে বলে টিউব। বহু বছর আগে যখন মাটি খুঁড়ে এই রেলব্যবস্থা গঠন করা হয়, তখন সেই সুড়ঙ্গের আকার ছিল কিছুটা গোলাকার, সেজন্যই লন্ডন আন্ডাগ্রাউন্ডের এই ডাকনামটি হয়েছিলো। আশির দশকে বিলেতে এসে দেখেছিলাম, কোন ঠিকানা খুঁজে না পেলে লোকজন বেশ সাহায্য করে। প্রথম প্রথম অবশ্য তাতেও আমার সংকট কাটত না, কারণ এদেশের সবার উচ্চারণ বুঝতাম না, যাকে বলে অ্যাকসেন্ট। একবার আমার একটা জায়গায় যাবার প্রয়োজন পড়লো। বেশ আত্মবিশ্বাস নিয়েই টউবে চড়ে বসলাম। কিন্তু টিউবের ভেতরে দেয়ালে যে ম্যাপ দেওয়া থাকে, তাতে কোথাও আমার ইপ্সিত স্টেশনের নাম দেখতে পেলাম না। পাশে দাঁড়ানো একজন ইংরেজ ভদ্রলোককে জিজ্ঞাসা করলাম, আমি কেমন করে সেখানে যাবো। তিনি বললেন, ‘তোমাকে বাইকার স্ট্রিটে ট্রেন বদলাতে হবে।’ আমি আবার ম্যাপে ‘বাইকার স্ট্রিট’ খুঁজলাম, কিন্তু ওরকম নামের কোন স্টেশন দেখতে পেলাম না। অসহায়ের মত তাঁর দিকে তাকাতেই তিনি আঙুল দিয়ে ম্যাপে দেখিয়ে দিলেন। তখন বুঝলাম আমাকে বেকার স্ট্রিটে ট্রেন বদলাতে হবে। তাঁর ককনি উচ্চারণে সেটা বাইকার হয়েছে। পরবর্তী সময়ে এসব অসুবিধা কাটিয়ে উঠেছিলাম। যাহোক ধান ভানতে শিবের গীত না গেয়ে আসল প্রসঙ্গে আসি।

লন্ডন আন্ডারগ্রাউন্ড নেটওয়ার্ক প্রথম চালু হয় ১৮৬৩ সালের ১০ই জানুয়ারী। বর্তমানে এর ১১টি লাইন আছে। তার মধ্যে সবচেয়ে প্রথম  মেট্রোপলিটন লাইনে ট্রেন চলাচল শুরু হয়েছিল। সেটিই ছিলো বিশ্বের প্রথম পাতালরেল। শুনেছি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় বোমা হামলা থেকে রক্ষা পেতে আন্ডারগ্রাউন্ড স্টেশনে লোকে আশ্রয় নিতো। ১৯৩৩ সালে লন্ডনের টিউব, ট্রাম ও বাসগুলোকে একই ছাদের নিচে এনে লন্ডন ট্রান্সপোর্টেরে যাত্রা শুরু হয়।

আগে চলাচলের জন্য ছিল ট্রাভেল কার্ড ছিলো, এখন সেটা বদলে হয়েছে অয়েস্টার কার্ড। এখন ব্যাংকের ডেবিট কার্ড দিয়েও চলাফেরা করা যায়। আমি যখন লন্ডনে কর্মরত ছিলাম, তখন অফিস থেকে বার্ষিক টিকেট কাটার জন্য সুদমুক্ত ঋণ দিতো। সেটাতে ১০ মাসের টিকেটের দাম নিয়ে লন্ডন ট্রান্সপোর্ট আমাদের ১২ মাস চলাচলের সুবিধা দিতো। এখন যাঁরা বয়স্ক, যাকে বলে সিনিয়র সিটিজেন, তাঁদের বিনাখরচে চলাচলের সুবিধা দেবার জন্য ব্রিটিশ সরকার ফ্রিডম পাস নামে একটি টিকেট দেয়, যা দিয়ে বিশাল লন্ডনের যে কোন জায়গায় টিউব, বাস ও ওভারগ্রাউন্ড (লন্ডন শহরের ভেতরে সারফেস ট্রেন) ট্রেনে চলাচল করা যায়। পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের কোন খরচ লাগে না। এতশত সুবিধার কারণে লন্ডন শহরে চলাফেরা বেশ সুবিধাজনক।

এবার টিউবে চড়ার কিছু মধুর অভিজ্ঞতার কথা বলি। আমি সবসময় টিউবে উঠেই একটা বই খুলে বসতাম। সেবারও সেটা করেছিলাম। পাশেই এক তরুণ দাঁড়িয়ে ছিলো, যথারীতি তাকে লক্ষ্য করিনি। হঠাৎ শুনি বাংলায় কে যেন প্রশ্ন করলো, ‘আপনি ঊর্মি আপা না?’ তাকিয়ে দেখি সেই তরুণ। মুখটা চেনা চেনা লাগলেও ঠিক চিনতে পারলাম না। বললাম, ‘তুমি কে?’ বললো, ‘আমি দীপু। নিউজপ্রিন্ট মিলে থাকতাম…।’ আর বলতে হলো না। আব্বার সহকর্মী-বন্ধ‍ু লুৎফর রহমান চাচার ছেলে। কত ছোট দেখেছি। ও এখন আমেরিকায় থাকে। অনেক কথা হলো। খুব ভাল লাগলো।

আর একদিন একইভাবে বই পড়ছি মন দিয়ে। পাশে একজন বয়স্ক ইংরেজ বসা। একেবারে কলোনিয়াল চেহারা। প্রথম দেখায় বর্ণবাদী মনে হবে। হঠাৎ শুনি আমার দিকে ঝুঁকে বলছেন, ‘আই ক্যান রীড দেবনাগরী স্ক্রিপ্ট।’ অবাক হয়ে তাঁর দিকে তাকালাম। মুখে অনাবিল হাসি। আলাপ হলো। জানলাম তিনি ব্রিটিশ শাসনামলে ভারতে ছিলেন। বুঝলাম, এখনো সেই স্মৃতি তাঁকে উদ্বেল করে।

টিউবে চড়ার অনেক স্মৃতি ও অভিজ্ঞতা আছে। সব যে মধুর, তা বলবো না। তবে ভালগুলোই মনের মধ্যে গেঁথে গেছে। খারাপগুলো দমকা হাওয়ায় উড়ে গেছে।  টিউবকে বলা যায় লন্ডন শহরের শিরা-উপশিরা। একদিন টিউব না-চললে লন্ডন শহরটা অচল হয়ে যাবে।

ছবি: গুগল