পাতা-ঝরার দিন

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

ড: সেলিম জাহান

ড.সেলিম জাহান। আমেরিকার মেরিল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে অভ্যাগত অধ্যাপক হিসেবে পড়িয়েছেন, পড়িয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। কাজ করেছেন জাতিসংঘেও। লেখাপড়ার বিষয় অর্থনীতি হলেও লেখালেখি, আর তাঁর চিন্তার দিগন্ত একেবারেই ভিন্ন এক পৃথিবীর গল্প। প্রাণের বাংলার জন্য এবার সেই ভিন্ন পৃথিবীর গল্প ধারাবাহিক ভাবে লিখবেন তিনি। শোনাবেন পাঠকদের নিউইয়র্কের একটি দ্বীপে তার বসবাসের স্মৃতি।

‘গলায় গলায় বাসনার সোনা, প্রতিদিন আমি করেছি রচনা’, রুজভেল্ট দ্বীপে আমাদের ছ’তলার বাড়ীর বারান্দায় এসে দাঁড়িয়ে চারদিকে দৃষ্টি ছড়িয়ে ঐ ছত্রদু’টিই বারবার মনের মধ্যে গুন গুন করতে লাগল। রৌদ্রোজ্জ্বল ঝকঝকে একটা দিন। সামনের মাঠ পেরিয়ে গাছ দুটোতে রঙ ধরেছে – তার ছায়া পড়েছে পূর্বী নদীর জলে। দূরের গাছটিতে যেন আগুন লেগেছে – তারও প্রতিবিম্ব নদীর জলে। তার ছায়া যেন গলিত সোনা। পূর্বী নদী – তার ওপাড়ের ম্যানহ্যাটেনের আকাশ-প্রান্ত সব ছাড়িয়ে ঐ কনক-রঙা বৃক্ষটি যেন জ্বলজ্বল করছে। রোদ মোলায়েম হয়ে এসেছে ডিমের হাল্কা কুসুমের মতো। পড়েছে মাটিতে তেরছা হয়ে অনেকটা এলায়ে পড়ার মতো। একটা মৃদু ঠান্ডা হাওয়া। একটু শীত শীত ভাব, তবে ঠিক শীত নয়। পাতায়, গাছে রং ধরতে শুরু করেছে। হেমন্ত যে তার কমলা পাড়ের শাড়ীর একটু আভাস দেখিয়ে হাল্কা পায়ে সন্তর্পনে এগিয়ে এসেছে তা’ বেশ বোঝা যায়। নাহ্, হেমন্ত এসেই গেলো।

সামনের গাছদু’টোর দিকে তাকিয়ে মনে হল, কত বড় হয়ে গেছে ও দু’টো।পনেরো বছর আগে যখন এ বাড়ীতে এসেছিলাম, তখন লিকলিকে দু’টো চারাগাছ ছিল ও দু’টে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বয়স ও কলেবর দু’টোই বেড়েছে ওদের। ওরাও হয়তো মনে মনে ভাবে – ‘আহা, মেঘে মেঘে তো বেলা আর কম হয় নি’। গাছ দু’টো আমার নিত্য সঙ্গী। সকালে উঠে শোবার ঘরের জানালা দিয়ে যখন বাইরে তাকাই, তখন ওরা পাতা নেড়ে যেন বলে, ‘সুপ্রভাত স্যার। ভালো আছেন তো?’ সন্ধ্যায় নদীর পাড় ধরে বাড়ী ফেরার পথে আলতো করে ওদের একবাপ ছুঁয়ে দেই। গভীর রাতে অন্ধকারে মাঝে মাঝে বারান্দায় দাঁড়িয়ে এদের দিকে তাকালে মনে ওরা ভূতের মতো ঝিমুচ্ছে।

বারান্দা ছেড়ে ঘরে ঢুকলাম। জোব্বা-জাব্বা পরে বেরুলাম বাইরে। আমাদের দ্বিদশতল আবাসিক ভবনের সামনের পার্কটি পেরুবার সময় টের পেলাম মচ মচ শব্দ হচ্ছে জুতোর নীচে মাড়িয়ে যাওয়া পাতার। কয়েকটি বাচ্চা ঝরা পাতা দিয়ে খেলছে। একটু দূরে স্মিতমুখে দাঁড়িয়ে আছে তাদের মা-বাবারা।টের পাই দীর্ঘ বার্চ গাছগুলো থেকে টুপটাপ করে পাতা ধরছে। একটা পাতা ঘুরতে ঘুরতে আমার গায়ে এসে পড়ল। তুলে নিলাম হাতে। মনে পড়ল, বার্চের কথা প্রথম পড়েছিলাম ‘বিপদের ধারে ছোট্ট কুটির’ বইটিতে -কত আগে। পাতায় মৃদু শব্দ তুলে সুড়ুৎ করে আমাকে চমকে দিয়ে একটা কাঠবেড়ালী আমার সামনে দিয়ে দৌড়ে এক লাফে একটা বার্চ গাছে উঠে পড়ল। রাস্তার দিকে তাকিয়ে দেখি হাওয়া বইতে শুরু করলেই একটা পাতার ঘূর্ণি তৈরী হচ্ছে এবং সর সর শব্দ করে পাতারা ঘূর্ণির কেন্দ্রবিন্দুতে যাচ্ছে।

জুতোর নীচে মাড়িয়ে যাওয়া পাতার শব্দ শুনতে আমার বেশ ভালো লাগে। মনে আছে খুব ছোট বেলায় নিস্তব্দ্ধ দুপুরে আমাদের বরিশালের বাড়ীর পেছনের বাগানে যেতাম। বড়-ছোট মিলিয়ে নানান গাছ আর ঝোপঝাড় মিলিয়ে মোটামুটি একটা জঙ্গলই ছিল জায়গাটা বলা যায়। কিছু গাছ আগে থেকেই ছিল, কিছু বাবার লাগানো – মেহগিনি, শিশু, চালতা, বেল, কামরাঙা, পেয়ারা, সফেদা, লিচু, নারকেল, সুপুরি, এমন কি খেজুর গাছ অবধি। পুকুরের পাড় ধরে বুনো কলাগাছের ঝাড়।

বড় বড় গাছগুলোর তলায় কেমন একটা ছায়া ছায়া শেওলা ঠান্ডা থাকত। গাছের পাতারা পড়ে স্যাঁত স্যাঁতে মাটিতে কেমন একটা ভেজা আবহের সৃষ্টি করত। কিন্ত সেগুলো পেরিয়ে ঘাসের জায়গায় পা পড়লেই ওই মচ মচ শব্দটা ফেরত আসত, কারন ঘাসের ওপরেই থাকত শুকনো পাতার ছড়াছড়ি। মাঝে মাঝে ঐ শুকনো পাতাগুলো নিয়ে খালি জায়গায় স্তুপ বানাতেন রহম আলী ভাই, আমাদের বাড়ীর খন্ডকালীন মালী। তারপর তাতে আগুন ধরিয়ে দেয়া হত। উর্ধমুখী সে আগুনের লেলিহান শিখা আর তার উত্তাপ এখনও অনুভব করি যেন। রহম আলী ভাই আমাকে বোঝাতেন যে পোড়ানো পাতার ছাই খুব ভালো সার হয়।

হেমন্তের শুকনো পাতার কথায় মনে পড়ল তার খুব ছোটবেলায় আমাদের জৈষ্ঠ্য কন্যার ভারী প্রিয় জিনিস ছিল এই শুকনো পাতা। আজ থেকে ৪০ বছর আগে উচ্চশিক্ষার্থে আমরা যখন মন্ট্রিয়ালে ছিলাম, তখন শুকনো পাতা নিয়ে খেলা তার ভারী পছন্দের ছিল। ম্যাকগিল বিশ্ববিদ্যালয়টি ছিল মাউন্ট রয়্যাল পাহাড়ের ঠিক নীচে। পাহাড়ের ঠিক তলায় বিরাট একটা পার্ক ছিল – মাউন্ট রয়্যাল পার্ক। হেমন্তের শুরুতেই শুকনো পাতা ঝরতে শুরু করত। স্তুপ জমে যেত পাতার। আমাদের কন্যা সেই পাতার স্তুপে সটান শুয়ে পড়ত। দু’হাতে পাতা নিয়ে কুচিমুচি করত। সেদিনের সেই ছোট্ট মেয়েটি নিজেও আজ আর একটি ছোট্ট কচি মেয়ের মা। আমার কথাগুলো সে হয়তো আজ পুরো অস্বীকার করবে – কিন্তু ঐ কাজটি সে করত।

হেমন্তে এই পাতা ঝরার সময়ে সন্ধ্যায় বা রাতে আমি যখন বাড়ী ফিরি, তখন সবসময়েই ঐ পার্কের মধ্য দিয়ে কোনাকুনি হেঁটে আমাদের ভবনের দরজায় এসে উপস্হিত হই। পথ বা সময় বাঁচানোর জন্য নয়, স্রেফ জুতোর নীচে মাড়িয়ে যাওয়া ঝরা পাতার মচ মচ শব্দ শুনতে। গুন গুন করতে থাকি ন্যাট কিং কোলের বিখ্যাত গান Autumn Leaves , যার প্রথম দু’ চরন হচ্ছে ‘Falling leaves drift by my window’, Autumn leaves are red and gold’. আমার খুব প্রিয় গানের একটি – গেয়েছেনও অনেকেই। আমার অবশ্য সবচেয়ে ভালো লাগে এরিক ক্ল্যাপটনের কণ্ঠে।

সেই সঙ্গে মনে পড়ে যায় ‘Ordinary People’ ছবিটির শেষ দৃশ্যটির কথা। এক ব্যতিক্রমী রাতের শেষে খুব ভোরে কিশোর টিমোথি হাট্টন যাচ্ছে তাঁর বান্ধবীর বাড়ীতে। পার্কের মাঝখান দিয়ে পাতার সরসর শব্দ পা দিয়ে মাড়িয়ে মচ মচ শব্দ তুলে – গাইছে জোরে জোরে অপেরা সঙ্গীত। হাতে তাঁর বই, বান্ধবীর বাড়ী হয়ে যাবে স্কুলে। সে বাড়ীতে দরজার ঘন্টি বাজাতেই একটি মিষ্টি চেহারার মেয়ে বেরিয়ে এলো। ‘স্কুল যাবে না’? টিমোথির প্রশ্ন।। একটু মুখ টিপে হেসে মেয়েটি জবাব দেয়, ‘আজ তো রোববার। বিব্রত ছেলেটি। ওর হাত ধরে মেয়েটি বলে, ‘তুমি নিশ্চয়ই নাশতা কর নি? এসো ভেতরে।’ ছবিটি খুব সম্ভবত সেখানেই শেষ।

এবং খুব সম্ভবত: এই দ্বীপে এটাই আমার শেষ হেমন্ত। আগামী বছরের হেমন্তে আমি আর এই দ্বীপে থাকবো না। সাতাশ বছর বাদে সে ও এক অধ্যায়ের শেষ। চলমান ও বহমান জীবনের স্রোত আমাদের নতুন নতুন দিক নিয়ে যায় – তার বাঁকে-বাঁকে কত কি আশ্চর্য্য জিনিষ আমাদের জন্য অপেক্ষা করে, কে জানে। কে জানে, আগামী হেমন্তে কি অপেক্ষা করে আছে আমার জন্যে – কোন সে সোনালী দিন, স্বর্ণাভ আকাশ আর কনক-রঙা গাছ? কোথায়, কে জানে?

লেখক:ভূতপূর্ব পরিচালক

মানব উন্নয়ন প্রতিবেদন দপ্তর এবং 

দারিদ্র্য বিমোচন বিভাগ

জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচী

নিউইয়র্কযুক্তরাষ্ট্র

ছবি: লেখক


প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না, তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]


https://www.facebook.com/aquagadget
Facebook Comments Box