পাতা ঝরার দিন

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

ড.সেলিম জাহান

(লন্ডন থেকে): ঘর ছেড়ে বেরুতেই বদলটা ধরা পড়ে। রোদ মোলায়েম হয়ে এসেছে ডিমের হাল্কা কুসুমের মতো। পড়েছে মাটিতে তেরছা হয়ে। অনেকটা এলায়ে পড়ার মতো। একটা মৃদু ঠান্ডা হাওয়া। একটু শীত শীত ভাব, তবে ঠিক শীত নয়। পাতারা ঝরতে শুরু করেছে। গাছে অবশ্য রঙ ধরেনি এখনো। কিন্তু তাতে কি? হেমন্ত যে তার কমলা পাড়ের শাড়ীর একটু আভাস দেখিয়ে হাল্কা পায়ে সন্তর্পনে একটু একটু করে এগিয়ে আসছে, তা’ বেশ বোঝা যায়।

রোদেলা ১৯৭৮ মন্ট্রিয়াল। মাউন্ট রয়াল পাহাড়ের নীচে।

আমাদের আবাসিক ভবনের সামনের পার্কটি পেরুবার সময় টের পেলাম মচ মচ শব্দ হচ্ছে জুতোর নীচে মাড়িয়ে যাওয়া পাতার। টের পাই দীর্ঘ বার্চ গাছগুলো থেকে টুপটাপ করে পাতা ধরছে। একটা পাতা ঘুরতে ঘুরতে আমার গায়ে এসে পড়লো। তুলে নিলাম হাতে। মনে পড়লো, বার্চের কথা প্রথম পড়েছিলাম ‘হ্রদের ধারে ছোট্ট কুটির’ বইটিতে -কত আগে। পাতায় মৃদু শব্দ তুলে সুড়ুৎ করে আমাকে চমকে দিয়ে একটা কাঠবেড়ালী সামনে দিয়ে দৌড়ে এক লাফে একটা বার্চ গাছে উঠে পড়লো। রাস্তার দিকে তাকিয়ে দেখি হাওয়া বইতে শুরু করলেই একটা পাতার ঘূর্ণি তৈরী হচ্ছে এবং সর সর শব্দ করে পাতারা ঘূর্ণির কেন্দ্রবিন্দুতে যাচ্ছে।

জুতোর নীচে মাড়িয়ে যাওয়া পাতার শব্দ শুনতে আমার বেশ ভালো লাগে। মনে আছে খুব ছোট বেলায় নিস্তব্দ্ধ দুপুরে আমাদের বরিশালের বাড়ীর পেছনের বাগানে যেতাম। বড়-ছোট মিলিয়ে নানান গাছ আর ঝোপঝাড় মিলিয়ে বলা যায় মোটামুটি একটা জঙ্গলই ছিলো জায়গাটা। কিছু গাছ আগে থেকেই ছিলো, কিছু বাবার লাগানো – মেহগিনি, শিশু, ছাতিম, চালতা, বেল, কামরাঙা, পেয়ারা, সফেদা, লিচু, নারকেল, সুপুরি, এমন কি খেজুর গাছ অবধি। পুকুরের পাড় ধরে বুনো কলাগাছের ঝাড় এবং বাঁশঝাড়।

বড় বড় গাছগুলোর তলায় কেমন একটা ছায়া ছায়া শেওলা ঠান্ডা থাকতো। গাছের পাতারা পড়ে স্যাঁত স্যাঁতে মাটিতে কেমন একটা ভেজা আবহের সৃষ্টি করতো। কিন্ত সেগুলো পেরিয়ে ঘাসের জায়গায় পা পড়লেই ওই মচ মচ শব্দটা ফেরত আসতো, কারন ঘাসের ওপরেই থাকতো শুকনো পাতার ছড়াছড়ি। মাঝে মাঝে ঐ শুকনো পাতাগুলো নিয়ে খালি জায়গায় স্তুপ বানাতেন রহম আলী ভাই, আমাদের বাড়ীর খন্ডকালীন মালী। তারপর তাতে আগুন ধরিয়ে দেয়া হতো। উর্ধমুখী সে আগুনের লেলিহান শিখা আর তার উত্তাপ এখনও অনুভব করি যেন। রহম আলী ভাই আমাকে বোঝাতেন যে পোড়ানো পাতার ছাই খুব ভালো সার হয়।

হেমন্তের শুকনো পাতার কথায় মনে পড়লো খুব ছোটবেলায় আমাদের জৈষ্ঠ্য কন্যার ভারী প্রিয় জিনিস ছিলো এই শুকনো পাতা। আজ থেকে ৪০ বছর আগে উচ্চশিক্ষার্থে আমরা যখন মন্ট্রিয়ালে ছিলাম, তখন শুকনো পাতা নিয়ে খেলা তার ভারী পছন্দের ছিলো। ম্যাকগিল বিশ্ববিদ্যালয়টি ছিলো মাউন্ট রয়্যাল পাহাড়ের ঠিক নীচে। পাহাড়ের ঠিক তলায় বিরাট একটা পার্ক ছিলো – মাউন্ট রয়্যাল পার্ক। হেমন্তের শুরুতেই শুকনো পাতা ঝরতে শুরু করতো। স্তুপ জমে যেতো পাতার। আমাদের কন্যা সেই পাতার স্তুপে সটান শুয়ে পড়তো। দু’হাতে পাতা নিয়ে কুচিমুচি করতো। সেদিনের সেই ছোট্ট মেয়েটি নিজেও আজ আর একটি ছোট্ট কচি মেয়ের মা। আমার কথাগুলো সে হয়তো পুরো অস্বীকার করবে – কিন্তু ঐ কাজটি সে করতো।

হেমন্তে এই পাতা ঝরার সময়ে সন্ধ্যায় বা রাতে আমি যখন বাড়ী ফিরি, তখন সবসময়েই ঐ পার্কের মধ্য দিয়ে কোনাকুনি হেঁটে আমাদের ভবনের দরজায় এসে উপস্হিত হই। পথ বা সময় বাঁচানোর জন্য নয়, স্রেফ জুতোর নীচে মাড়িয়ে যাওয়া ঝরা পাতার মচ মচ শব্দ শুনতে। গুন গুন করতে থাকি ন্যাট কিং কোলের বিখ্যাত গান Autumn Leaves , যার প্রথম চরনটাই হচ্ছে ‘Falling leaves drift by my window’. আমার খুব প্রিয় গানের একটি -গেয়েছেনও অনেকেই। আমার সবচেয়ে ভালো লাগে এরিক ক্ল্যাপটনের কণ্ঠে।

সেই সঙ্গে মনে পড়ে যায় ‘Ordinary People’ ছবিটির শেষ দৃশ্যটির কথা। এক ব্যতিক্রমী রাতের শেষে খুব ভোরে কিশোর টিমোথি হাটন যাচ্ছে তাঁর বান্ধবীর বাড়ীতে। পার্কের মাঝখান দিয়ে পাতার সরসর শব্দ পা দিয়ে মাড়িয়ে মচ মচ শব্দ তুলে – গাইছে জোরে জোরে অপেরা সঙ্গীত। হাতে তাঁর বই, বান্ধবীর বাড়ী হয়ে যাবে স্কুলে। সে বাড়ীতে দরজার ঘন্টি বাজাতেই একটি মিষ্টি চেহারার মেয়ে বেরিয়ে এলো। ‘স্কুল যাবে না’? টিমোথির প্রশ্ন।। একটু মুখ টিপে হেসে মেয়েটি জবাব দেয়, ‘আজ তো রোববার’। বিব্রত ছেলেটি। ওর হাত ধরে মেয়েটি বলে, ‘তুমি নিশ্চয়ই নাশতা করোনি? এসো ভেতরে।’ ছবিটি খুব সম্ভবত সেখানেই শেষ।

শুকনো পাতার কথায় একটি গল্প মনে পড়ে গেল। ও’ হেনরীর ‘The Last Leaf’। অসুস্থ মেয়েটি ঘরের জানালা থেকে দেখে হেমন্তের শুরুতেই বাড়ীর বাইরের গাছটির পাতা এক এক করে ঝরে যাচ্ছে। মেয়েটি ভেতরে ভেতরে দূর্বল বোধ করে। তার কেন জানি মনে হয়, যে দিন শেষ পাতাটি ঝরে যাবে, সেদিনই তার জীবনের শেষ দিন। ধীরে ধীরে গাছটি শুধু একটি পাতাতেই এসে যায়। মেয়েটি সে রাতে তার শেষ দিনের জন্য প্রতীক্ষা করে। পরের দিন ঘুম ভেঙে সে দেখতে পায়, পাতাটি ঝরে যায় নি। তার পরের দিন না, তার পরের দিনও না , কোনও দিনই না। মেয়েটি ধীরে ধীরে সুস্হ হয়ে ওঠে।

যে কথাটি মেয়েটি জানতে পারে না সেটা হলো যে, পাশের বাড়ীর বৃদ্ধ চিত্রকরটি ঐ শেষের রাতে সারা রাত জেগে জানালার উল্টোদিকের দেয়ালে এমন একটি জীবন্ত গাছ ও শেষ পাতাটি এঁকেছেন যে মেয়েটি সেটিকেই আসল বলে ভেবেছে, যদিও সত্যিকারের পাতাটি ঝরে গেছে। কিন্তু সারা রাত জেগে ঠান্ডায় শীতে ঐ কাজটি করতে গিয়ে বৃদ্ধ চিত্রকরটি নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হন এবং পৃথিবী ছেড়ে যান। ও’হেনরীর গল্পটি এখানেই শেষ। গল্পটির শেষে এসে কেন জানি হৃদয়ের মাঝে জলের মতো ঘুরে ঘুরে কথা ক’য়ে ওঠে একটি লাইন – ‘ঝরা পাতা গো, আমি তোমারি দলে’।

ছবি: লেখক ও গুগল

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]