পালাতে হয়েছিলো মোনালিসাকে

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় মোনালিসাকে ৫ বার পালাতে হয়েছিলো হিটলারের বাহিনীর লুটের হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য।এর মধ্যে ২ বার মোনালিসা পালিয়ে গিয়েছিলো অ্যাম্বুলেন্সে চেপে। পৃথিবীর বিখ্যাত সব শিল্পকর্ম আর ভাস্কর‌্যয লুট করার পরিকল্পনাকারী নাজি বাহিনীর অফিসাররা পৃথিবী বিখ্যাত এই শিল্পকর্মটির কেশাগ্র স্পর্শও করতে পারেনি। যুদ্ধের গোটা সময়টা মোনালিসাকে লুকিয়ে থাকতে হয়েছিলো ফ্রান্সের বিভিন্ন প্রাচীন দূর্গ আর গুদামঘরে।

অ্যাডলফ হিটলারের লুঠেরা বাহিনীর হাত থেকে লিওনার্দো দা ভিঞ্চির আঁকা অসাধারণ চিত্রকর্ম মোনালিসাকে বাঁচানোর জন্য তথন পৃথিবীজুড়ে যুদ্ধের ডামাডোলের আড়ালে একদল মানুষ শুরু করেছিলেন আরেক যুদ্ধ। সে যুদ্ধের সৈনিক ছিলেন কয়েকজন সাধারণ মানুষ আর ফ্রান্সের গোপন রেজিস্ট্যান্স গ্রুপের গেরিলারা।

প্রাণের বাংলার এবারের প্রচ্ছদ আয়োজনে রইলো মোনালিসাকে বাঁচানোর জন্য সেই শ্বাসরুদ্ধকর গল্প ‘পালিয়েছিলো মোনালিসা’। 

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হওয়ার আগে জ্যাক জাজর্ড প্যারিসের ল্যুভ মিউজিয়ামের উপ-পরিচালক হিসেবে কাজ করতেন। তখনকার রাজনৈতিক পরিস্থিতি দেখে জাজর্ড টের পেয়েছিলেন এই ভয়ংকর যুদ্ধকে আর এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। ফ্রান্স বা ইংল্যান্ড হিটলারের আগ্রাসনের হাত থেকে বাঁচতে পারবে না। আর তখনই তার মাথায় আসে ল্যুভ মিউজিয়ামে রাখা বিখ্যাত সব শিল্পকর্ম রক্ষা করার পরিকল্পনা। জার্মানী ১৯৩৮ সালে অষ্ট্রিয়া দখল করার পর পরই জাজর্ড মাথার ভিতরে পরিকল্পনা গুছিয়ে ফেলেন। কারণ তিনি তখন থেকেই ভয় পাচ্ছিলেন ফ্রান্স আক্রান্ত হলে বোমায় অথবা লুটতরাজের শিকার হয়ে ল্যুভ মিউজিয়ামের অমূল্য সব সৃষ্টিকর্মগুলো ধ্বংস অথবা বেহাত হবে।তিনি পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনায় বসলেন মিউজিয়ামের চিত্রকলা বিভাগের তখনকার পরিচালক রেনে হুগের সঙ্গে। তখন ল্যুভ মিউজিয়ামে শুধু ৩৫০০টি  চিত্রকর্ম ছিলো। ১৬ ফুট বাই ২৪ ফুট মাপের ‘র‌্যাফট অফ দ্য মেডুসাৎ’ নামে একটি বিশাল মূর্তি ছিলো যার ওজন ছিলো ৩ মেট্রিক টন।

১৯৩৯ সালের আগস্ট মাসে জাজর্ড তাঁর লোকজনদের কাজে লাগিয়ে দেন। তারা প্রথমেই ছবিগুলোকে ফ্রেম থেকে খুলে  অনেকগুলো মূর্তি ঢুকিয়ে ফেলে কাঠের বাক্সে। ছবির প্যাকেটগুলোর ওপরে তারা গুরুত্ব অনুয়ায়ী রঙ দিয়ে চিহ্ন দিয়ে দেয়। বিশেষ মূল্যবান বোঝাতে তারা লাল রঙের চিহ্ন ব্যবহার করে। মোনালিসাকে যে প্যাকেটে রাখা হয় সেটার ওপর লাল রঙের তিনটি দাগ দেয়া হয়। এই কাজগুলো করার সময় তারা তিন দিনের জন্য ল্যুভ মিউজিয়াম বন্ধ রাখেন। বাইরের মানুষকে জানানো হয় মিউজিয়ামের সংস্কার কাজ চলছে।

আগস্ট মাসের ২৮ তারিখে প্রায় মূর্তি ও অনান্য মূল্যবান সামগ্রীর ১০০০টি বাক্স এবং শুধু চিত্রকর্ম নেয়ার জন্য ২৬৮টি বাক্স প্রস্তুত করা হয়। মিউজিয়ামের বাইরে এসে দাঁড়ায় প্রায় শ’খানেক ট্রাক। মোনালিসাকে বহন করার জন্য তারা নিয়ে আসেন একটি অ্যাম্বুলেন্স। পথের ঝাঁকুনিতে মোনালিসার যাতে কোথাও চোঁট না-লাগে সেজন্য ইলাস্টিকের ঝাঁকুনিরিরোধকের মাঝখানে বসিয়ে দেয়া হয়। অ্যাম্বুলেন্সে চেপে সবার চোখের আড়ালে মোনালিসা পাচার হয়ে যায় ফ্রান্সের প্রাচীন দূর্গ স্যাতু দ্য সাম্বায়। বাকি শিল্পকর্মগুলো বিভিন্ন দূর্গ আর গুদামে লুকিয়ে ফেলা হয়। ১৯৩৯ সালের ৩ সেপ্টেম্বর ফ্রান্স জার্মানীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে। একই বছরের নভেম্বর মাসে জার্মান সৈন্যদের ফ্রান্স দখলের সম্ভাবনা যত এগিয়ে আসতে থাকে ততোই জাজর্ডের মনে নতুন করে দুশ্চিন্তা দেখা দেয়।

মোনালিসাকে আবার তারা সরিয়ে নেয় ফ্রান্সের দক্ষিণের শহরের আরেকটি দূর্গে, যার নাম স্যাতু দ্য লুভিংগিতে। এবার এই বিখ্যাত ছবিটিকে রোগির স্ট্রেচারে বসিয়ে বহন করা হয় পৃথিবীর অমূল্য সম্পদটিকে। এ সময় ফ্রান্সের প্রতিরোধ যোদ্ধারা তাদের সহায়তায় এগিয়ে আসে।

১৯৪০ সালে এই চিত্রকর্মটি আবার ঠাঁইনাড়া হয়। ফ্রান্স জার্মানীর কাছে আত্মসমর্পণ করলে এবার জার্মানীর সঙ্গে হাত মিলানো ভিচি সরকারের মুক্ত এলাকায় খুব গোপনে সরিয়ে দেয়া হয় মোনালিসাকে।আবারও একটি দূর্গে স্থান হয় মোনালিসার। সঙ্গে আরও বিখ্যাত কিছু চিত্রকর্ম। পরবর্তী দু্ই বছর যুদ্ধের আগুনে যখন সব পুড়ে যাচ্ছে তখন মোনালিসাকে ওই দূর্গ থেকে সরিয়ে এনে রাখা হয় এক পাদ্রীর বাড়িতে। কিন্তু ১৯৪৩ সালে জাজর্ড টের পেলেন মোনালিসার বিষয়ে জার্মানরা ব্যাপক খোঁজ-খবর করছে। তখন তিনি আবারও গেরিলাদের সহায়তায় মোনালিসাকে সরিয়ে দিলেন ফ্রান্সের একেবারে দক্ষিণ সীমান্তে অবস্থিত স্যাতু দ্য মন্টালে। জার্মান গোয়েন্দারা মোনালিসার খোঁজে ফ্রান্স তোলপাড় করলেও কেউ আর সন্ধান দিতে পারেনি এই চিত্রকর্মটির।

১৯৪৪ সালের ২৫ আগস্ট ফ্রান্স শত্রুমুক্ত হয়। জার্মান বাহিনী আত্মসমর্পন করে মিত্রবাহিনীর কাছে। আবার প্রাণ ফিরে আসে ল্যুভ মিউজিয়ামে। কিন্তু তখনও মোনালিসা আত্মগোপনেই। ওই বছরের ১৬ জুন তারিখে মোনালিসাকে আবার সসম্মানে ফিরিয়ে আনা হয় গ্যালারীতে।

প্রাণের বাংলা ডেস্ক

তথ্যসূত্র ও ছবিঃ মেন্টাল ফ্লস


প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না, তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]


Facebook Comments Box