পালিয়ে সিনেমায়…

ইরাজ আহমেদ

স্কুল অথবা কলেজ ফাঁকি দিয়ে সিনেমা দেখার কালচারটা এই শহর থেকে কবে যেন বিদায় নিলো! অথচ ফেলে আসা সেই সময়ে ক্লাশ ফাঁকি দিয়ে সিনেমা দেখতে যাওয়া ছিলো মহা উত্তেজনার ব্যাপার। শুধু কি উত্তেজনা? সেই উত্তেজনার সঙ্গে জড়িয়ে থাকতো বুক ঢিপঢিপ, অ্যাডভেঞ্চারের মজা। কিন্তু এখন কোনো কিশোর, কিশোরী ক্লাস ফাঁকি দিয়ে, বাড়িতে মিথ্যা বলে সিনেমা দেখতে হলে চলে যায় কি না সন্দেহ আছে। সময় আসলে এমনই। বদলে যায় অথবা বদলে নেয় অনেক কিছু।
আমি লুকিয়ে প্রথম সিনেমা দেখতে যাই নবম শ্রেণীতে পড়ার সময়।বাবা সেই শৈশব থেকেই আমাকে সিনেমা হলে নিয়ে যেতেন সিনেমা দেখাতে। কিন্তু স্কুলে পড়ার সময় একা সিনেমা দেখার অনুমতি পাওয়ার কোনো প্রশ্নই ছিলো না। তাই একদিন স্কুল পলায়ন।মনে আছে, জোনাকী সিনেমা হলে প্রথম পালিয়ে ছবি দেখতে গিয়েছিলাম-সোফিয়া লরেন আর রিচার্ড বার্টন অভিনীতি ‘ক্যাসেন্ড্রা ক্রসিং’। সঙ্গে ছিলো চার বন্ধু। তখনও সিনেমার টিকেটের মূল্য হাজার হাজার টাকা ছিলো না। সামান্য টাকার টিকেট তবুও অনেক কষ্টে জোগাড় করতে হয়েছিলো। তখন ঢাকার সিনেমা হলে স্পেশাল শো বলে একটি শো চালু ছিলো দুপুর দেড়টা থেকে তিনটা পর্যন্ত।। ছিলো মর্নিং শো। প্রথম স্কুল ফাঁকি দিয়ে আমি মর্নিং শো তে সিনেমাটা দেখেছিলাম।
পালিয়ে সিনেমা দেখার জন্য আমার প্রিয় হল ছিলো মধুমিতা। একদা এই শহরে প্রচুর ইংরেজি সিনেমা মুক্তি পেতো। পৃথিবীখ্যাত সব সিনেমা আমরা দেখতে যেতাম এই সিনেমা হলে। মধুমিতা হলে সেই সময় মর্নিং শোতে সিনেমাগুলোর রিপিট শো দেখাতো। আমি তখন কলেজের ছাত্র। কলেজ পালিয়ে সোজা চলে যেতাম মধুমিতায়। কখনো বাড়ি থেকে বের হয়ে আর কলেজমুখোই হতাম না। তখন সিনেমা হল ছিলো অনেকের প্রেম করার জায়গা। প্রকাশ্যে ঢাকার পথে প্রেমিকা নিয়ে ঘোরার সুবিধা তেমন ছিলো না। কারণ শহরটা তখনও গায়ে মাথায় এতো বাড়েনি। পরিচিত মানুষদের চোখে পড়ে যাবার সম্ভাবনা ছিলো বেশী। তাই অনেকেই ভালোবাসার জন্য নির্জনতা খুঁজতে আশ্রয় নিতো সিনেমা হলে।
তখন সিনেমা দেখার জন্য আমাদের হাত খরচের টাকা বাঁচাতে হতো। আমার কলেজ জীবনে ঢাকায় শুরু হয়েছিলো ভিডিওতে সিনেমা দেখার সংস্কৃতি। পুরান ঢাকার বেগম বাজার এলাকায় চলতো ভিডিও ব্যবসা। হিন্দী সিনেমা দেখার অমোঘ আকর্ষণে বন্ধুরা মিলে চলে যেতাম বেগম বাজারে।সেখানে একটা শোতে টিকেটের দাম ছিলো দশ টাকা। সেই সামান্য টাকা জোগাড় করতেই আমাদের প্রাণান্তকর অবস্থা হতো। পালিয়ে সিনেমা দেখতে গিয়ে বহু বিপদেও পড়তে হয়েছে। এসব বিপদের তালিকায় এক নম্বরে ছিলো পরিচিত মানুষের মুখোমুখি হওয়া।এটাকে আমরা বলতাম ‘কমন পড়া’।কোনো সিনেমা হলের পাশের রাস্তায় হয়তো গা ঢাকা দিয়ে আছি, আচমকা মামা বা চাচা শ্রেণীর কেউ সে পথ দিয়ে যাচ্ছেন। ব্যাস, তার নজরে পড়ে যাওয়া। আর এই চোখে পড়ে যাবার পরিণতি ছিলো খবরটা বাড়ির লোকেদের কাছে চলে যাওয়া।একবার এক সিনেমা হলে ঢুকেছি সিনেমা দেখতে। সিনেমা শেষও হয়েছে।হলের আলো জ্বলতেই দেখি আমার এক কাকা দরজার দিকে এগিয়ে আসছে। আমি বসে ছিলাম বের হওয়ার দরজার পাশের সিটে। তাকে দেখে উঠে পালিয়ে যাবার অবস্থাতেও ছিলো না। তখন হঠাৎ পাশে বসা আমার বন্ধু বুদ্ধি দিলো দরজার পর্দাটা টেনে নিজেকে আড়াল করতে। যেই কথা সেই কাজ। আমি দরজার ভারী পর্দা গায়ে টেনে বসে রইলাম। আর সেই কাকা পাশ দিয়ে বের হয়ে চলে গেলেন। বন্ধুর কাছে শুনেছিলাম উনি খুব অবাক দৃষ্টিতে পর্দায় ঢাকা আমার দিকে তাকাচ্ছিলেন।
সিনেমা হলে আরেকটি বড় বিপদ ছিলো অন্য পাড়ার প্রতিপক্ষ ছেলেদের মুখোমুখি হয়ে যাওয়া। সেরকম অনেক ঘটনায় জড়িয়ে পড়েছি মারপিটে।
সেই সময়ে অভিবাবকদের মধ্যে একটা ধারণা ছিলো, ছেলেমেয়েরা বেশী সিনেমা দেখলে লেখাপড়া নষ্ট হবে। তাই হয়তো সিনেমা দেখার ওপর বাধা ছিলো বেশী। এখন প্রযুক্তির যুগ। এখন শিশু থেকে শুরু করে সবার হাতেই আছে মোবাইল ফোন আর ইন্টারনেটে অবাধ প্রবেশাধিকার। সিনেমা দেখার ব্যাপারটা চলে এসেছে সবার হাতের তালুতে। সেই কিশোরবেলায় ক্লাস পালানো, কলেজে প্রক্সি দেয়ার ব্যবস্থা করা, সিনেমা হলের পাশের গলিতে গা ঢাকা দিয়ে থেকে টুপ করে সময় বুঝে ঢুকে পড়া হলের অন্ধকারে-এসব কান্ড হারিয়ে গেছে এই শহরের জীবন থেকে। আসলে লুকিয়ে কিছু করার প্রয়োজনটাই এখন জীবন থেকে হারিয়ে গেছে। হারিয়েছে সেই অবৈধ আনন্দের স্বাদ।

ছবিঃ লেখক