পাহাড়ে পাহাড়ে পাখির কাকলি

এস এম এমদাদুল ইসলাম

রাস্কিন বন্ড ব্রিটিশ বংশোদ্ভূত ভারতীয় লেখক। বন্ডের জীবনের বেশির ভাগ সময় কেটেছে হিমালয়ের পাদদেশে পাহাড়ী ষ্টেশনে। তাঁর প্রথম উপন্যাস “দ্য রুম অন দ্য রুফ” তিনি লিখেছিলেন ১৭ বছরবয়সে এবং এটি প্রকাশিত হয়েছিলো যখন তার বয়স ২১ বছর। তিনি তার পরিবার নিয়ে ভারতের মুসৌরিতে থাকেন। Our Trees Still Grow in Dehra লেখার জন্য ১৯৯২ সালে তিনি সাহিত্য অ্যাকাডেমি পুরষ্কার পান। ১৯৯৯ সালে পদ্মশ্রী এবং ২০১৪ সালে পদ্মভূষণ পুরষ্কারে ভূষিত হন। তিরিশটির বেশি উপন্যাস লিখেছেন তিনি। লিখেছেন প্রচুর নিবন্ধও। রাস্কিন বন্ডের উপন্যাস ‘অল রোডস লিড টু গঙ্গা’ একটি আলোচিত উপন্যাস। প্রাণের বাংলায় এই উপন্যাসের ধারাবাহিক অনুবাদ করেছেন  এস এম এমদাদুল ইসলাম। ‘হিমালয় ও গঙ্গা’ নামে উপন্যাসের ধারাবাহিক অনুবাদ এখন থেকে প্রকাশিত হবে প্রাণের বাংলায়।

সমতলের চাইতে পাহাড়ে পাখি-দর্শন বেশি কঠিন। গাঢ় সবুজ গাছ-গাছালির ভিতর থেকে বা পাহাড়ের গায়ের পরিবর্তনশীল বর্ণ বৈচিত্রের ভিতর থেকে পাখিদেরকে আলাদা করা খুবই মুশকিল। সমতলের বড়ো পরিসরের বাগান বা খোলা মাঠ পাখি-পর্যবেক্ষণের জন্য সহজ; কিন্তু এখানে পাহাড়ে এক গাছ থেকে আরেক গাছে ফুরুৎ ফারুৎ লাফিয়ে বেড়ানো বাঁশপাতি (ফ্লাইক্যাচার) বা একটা ওক্ বা স্প্রুস গাছের কাণ্ড বেয়ে উঠতে থাকা ফোঁটাযুক্ত বাদামি ট্রিক্রিপার সনাক্ত করতে খুবই তীক্ষ্ণ চোখ থাকা চাই।তবে অল্প পাখিই নীরব থাকতে পারে, পাখিরা ডেকে উঠলেই তাদের অস্তিত্ব জাহির হয়ে পড়ে। পাহাড়ে পাখির কুজন আপনার নিত্য সঙ্গী, পাদদেশ থেকে গাছের সারি বরাবর পাবেন পাখিদেরকে। এক ঝলক দেখতে না পেলেও কলকাকলিই আপনাকে বেশি সাহায্য করবে এদেরকে চিনতে।
বসন্তবৌরি সেই জাতের পাখি যাকে দেখা যাওয়ার চাইতে শোনা যায় বেশি। গরমকালে হিল-স্টেশনে বেড়াতে আসা দর্শনার্থীরা এই পাখির একঘেয়ে জোড়ালো, পি-ওহ, পি-ওহ, বা আন-নি-আউ, আন-নি-আউ নিশ্চয়ই শুনবেন। মানুষ হয়তো গাছের উঁচুতে বসে থাকা পরিবেশের সঙ্গে প্রায় মিশে থাকা পাখিদের দেখতে পায় না।কিন্তু এদের আওয়াজ প্রায় আধামাইল দূর থেকে শোনা যায়, তবে ডাকার সময় এরা অনবরত এদিক ওদিক মাথা ঘোরায়, ফলে কোত্থেকে যে ডাকছে তা আন্দাজ করা কঠিন হয়ে পড়ে।
বসন্তবৌরিদের যেন নিজেদের কণ্ঠ শুনতে খুব পছন্দ। একটা ডেকে উঠলে আশেপাশের গাছ থেকে আরো দু-তিনটে জবাব দেয় ততোধিক জোরালো কণ্ঠে। মিলনের সময় প্রায় সব পাখিই জোরে আওয়াজ করে ডাকে, কিন্তু বসন্তবৌরি সারা বছরই তা করে।
বসন্তবৌরির কণ্ঠ কারো কাছে ভাল লাগে, আবার কারো কাছে নয়। গাড়োয়াল হিমালয়ের কোথাও কোথাও এমন কথা চালু আছে যে এই পাখি এক সুদখোর অর্থলগ্নিকারীর আত্মা ধারণ করে আছে। ওই সুদখোর এক মামলা হারার পর থেকে অনন্তকাল ধরে ডেকে চলেছে, আন-নি-আউ, আন-নি-আউ! মানে, ‘অবিচার, অবিচার’।
বসন্তবৌরি উষ্ণাঞ্চলের সর্বত্র দেখা যায়, তবে সবার সেরা বোধহয় হিমালয়ের এই বড়ো বসন্তবৌরি। ফুটাধিক লম্বা পাখিটি প্রায় টুকান-এর মতো মস্ত হলুদ চঞ্চুবিশিষ্ট। মাথা ও ঘাড় উজ্জ্বল বেগুনি, জলপাই রঙা পিঠে চাঁপা সবুজের দাগ। নীল, বাদামি ও হলুদের পরশ সহ পাখাদুটো সবুজ। এতসব রঙের বাহার থাকা সত্ত্বেও বসন্তবৌরিকে গাছের পাতার শ্যামল পটভূমিতে খুঁজে পাওয়া শক্ত। এরা গাছের উঁচুতে চড়ে থাকে, কমই নেমে আসে মাটিতে।
‘হজসন-এর ধুসর-মাথা ফ্লাইক্যাচার-ওয়ার্বলার’, পক্ষিবিশারদরা এতবড়ো একটা নাম রেখেছেন যার সে একটা ছোট্ট পাখি। খুব দেখতে না পেলেও পশ্চিম হিমালয়ে এদেরকে শুনতে পাওয়া যায় বেশ। নৈনিতাল ও ডালহৌসির মধ্যকার যেকোনো হিল-স্টেশনে এদের ডাক শোনা যাবেই। প্রতি দুইটা গাছের একটিতে এদের উপস্থিতি টের পাওয়া যাবে, দেখা না গেলেও।
এদের সঙ্গীত (যদি তা বলা যায়) খুব শ্রুতিমধুর নয়। এ সম্পর্কে ডগলাস ডেওয়ার-এর লেখা পড়লে আরেক কথা মনে পড়ে। একটা তৃতীয় শ্রেণির সঙ্গীত মঞ্চালয়ে আগত শ্রোতাদের উদ্দেশে একটা ঘোষণা ছিলো: ‘শ্রোতাম-লিকে বিশেষভাবে অনুরোধ করা যাচ্ছে যে তারা যেন পিয়ানোবাদকের প্রতি কোনো বস্তু নিক্ষেপ না করেন। তিনি তার যথাসাধ্য চেষ্টা করছেন।’
আমাদের খুদে ওয়ার্বলারটিও তার যথাসাধ্য চেষ্টা করে অবিরাম চার-পাঁচটা বেসুরো কর্ণবিদারী বোল তোলে।
আকারে সে একটা চড়াই থেকেও ছোটো, চার ইঞ্চির মতো লম্বা, যার এক-তৃতীয়াংশ শুধু লেজ। তার শরীরের নিচের দিকটা উজ্জ্বল হলুদ, উপরে জলপাই রং; মাথা ও ঘাড় ধূসর, চোখের উপরে ঘি-রঙা ভ্রু। চঞ্চল এই ছোট্ট পাখিটি কখনো একা, আবার কখেনো সঙ্গী-সাথী সহ ডালে ডালে দপে বেড়ায় ছোটো-বড়ো পোকামাকড়ের খোঁজে। যেভাবে এরা এক ইঞ্চি লম্বা বিছাকে মুখে পুরে, তা দেখলে দক্ষ স্পাঘেটিভোজীরাও চমকিত হবেন।
চড়াই মাপের আরেকটা ছোটো পাখি হলো সবুজ পিঠওয়ালা তিত। এটাও অনবরত কিছুটা ধাতব কণ্ঠে ডাকে, মোটেই বেসুরো ডাক নয়, যেন বলে-চুমু খাও, চুমু খাও, চুমু খাও…।
অন্য আরেকটা সুন্দর পাখি হলো সানবার্ড, কুমায়ুন ও গাড়োয়ালে এদেরকে পাওয়া যায়। তবে গানের রাজা বোধ হয় ধূসর ডানার ঊঝেল বা শালিখ জাতীয় এক পাখি। গ্রীষ্মের শুরুটা সে তার মিষ্ট সুরে পাহাড়ি বনাঞ্চল মাতিয়ে রাখে। পাহাড়ি লোকেরা একে কাস্তুরা বা কাস্তুরি বলে ডাকে, এটা অনেকটা হিমালয়ের শিস দেয়া থ্রাসের মতো পাখি। তবে হিমালয়ান থ্রাসের চঞ্চু হলুদ রঙের, আর এরটা লাল, তাছাড়া এর ডাক অনেক মিষ্টি।
নাইটজার (পুরোনো নাম গোটছাকার) এমন পাখি যারা রাতেরবেলা বনের ছায়ায় লুকিয়ে থাকে, সন্ধ্যার পরে নীরবে উড়ে আসে পোকা-মাকড় শিকারে। এদের মুখটা ব্যাঙের মতো বড়ো, তবে এদের প্রধান বৈশিষ্ট হলো লম্বা লেজ, ডানা, আর অবাক করা রকম নিঃশব্দে ওড়া। সন্ধ্যার পরে ও ভোর হবার আগে আপনি এদের টঙ্ক-টঙ্ক, টঙ্ক-টঙ্ক-কাঠের তক্তার উপরে হাতুরির বাড়ির মতো ডাক শুনতে পারেন।
সমতল ছেড়ে পাহাড়ে উঠতে উঠতে ভ্রমণকারীরা পাখির ধরনের পরিবর্তন লক্ষ্য করবেন।
রাজপুর থেকে মুসৌরি পায়ে চলা পাঁচ মাইল দূরত্ব, এতটুকু পথেই এ মাথা থেকে ও মাথা যেতে পাঁতিকাকের চিকন ডাক পরিবর্তিত হয়ে মোটা গলার দাঁড়কাকের ডাক শোনা যাবে। পরিবর্তনশীল স্বরমাত্রায় ডাকা কোয়েলের জায়গায় কোকিলের ডাক কানে এসে লাগবে। বাদামি ঘুঘুর পরিবর্তে কোক্লা সবুজ কবুতরের সুরেলা কণ্ঠে ডেকে ওঠা শুনবেন। কর্কশ গলার গোলাপি চক্রওয়ালা প্যারাকিটেরা বদলে যাবে কোমল কণ্ঠিস্লেট রঙা কাকাতোয়ায়। উঠে আসার পর বেসুরো গলার সেভেন-সিস্টার আর ঝোপ থেকে উড়ে আসবেনা, পরিবর্তে দেখবেন কিছুটা হলেও সুরেলা গলার ছোপওয়ালা হিমালয়ান লাফিং-থ্রাস।
প্রথম যখন পাহাড়ে আসি বসবাসের জন্য তখন হিমালয়ের শিস দেয়া থ্রাসই আমার মনোযোগ কেড়েছিলো। প্রথমদিন পাখিটিকে দেখতে পাইনি আমি। পুরনো পাথরের কুটিরটির নিচে গিরিখাদের গাঢ় ছায়ায় লুকিয়ে ছিলো সে। পরের দিন জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে আখরোট গাছে ও নাসপাতি গাছে কচি পাতার আগমন দেখছিলাম। চারিদিক শুনসান, বাতাস থেমে আছে, ঘোর হয়ে আসা আকাশের নিচে পর্বতমালা স্বগাম্ভীর্যে তাদের উপস্থিতি জানাচ্ছে। ঠিক সেই সময় নিচের আঁধারে ডোবা রহস্যময় গহ্বর থেকে ভেসে এলো অবর্ণনীয় মিষ্টি সুরের শিস-থ্রাসের।
এ এমন এক সঙ্গীত যা শুনে আমি শিহরিত ও মুগ্ধ না হয়ে পারি না। প্রথমে আনারি বালকের মতো ভাঙা ভাঙা শিসে শুরু করে সে, তারপর একসময় যেন হঠাৎ সুর খুঁজে পেয়ে আস্থার সঙ্গে গলা চড়িয়ে গেয়ে ওঠে স্বর চড়াতে চড়াতে, তারপর বৈচিত্রময় মিষ্টি সুরের শিসে ভরিয়ে দেয় পাহাড়ের উপকণ্ঠ। হঠাৎ সে সঙ্গীতের পর্বের মাঝে থেমে যায়, আমি অবাক হয়ে ভাবি- কী হলো পাখিটার।
প্রথমেতো পাখিটাকে দেখতে পাইনি, শুধু ওর গান শুনেছি। পরে একদিন বাগানের ভাঙা বেড়ার উপরে বসা দেখলাম তাকে। চকচকা গাঢ় বেগুনি গায়ের রং, ঘাড়ের কাছে সাদাটে; কালো পা জোড়া সবল এবং মজবুত হলুদ চঞ্চু। পরিপাটি এক ভদ্রলোক, শুধু হ্যাট পরাটা বাকি মাথার উপরে। আমাকে আসতে দেখে পাখিটি একটা তীক্ষ্ণ ‘ক্রীই-ই…আর্তনাদ করে দ্রুত উড়ে গেল নিচে ছায়া-ঢাকা গিরিখাদের দিকে।
মাসের পর মাস গত হয়েছে এবং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পাখিটির আমার কাছাকাছি আসার সঙ্কোচ কমেছে। একদিন বৃষ্টির পানি নিস্কাশনের পাইপটির ভিতরে ময়লা জমে আটকে যাওয়ায় সিঁড়ির কাছে একধরনের স্থায়ী জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হলো। শিস বাজানো থ্রাসটির জন্য এটি হয়ে গেলো তার প্রিয় স্নানাগার। ভ্যাপসা কোনো গ্রীষ্মের বিকেলে আমি হয়তো উপরতলায় দিবানিদ্রা নিচ্ছি, সেই সময় পাখিটি এসে সেই জমাট বৃষ্টির পানিতে ডানা ঝাপটাচ্ছে। গোসল শেষে তৃপ্ত পাখিটি এবার টিনের চালে এসে বসে রোদ পোহাতে পোহাতে আমাকে তার সুমধুর কণ্ঠের এক গান শুনিয়ে দেবে।
গোয়ালা গোবিন্দ একদিন আমাকে সুরেলা শিস দেয়া থ্রাসের গল্প শুনিয়েছে, গাঁয়ের লোকেরা একে কাস্তুরা বা কৃষাণ-পাত্তি বলে ডাকে।
লোককাহিনী অনুযায়ী ভগবান কৃষ্ণ একদিন একটা নদীর ধারে নিদ্রা যাচ্ছিলেন, তখন এক বালক তাঁর সুবিখ্যাত বাঁশিটি নিয়ে চম্পট দেয়। ঘুম ভেঙে বাঁশি না পেয়ে কৃষ্ণ ভীষণ ক্রুদ্ধ হন এবং চোরটিকে তিনি পাখিতে রূপান্তরিত করে দেন। একবার-দুবার ফু দেয়াতে বালকটি কৃষ্ণের চমৎকার বাঁশিটা কিছুটা বাজাতে শিখে গিয়েছিলো। তবে তার শেখা সুন্দর ও পরিপূর্ণ হয়নি, তাই পাখিটি (শিস তোলা থ্রাস) শিস দিতে গিয়ে যেন সুর ভুলে গিয়ে মাঝে মাঝে আচমকা থেমে যায়।
অল্প দিনেই আমার সুরেলা শিস দেয়া থ্রাসের সঙ্গিনী জুটে গেলো, দেখতে অবিকল একরকম (সূক্ষ্ম পার্থক্য কিছু হয়তো রয়েছে, কিন্তু তা আমার মতো আনাড়ির চোখে ধরা পড়েনি)। এরা কখনো একক সঙ্গীত পরিবেশন করতো, আবার কখনো বা দ্বৈত গীত। আমি বুঝতে পারতাম যে এগুলো হচ্ছে প্রেমাহ্বান, কারণ অল্প দিন পরেই তারা সংসার রচনার জন্য উপযুক্ত আবাস খুঁজতে গিরিখাদের দিকে ডানা মেলতে শুরু করে দিয়েছিলো।
পাহাড়ে প্রায় তিন বছর কাটানোর পরে আমি নিশ্চিন্ত হয়েছিলাম যে এইগুলো হচ্ছে সব ঋতুর পাখি। মাঝ গ্রীষ্মে তারা সেরা, তবে শীতের সময়েও, মাটি থেকে তুষার মিলিয়ে যাবার আগেই, পাইন গাছ থেকে পত্রহীন আখরোট গাছে ওড়াউড়ি করতে করতে তারা গান গেয়ে উঠবে।
আমি যখন এই লেখাটি লিখছি তখন একটা ঝড়ো হাওয়া উঠেছে, প্রবল বাতাস গাছে গাছে শোঁ শোঁ আওয়াজ তুলেছে, ঘুরপাক খাচ্ছে উপরে রান্নাঘরের চিমনির চারপাশে। দূরে বিজলীর আওয়াজে ঝড়ের সংকেত। কিন্তু তা সত্বেও প্রবল বাতাসে উড়তে থাকা শিস দেয়া থ্রাসের মিষ্টি সুরে একে অপরকে আহ্বান থেমে নেই।
শিস দেয়া থ্রাসেরা সাধারণত পানির কাছাকাছি কোথাও পাথুরে তাকে বাসা বাঁধে। তবে এই পাখি দম্পতির সঙ্গে আমার বিশেষ সখ্যের কারণে তাদের মাথায় অন্য খেয়াল এসে থাকতে পারে। সম্প্রতি আমি পক্ষকালের জন্য মুসৌরির বাইরে গিয়েছিলাম। ফিরে এসে জানালা খুলতে গিয়ে দেখি জানালার বাইরের তাকে ফার্ন, ছত্রাক, ঘাস, মাটি, শ্যাওলা, এসবের একটা পুটুলি জমানো। কাঁচের ভেতর দিয়ে দেখে আমার বোধ হলো যে এগুলো আসলে একটা পাখির বাসা।
জানালা খোলার আর উপায় নেই, তাতে পাখির বাসা নিচে পড়ে ধ্বংস হবে। সৌভাগ্যক্রমে আমার ঘরে আরেকটি জানালা ছিল। সেটিকেই খুলে দিলাম আলোবাতাস আসা, পাখির কুজন, আর ডাকপিয়নের ডাক শুনতে পাওয়ার জন্য। ডাকপিয়নের ডাকা পাখির কুজনের মতো মিষ্টি না হলেও এই লেখকের কানে তা মধুর, কারণ মাঝেমধ্যে সে এক-আধটা চেকনিয়ে আসে বটে। প্রকৃতির কোলে বসবাস সম্ভব করার জন্য সেটার প্রয়োজন আছে বৈকি!
আজ দেখলাম গোজামিলের পাখির বাসার মাঝখানে শ্যাওলার মধ্যে ছিট ছিট দাগওয়ালা গোলাপি রঙের তিনটিপাখির ডিম। বাবা, মা, দুই পাখিই ফুরুৎ ফারুৎ আসা যাওয়া করে, আসন্ন ভবিষ্যৎ বংশধর আসার জন্য দুজনই তৈরী।
জংলা চেরি গাছ আমি নিজ হাতে লাগিয়েছি বিশেষ করে পাখিদের জন্য। ছোটো ছোটো পাখিরা ফুল ও ফল দুটোর জন্যই আসে গাছগুলোতে।
গাছগুলো যখন গাঢ় গোলাপি রঙের ফুলে ছেয়ে যায়, তখন সবচেয়ে বেশি যে পাখিটি আসে সেটি হলো হলুদ পিঠের টুনটুনি (সানবার্ড)। কিচির মিচির সুরে গাইতে গাইতে এরা এ ডাল ও ডাল করে বেড়ায়। সরু, লম্বাটে চঞ্চু লাগিয়ে কখনো ডানা ঝাপটাতে ঝাপটাতে ফুলের ভিতর থেকে মধু টেনে আনে, কখনো বা ডাল আঁকড়ে ধরে ঝুলতে ঝুলতে তা করে।
কোনো কোনো নিরামিষভোজী যেমন মাঝেমধ্যে একটু মাংস চেখে দেখে, তেমনি এই টুনটুনিও (বসন্তবৌরির মতো) তাদের খাদ্যাভ্যাস বদল ক’রে পোকামাকড় ধরে খায়। ছোটো মাকড়সা, বিছা, গুবরেপোকা, মাছি, ইত্যাদি এদের শিকার হয়। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এসব কীট-পতঙ্গ চেরি ফুলের আকর্ষণেই আসে। আমি এই পাখিদের ফুল ছেড়ে উড়ে গিয়ে পোকা ধরে খেতে দেখেছি।
ফ্লাইক্যাচার-রা বেশ জমকালো ধরনের পাখি, বিশেষ করে লম্বা লেজওয়ালা দুধরাজ (প্যারাডাইজ ফ্লাইক্যাচার)। এরা মূলত পোকামাকড়ভোজী হলেও, এরাও স্বাদ পরিবর্তনের জন্য ফল খেয়ে থাকে। জংলা চেরির টক ফলগুলো পাকলে এরা মাঝে মধ্যে আসবে ফল খেতে। গাছের শাখার উপর দিয়ে উড়ে বেড়াবার সময় এরা স্বভাবসুলভ কিচিরমিচির করবে জোরালো গলায়, আর পুরুষ পাখি থেকে থেকে গেয়ে উঠবে সুরেলা কণ্ঠে তার শাহ্ বুলবুল নাম সার্থক করে। উত্তর ভারতে এই নামেই পরিচিত সে।

ছবি: গুগল