পিঠা-পুলির গন্ধে মাতাল…

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

প্রভাতী দাস

দেখা পোষায় না। আর গত কয়েকদিন ধরে পিঠ বানানোয় পেয়েছে। ইউটিউবে চিতই পিঠার বিভিন্ন রেসিপি দেখে দেখে চেষ্টা করেই যাচ্ছি, কিন্তু ঠাম্মার হাতের বানানো পিঠার মতো হচ্ছে না কিছুতেই। আজকের তৃতীয় রেসিপিতে এখন। মেয়েরা দু একবার এসে ঘুরে দেখে চলে গেছে, পিঠা ওদের কাছে, একটা ডেজার্ট আইটেম, এর বেশী খুব বিশেষ কোন অর্থ বহন করে না। আর আমার কাছে পিঠা মানে একটা উৎসব, পিঠা মানে শীতের রাতে চুলোরা গুলের পাশে ছোট্ট পড়িতে গুটিসুটি হয়ে বসে মা আর ঠাম্মার পিঠের নানা কৌশল অথবা পিঠা সম্পর্কিত গল্প শোনা, সবার আগে প্রথম পিঠাতে কামড় বসানোর অস্থির অপেক্ষা। আমার বরাবরই ধারনা ছিলো চিতই পিঠা বানানো তেমন কঠিন কোন কাজ নয়। চালের গুড়ো লবণ আর জল দিয়ে গুলে ছাঁচে ফেলে দিলেই হয়ে গেলো চিতই। পাটি সাপটা, পুলি পিঠা বরং অনেক কঠিন। প্রবাস জীবনে আপাত কঠিন পাটিসাপটা খুব অনায়াসে বানিয়ে ফেলেছি অনেক আগেই। কিন্তু আপাত সহজ চিতই পিঠা যেন আর হয়-ই না। চিতই পিঠা বানাতে গিয়ে কাঠের আগুনে আর কুপির আগুনে আশি-উত্তীর্ণ ঠাম্মার কপালের ভাঁজগুলো স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছিলাম আবার এতো বছর পরে।

সারাদিন ধরে বারবার এই চাল, ঐ চাল ভিজিয়ে, ব্লেন্ডারে ব্লেন্ড করে লবণজল মিশিয়ে চিতই’র ছাঁচে দিয়ে পিঠাবানাতে গিয়ে পিঠা বানানোর সেইসব দিনগুলোতেই যে বাস করেছি আজ সারাদিন…। নতুন আতপ চাল, খেজুর গুড় আর নারকেলের পিঠা পিঠা ঘ্রাণ নাকে এসে লাগতো গেটের দরজা খুলে উঠানে পা দিতেই। – ঠাম্মা, তোমরা কি করো রান্না ঘরে এখনও? – বইন আজ পিঠা বানামু রে, চালের গুড়া করমু। চাল ভিজাই, পিঠার যোগাড় যন্ত্র করি। – ও কি মজা! কি পিঠা বানাইবা ঠাম্মা? – দেখবিনি, যখন বানাই। এখন তাড়াতাড়ি খওয়ার ভেজাল শেষ কর। ঠাম্মাকে জিজ্ঞেস করে নিশ্চিত হয়ে খুশিতে দ্রুত খেয়ে একছুটে বেড়িয়ে পড়তাম খেলার উদ্দেশে। অগ্রহায়ণ বা পৌষের নিভে আসা আলোর এইসব বিকেল গুলোতে স্কুল শেষ করে বাড়ি ফিরেই দেখা যেতো, মা বা ঠাম্মা তখনো রান্না ঘরে ব্যস্ত। অন্যসব দুপুর গুলোর মতো খাওয়া শেষ করে একটু গড়িয়ে নেয়ার জন্য কাঁথা গায়ে বিছানায় আশ্রয় নেননি। দু’জনেই তখনো রান্না ঘরে আমাদের স্কুল থেকে এসে খেয়ে নেয়ার অপেক্ষা করতে করতে চাল মাপছেন, কত সের আতপ চাল আর কত সের সেদ্ধ চাল, কতটি নারকেল, কত সের গুড়, কী কী পিঠা; এইসবের হিসেব নিকেশে ব্যস্ত। মা এবং ঠাম্মা দুজনেই এঁটো মানতেন খুব, আমাদের দেশী ভাষায় যাকে বলা হতো, ‘শকরা’।

শকরা মানে মাছ, মাংস, ভাত, তরকারি এসব…খাওয়ার পর থালা বাসন এসবও শকরা। পিঠা জাতীয় খাবার আবার শকরা না। কোনটা শকরা আর কোনটা শকরা না, সেটি আমার ছোট বুদ্ধিতে কুলতো না খুব, প্রায়ই শকরা বিচার-জ্ঞান না থাকায় জন্য মায়ের বকা খেতাম। পরে ধরে নিয়েছিলাম খাবার ঘরের বাইরে বসে যেসব খাওয়া যাবে, সেগুলো শকরা না, আর যেগুলো খাবার ঘরে বসে খেয়ে হাত ধুয়ে তবে ঘরে ঢুকতে হবে সেগুলো শকরা। যাকগে…পিঠা শকরা ছিলনা। তাই পিঠা বানানোর আগে, পুরো রান্না ঘর ভালো করে মুছে, মাছ-তরকারির হাড়ি-কড়াই তুলে…এককথায় শকরার ভেজাল ভেঙে তবেই মা শুরু করতেন চাল গুড়ো করার কাজ। থাম্বা বসতেন কোরানি নিয়ে নারকেল কোরাতে…। এতো হাঙ্গামা ছিলো বলেই হয়তো পিঠা বানানোর দিনগুলো খুব ঘনঘন আসতো না আমাদের বাড়িতে। যখন তখন ঠাম্মার কাছে বায়না ধরলেই পিঠা পাওয়া যেতো না। আর তখন পিঠা বানানোর জন্য-ও দেদার নিয়মকানুনও মানা হতো বাড়িতে। অগ্রহায়ণের নবান্নের উৎসবে দেবতার কাছে নতুন চালের গুড়ো, নতুন খেজুর গুড় আর নারকেল কোরা দিয়ে নবান্ন বানিয়ে পুজো দেবার পরই কেবল পিঠা বানানো যেতো, পুজোর আগে কিছুতেই পিঠা নয়। আরও অনেক নিয়ম মানতেন মা এবং ঠাম্মা। পূর্ণিমা- অমাবস্যা, গেয়াতি বাড়ীর জন্ম বা মৃত্যু… এই সমস্ত কিছুতে পিঠা হবে না। কেন জিজ্ঞেস করলে, উত্তর একটাই …অমঙ্গল হয়। পৌষ সংক্রান্তির পিঠার আয়োজন ছিলো অনেক বড়, সেটি নিয়ম করে পালন করা হতো, আর বাকী সময় বাবা বা আমাদের ভাইবোনদের আবদার অথবা মা অথবা ঠাম্মার ইচ্ছেতে। তাই পিঠা মানে ছিলো আমাদের উৎসব…! সেইসব স্কুল ফেরত বিকেলগুলোতে খেলতে যেতেও ইচ্ছে করতো না একটুও। পিঠার কাজে ব্যস্ত রান্না ঘরে বসে বসে এটা দিয়ে কি হবে, ওটা কখন হবে, সেটা কেন হবে, এইজাতীয় একগাদা হাবিজাবি প্রশ্ন করে মাকে বিরক্ত করে বকাও খেতাম অনেক। কিন্তু সব প্রশ্ন করা ফুরিয়ে গেলেও পিঠা ঠিক বানানো যেতো না। অতো দীর্ঘ সময় পিঠার অপেক্ষায় বসে থাকাটা যে কী কষ্টের ছিলো! খেলতে যাওয়াটাই ভালো, বুঝে গিয়েছিলাম দ্রুতই। খেলতে খেলতে কখন সময় পেরিয়ে যেতো টের পেতাম না। সেইসব শীতের বেলা ফুরিয়ে যেত দ্রুত।

সূর্য ডুবে যেতে যেতে ঘরে ঘরে সন্ধ্যে প্রদীপের আলো, কাসার ঘণ্টা আর আজানের ধ্বনির মাখামাখি সময়টাতে হঠাৎ খেলা বন্ধ হওয়ায় শীতে কাঁপন লাগা গায়ে ঘরের পথ ধরতাম। বাড়ী ফিরে কলতলায় পা ধুতে ধুতে দেখতাম, সন্ধ্যে প্রদীপের সঙ্গে সঙ্গেই পিঠার চুলোও জ্বলতে শুরু করেছে। মা হয়তো তখনো সদ্য গাইলে( ময়মনসিংহের আঞ্চলিক নাম, ধান চাল ভাঙ্গতে, গুড়ো করতে ঢেঁকির বদলে ব্যাবহার করা হয়) করা চালের গুড়ো চালতে ব্যস্ত। ঠাম্মা ইতোমধ্যেই পুলি পিঠার কাই তৈরি করে ভেজা কাপড়ের ঢেকে রেখেছেন, পাটিসাপটার পুর বানিয়েছেন নারকেল আর খেজুর গুড় জ্বাল দিয়ে। আর বড় গামলায় অনেকটা চিতই পিঠার গোলা তইরি করে রেখেছেন(আমাদের অঞ্চলে চিতই কে বলে সাজের পিঠা, সাজ বা ছাঁচে দিয়ে তৈরি করা হয় বলে)। অন্য গামলায় দুধে ভেজানো খেজুর গুড়, পাটিসাপটা অথবা পুয়া পিঠার(মালপোয়া) গোলা তৈরি হবে, মা করবেন; সে এক বিশাল কর্মযজ্ঞ। হাতমুখ ধুয়েই আমি চুলোর ধারে ঠাম্মার পাশ ঘেঁষে ছোট একটা পিড়ি নিয়ে বসে যেতাম। শীতের সন্ধ্যেয় কাঠের চুলোর আগুনের ওম আর পিঠার ঘ্রাণ, আমি কি পড়ার টেবিলে বসে থাকি সেদিন!

আমরা বাড়ি ফিরতে ফিরতে বাবাও বিকেলের অফিস সেরে হালকা বৈকালিক আড্ডা শেষ করে বাড়ি ফিরেছেন। বাবাও আমাদের মতো পিঠার ঘ্রাণে ম’ম’ করা বাড়িতে ফিরেই পিঠা খেতে চাইতেন। ঠাম্মা সে কারণেই বোধহয় চিতই পিঠার গোলাটা আগে ভাগে করে রাখতেন, পুরের জন্য কোরানো নারকেল থেকে কিছুটা নারকেল কোরা আর কুচানো গুড় আলাদা করে সরিয়ে রাখতেন। চিতই পিঠার গোলায় লবণ দেখার দায়িত্বটা প্রায়ই আমি পেতাম। বড় হাতা দিয়ে ঘন ঘন চিতই পিঠার গোলা নাড়তে নাড়তে ঠাম্মা মাঝে মাঝে মাকে জিজ্ঞেস করে নিশ্চিত হতেন, গোলার ঘনত্ব ঠিক আছে। ঠাম্মা আমাকে বোঝাতেন, গোলা ঠিক মত না হলে, পিঠা ভেতরে সেদ্ধ হবে না, অথবা ফুলবে না। আমি ঠাম্মার গোলার ঘনত্ব মাপা দেখতাম, গোল হাতা দিয়ে বারবার ভরে আর ঢেলে ঘনত্ব নিশ্চিত করার পরই চিতই পিঠার ছাঁচটা গনগনে কাঠের আগুনে বসিয়ে দিয়ে আগুন টেনে দিতেন।। ছাঁচগুলো মাটির, প্রতিবার শীতে মেলায় গেলে দুই একটি মাটির ছাঁচের ফরমায়েশ মায়ের থাকতই। আমি পাশে বসে বসে এক ছাঁচে কয়টা লম্বা আর কয়টা গোল পিঠে হবে সেসব গুনতাম। কাঠের আগুনে ছাঁচ গরম হতে হতে ঠাম্মা একটা বাটিতে সামান্য তেল আর জল মিশিয়ে নিয়ে তাতে নরম পুরনো কাপড়ের একটি টুকরো ভিজিয়ে নিতেন। এবার ছাঁচ মুছে দিতেন সেই তেল/জল ভেজানো কাপড়ে। গরম তেলজল ছাঁচে লাগা মাত্র ছ্যাঁতছ্যাঁত শব্দ হতো, আমরা বুঝতাম, অপেক্ষার শেষ প্রায়। ঠাম্মা বড় গোল হাতাটা দিয়ে, গামলার গোলা আবার ভালো করে নেড়ে তারপর হাতায় ভরে ছাঁচে ঢেলে দিতেন সাবধানে। আবারও ছ্যাঁতছ্যাঁত। তারপর ঢাকনা দিয়ে ঢেকে দিয়ে ঠাম্মা বসে থাকতেন। এই সময় ঠাম্মার ভাজ পড়া বয়েসী কপালে কয়েকটি চিন্তার ভাজও বুঝি ফুটে উঠতো, পিঠা ঠিকঠাক মতো হবে তো, ফুলবে তো, সেদ্ধ হবে তো…! আমিও প্রায় দম বদ্ধ করে বসে থাকতাম চুলোর পাশে…। কয়েক মিনিট পর ঢাকনা তুলে দেখে তবেই ঠাম্মার স্বস্তি… নাহ এবারের পিঠার গোলা ঠিকঠাক আছে। ছুরি বা খুন্তির কোনা অথবা হাতার ডাটা দিয়ে চারধার খুঁচিয়ে আলগা করে পিঠা তুলে, উপর করে দিয়ে আবার ঢাকনা দিয়ে দিতেন। এর মিনিট খানেক পর পিঠা তুলে নিতেন, চিতই পিঠা ভাজা সম্পন্ন। কিন্তু তখনো খাওয়া যেতো না সেই পিঠা, প্রথম পিঠাটি ছিঁড়ে ছিঁড়ে উঠানে ছড়িয়ে দিতেন ঠাম্মা। ভুত-পেত্নী, পিশাচ বা ডাকিনী-যোগিনি অন্য যারা যারাই অদৃশ্য লোক থেকে আমাদের মতো অধীর আগ্রহে পিঠা খাবার অপেক্ষায় ছিলো, তাদের সবার উদ্দেশ্যে এই পিঠা ছড়ানো। তারপর সেই ছেঁড়া পিঠাটি রেখে দিতেন চুলোর পাশ ঘেঁষে, চুলোকেও পিঠার ভাগ আগে দিয়ে তবেই…। ভুত-পেত্নী আর চুলোও যে পিঠা খায়, সেটা আমি মানতে না চাইলেও মা বা ঠাম্মার এ নিয়ে কোন সন্দেহ ছিলো না। চুলোর পাড়ে পিঠা রেখে দিয়ে ঠাম্মা শুরু করতেন আমাদের পিঠা বণ্টন। গোল আর লম্বাটে সাজের পিঠা থালায় বেড়ে তার পাশে একটু নারকেল কোরা আর কয়েক টুকরো গুড় দিয়ে সাজিয়ে পিঠার থালা বাড়তেন ঠাম্মা। বাবার জন্য সাজানো থালা নিয়ে রান্না ঘরের দুয়ার পেরিয়ে বড় ঘরে ঢুকতে ঢুকতে আমি সদ্য ভাজা সাদা চিতই পিঠার কয়েকটি এমনি এমনি খেয়ে নিয়েছি, গুড় বা নারকেল কোরার জন্য অপেক্ষার সময় কই আমার…। সাদা বা গুড় নারকেল দিয়ে চিতই পিঠা খাওয়ার আগ্রহ শেষ হয়ে যেতো অল্প কিছুক্ষণ পরেই। এবার অন্য সব পিঠাও চাই। কিন্তু চাইলেও সেসব অনেকদিন হয়তো পাওয়াই যেতো না।

বাকি সব পিঠা অনেক সময় সাপেক্ষ ছিলো। রান্না ঘরের ছবিটাও পালটে যেত সেই সময়টাতে। ঠাম্মা চিতই পিঠা বানানো শেষ করে মাকে চুলো ছেড়ে দিয়ে চলে আসতেন। মা এবার বসতেন চুলোর পাড়ে, পাটিসাপটা মা-ই বানাতেন বেশীর ভাগ সময়। লোহার কড়াই চুলোয় উঠতো, তেলে ভেজা ন্যাকড়ায় কড়াই মুছে গোল হাতায় করে সেই গোলা ঢেলে দিতেন মা কড়াইয়ের ঠিক মাঝখানে, তারপর কড়াইয়ের দুই আংটা ধরে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে গোল করে ছড়িয়ে দিয়ে আবার বসিয়ে দিতেন চুলোয়, টেনে এলেই ঠাম্মার বানানো নারকেলের পুর অথবা কখনও আগে বানিয়ে রাখা জমানো দুধের ঘন ক্ষীর দিয়ে দিতেন এক ধারে। তারপর ঝিনুকের ধার দিয়ে বটে বটে বানানো পাটিসাপটা। আমি তখনও চুলোর ধারে, মাঝে মাঝের পাটি সাপটার ঘোরানো দেখতে মায়ের হাতের এতো কাছে চলে যেতাম যে, তার কনুই এসে মুখে লাগতো। বকা খেয়ে একটু সরে বসতাম হয়তো, কিন্তু পিড়ি ছাড়তাম না। আমরা খাবার আগে আবারও পেত্নী আর চুলো খেত, তারপর আমরা। পাটি সাপটা পিঠা হয়ে যাবার পর রান্না ঘরের আগ্রহ কমে আসত আমার। দুই একটা পাটিসাপটা খাবার পর, পিঠা খাবার ইচ্ছেটাই চলে যেতো হঠাৎ। ঠাম্মা তখন হয়তো সেদ্ধ করা চালের কাই বেলে পুলি পিঠা(আমরা বলতাম কুলোই পিঠা) বানাতে শুরু করেছেন। মায়ের কাছ থেকে সরে ঠাম্মা কাছে বসে চালের রুটিতে নারকেলের পুর ঢুকিয়ে বাঁশের পাতলা চেলি দিয়ে কেটে কেটে পুলি বানানো দেখতে দেখতে আস্তে আস্তে ভাত খাবার ইচ্ছেটা তাকেই জানান দিতাম। ঠাম্মা হেসে বলতেন, -এই কয়টা পিঠা খাইয়াই মুখ মাইরা আইলো। এতো না খাবি খাবি করলি সারাদিন ধইরা! আমি মাথা নেড়ে নেড়ে সায় দিতাম, আর মিষ্টি খেতে পারছি না, এখন ভাত তরকারী আর অন্য সব লবণাক্ত খাবার চাই। ঠাম্মা পিঠার আয়োজন আপাতত গুছিয়ে রেখে, আমাদের রাতের খাবারের আয়োজন করতেন। সেদিন খুব সাবধানে খেতে হতো, কিছুতেই পিঠার আয়োজনে শকরা লাগানো যাবে না। খাওয়া শেষ হলে সব গুছিয়ে, হাতপা ধুয়ে মা ঠাম্মা আবারও তাদের পিঠার আয়োজনে ফিরে যেতেন। রাতের খাওয়া শেষ হয়ে গেলে, তাদের পিঠা ভাজার আর তেমন কোন তাড়া থাকতো না। আমি বেশীর ভাগ সময়-ই শেষ পর্যন্ত জেগে থাকতে পারতাম না, রাতের খাবারের পর পিড়িতে বসে ঢুলতে শুরু করতাম। মা এবং ঠাম্মা তখন ধীরে ধীরে, কোন বার কার বাড়িতে পিঠা বানাতে গিয়ে কোন অঘটন ঘটেছিলো, অথবা কাদের বাড়ির পাটিসাপটার পুরটা বিশেষ ছিলো, এই সমস্ত নিয়ে গল্প করতে করতে শুকনো খোলায় অথবা ডুবো তেলে পুলি পিঠা ভাজতেন, পুয়া পিঠে ভাজতেন। তাদের গল্প শুনবো বলেই জোর করে বসে থাকার চেষ্টা করতাম, তারপর একসময় ঘুমে ঢুলতে শুরু করলে ঠাম্মা তুলে বিছানায় নিয়ে আসতেন। পরদিন সকালে খাবারের সময় হলেই শুধু বুঝতাম, আরও কত পদের পিঠা তারা বানিয়েছেন।

খাবার ঘরে পিড়ি বিছিয়ে পাত পড়তো সবার। সাদা চিতই, পাটিসাপটা, শুকনো খোলায় ভাজা পুলি, তেলে ভাজা পুলি আর দুধ চিতই। পিঠা বাড়তে বাড়তে ঠাম্মা জানাতেন, কত রাত হয়ে গিয়েছিলো সব শেষ হতে হতে। আমি জানতাম, সব পিঠে বানান শেষ হলে বানানো হতো দুধ চিতই। বড় হাঁড়িতে দুধ জ্বাল বসিয়ে দিয়েই মা এবং ঠাম্মা সব গোছানো শুরু করতেন। পিঠা ঢেকে রাখতে রাখতে, কাজে পিঠার লাগা জিনিসপত্র গুছিয়ে তুলে রাখতে রাখতে দুধ জ্বাল হয়ে যেত। তাতে গুড় দিয়ে নেড়ে চেড়ে সাদা চিতই পিঠা দিয়ে দিতেন বেশ কিছু, কাঠের চুলোয় লাকড়ি পোড়া শেষ তখন, কয়লার আচে রান্না হতো দুধ চিতই। সে চিতই এর হাঁড়ি আগুন তুলে চুলোর উপড়েই রেখে আসতেন, হালকা ঢাকনা দিয়ে। সকালে হাঁড়ি ঘরে এনে বাকী সব পিঠের সঙ্গে থালায় বেড়ে দেয়া সেই সর পড়া ঠাণ্ডা চিতই পিঠে, বাবার ভীষণ পছন্দের, আমারও…। আমার তৃতীয় বারের চেষ্টার চিতই ভাজা শেষ করতে করতে প্রায় শেষরাত। আমার সঙ্গে জেগে পিঠা বানানোর এই স্মৃতির উৎসবে যোগ দেবার জন্য কেউ-ই জেগে নেই। তবুও মনেহল, দুধ চিতই বা বাদ যাবে কেনো? কুচানো খেজুর গুড় দিয়ে দুধ জ্বাল দিয়ে তাতে ছেড়ে দিলাম সদ্য ভাজা চিতই পিঠার কয়েকটি। দুধ চিতই’র হাড়িটা বন্ধ করা গ্যাসের চুলো থেকে নামিয়ে রাখতে গিয়ে কী মনে করে আবার চুলোর উপরে বসিয়ে রেখেই ঘুমাতে এলাম। বাইরে তখন অনেক ঠাণ্ডা, মধ্য ডিসেম্বরের তাপমাত্রা হিমাঙ্কের নীচে নেমে গেছে অনেকক্ষণ…।

ছবি: লেখক


প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না, তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]


Facebook Comments