পিরিয়ড নিয়ে শংকা কাটিয়ে মেয়েরা উড়ে বেড়াক

সাদিয়া নাসরিন

আমার বয়স তখন এগারো আর বারোর মাঝামাঝি। ক্লাস সেভেনে পড়ি। একদিন স্কুল থেকে বাসায় ফিরে ইউনিফর্মের সালোয়ার রক্তে ভিজে যেতে দেখে অদ্ভুত একটা ভয় গ্রাস করে ফেললো আমাকে। আর কি ভয়ানক নি:সঙ্গতা!! আম্মা বাড়িতে ছিলেন না, ঢাকায় খালার বাসায় গেছেন।

বিশাল যৌথ পরিবার, ঘর ভর্তি মানুষ। দাদি, চাচি, ফুফু সবাই আছে, অথচ একজন মানুষও নেই যাকে আমি এই ভয়ংকর ঘটনা জানাতে পারি। কি হয়েছে আমার? আমাদের স্কুলে তখন জ্বিন ভুতের উপদ্রপ মিথের মতো। আমাকে জ্বিনে ধরেছে? খারাপ কোন অসুখ হয়েছে? আমি কি কোন পাপ করেছি? এখন কি আমি মারা যাবো? আমার এখন কি করতে হবে? এরকম কি কালকেও হবে? হলে আমি কি করবো?

কিচ্ছু জানিনা। শুধু সিক্সথ সেন্স বলেছে, এমন আবারো হবে। পরের দিন স্কুলে যাওয়ার সময় ইউনিফর্মের নিচে তিনটা সালোয়ার পরলাম। সারাদিন ভয়ে কাঁটা হয়ে থাকলাম। বাসায় ফিরে দেখি তিনটা সালেয়ারই রক্তে ভেজা। তীব্র ভয় আর বিষন্নতা আচ্ছন্ন করে রাখলো আমাকে।

দাদি কি একটা কাজ করতে বলেছিলো। আমি ভুলে গেছি, তাই দাদি এসে মারলো। মারের ব্যথা, শরীরের ব্যথা, একাকিত্বের ব্যথা একসঙ্গে গিলে ফেললাম আমি। পরের দিনও এভাবেই কাটলো। তিনটা সালোয়ার পরে স্কুলে যাওয়া, ঘরে ফিরে বিষন্ন হয়ে থাকা, বারবার বাথরুমে যাওয়া….. ।

যখন মোটামুটি নিশ্চিত হয়ে গেলাম যে, আমি কোন পাপ করেছি বলে এরকম খারাপ একটা অসুখ আমার হয়েছে, এবং আমি মারা যাচ্ছি, তখন আম্মা এলো। কিন্তু আমার এই বিষণ্ণতা, ভয়, একা একা পালিয়ে বেড়ানোর কিছুই আম্মার চোখে পড়লোনা!! আমি একা একা ভয় আর বিষণ্ণতার সঙ্গে কিভাবে যেনো আরো দু’দিন কাটিয়ে দিলাম।

এই বিশ্বসংসারের কেউ কিচ্ছু টের পেলোনা। না আমি, না আমার সব চেয়ে ভালো বন্ধু বলে দাবী করা আম্মা, না আব্বা, এমন কি আমার পিঠের ছোট বোন, কেউ টের পেলোনা কি ভয়াবহ একাকিত্ব আর ভয়কে সঙ্গী করে আমি চুপচাপ একদিন নারী হয়ে গেলাম। যেভাবে এ দেশের লক্ষ লক্ষ মেয়ে ভয়, পাপবোধ, গ্লানি আর বিষন্নতার হাত ধরে চুপচাপ নারী হয়ে যায়।

তারপর সব চুপচাপ। ছ’ মাস পরের ঘটনা। আমার বয়স বারো প্লাস তখন। ক্লাস এইটে ওঠেছি। এক সকালে আমার স্কার্টের পেছনে রক্তের দাগ দেখে আম্মা আর এক আপা আমার উপর পুলিশি তল্লাশি শুরু করলেন। কি হয়েছে !!! যৌথ তল্লাশি শেষে আম্মা আর আপা নিশ্চিত হলেন, ঘটনা ঘটেছে!! পিরিয়ড হয়েছে!! এই তল্লাশি কার্যক্রমের পুরোটাতে আমি ছিলাম চুরির দায়ে ধরা পড়া তীব্র অপমান বোধের অনুভূতির মধ্যে।

আমি তখনো জানিনা এই ঘটনা ছ’মাস আগের ঘটনার ধারাবাহিকতা। আমি হতভম্ব। কাউকে বলতেও পারছিনা এমন একটা ঘটনা আগেও ঘটেছে আমার জীবনে। যাই হোক, আম্মা গোসল করিয়ে কাপড় ঠিকঠাক করে দিলেন। বললেন, বাড়ির বাইরে যাওয়া নিষেধ। তরকারী খাওয়া নিষেধ।

এ ক’দিন শুধু দুধভাত, তাও চিনি ছাড়া। কারো বিছানায় ঘুমানো নিষেধ, আমার জন্য আলাদা বিছানা হলো। আমার আদরের ছোট ভাই, ওর কাছে যাওয়া যাবেনা। যে কাপড় ব্যবহার করতাম সেটি ধুয়ে মেলে দিতে হবে আলনার পেছনে যেন দেখা না যায়৷ আমি তখন অচ্ছুত! এবার আমি নিজেও বিশ্বাস করলাম সত্যিই আমি পাপ করেছি।

আব্বা বাসায় এসে শুনলেন। বিকেলে ঘুমের মধ্যে শুনি আব্বা আমার পায়ের কাছে বসে দোয়া পড়ছেন আর আমার গায়ে ফু দিচ্ছেন। মেয়ে বড় হলে নাকি বাবাকে নতুন কাপড় দিতে হয়, তাই আব্বা একটা বেগুনী রঙের সালোয়ারের কাপড় কিনে আনলেন। সে-ই আমার এই জীবনে আব্বার হাতে করে আনা একমাত্র উপহার। ওইসময় একমাত্র আব্বাই আমাকে অপবিত্র মনে করেননি। তবে দাদিকে এই খবর দিতে গিয়ে আব্বা বলেছিলেন,‘আমার মেয়েটা মরে গেছে’। মরে গেছে!!!

আব্বাই বোধয় সবচেয়ে ভালো বুঝেছিলেন, এই অসভ্য সমাজে মেয়েদের পিরিয়ড হওয়া মানে মরে যাওয়া। যে নারীত্ব স্বাভাবিক, সুন্দর, গৌরবের, সে নারীত্ব এখানে নিরন্তর গ্লানি, পাপের বোধ আর মৃত্যুর ভয়াবহতা নিয়ে আসে। যে রক্তপিন্ড থেকে মানুষের জন্ম হয়, সভ্যতার বিস্তার হয়, সে রক্তপিন্ডকে দুষিত অপবিত্র ভাবা হয় এখানে। এই সময়ের একাকিত্ব, বিষন্নতা আর পাপবোধে আক্রান্ত হয়ে যে কতো কিশোরী আত্মহননের পথ বেছে নেয় সে হিসেব আমাদের হাতে নেই।

আমরা জানিনা, এখনো বাংলাদেশে মাত্র ১৩ শতাংশ মেয়ে স্যনিটারি ন্যপকিন ব্যবহা্র করে । ৪০ শতাংশ ছাত্রী প্রতি মাসে পিরিয়ডের সময় কমপক্ষে তিন দিন স্কুলে অনুপস্থিত থাকছে। পিরিয়ডের প্রচণ্ড ব্যথায় আক্ষরিক অর্থেই মাটিতে গড়াগড়ি দিয়ে কাঁদতে দেখেছি আমি অনেক মেয়েকে ৷ কর্মজীবি নারীরা মাসের এই সময়ের তীব্র ব্যথাকে নীরবে হজম করে কাজ করতে বাধ্য হচ্ছেন।

দিন অনেকটা পাল্টেছে। এই আমরাই পাল্টিয়েছি। আমি দিনের পর দিন কথা বলে আমার মেয়েকে প্রস্তত করেছি পিরিয়ড নামের অনিবার্য বাস্তবতার জন্য। স্যানেটারি টুলকিট রেডি করে হাতের কাছে রেখেছি তার বয়স দশ পার হতেই। প্রশিক্ষণ দিয়ে রেখেছিলাম কিভাবে প্যাড ব্যবহার করতে হয়, যেনো আমার অনুপস্থিতিতে পিরিয়ড হলে সে সামলে নিতে পারে। এই বিশেষ সময়ের জন্য তৈরী করেছিলাম ওর বাবাকে, ছোট ভাইকেও। যেনো মেয়ে বিশেষ প্রয়োজনের কথা তার বাবাকে বা ভাইকে জানাতে পারে।

ছেলেকেও সাথে রেখে বুঝিয়েছি, মেয়েদের প্রতিমাসে পিরিয়ড হয়, তখন তাদের খুব কষ্ট হয়, ঠিকমত বিশ্রাম দরকার হয়, খাওয়া দরকার হয়, প্রিভেসি দরকার হয়, পরিচ্ছন্ন থাকা দরকার হয়। সবচেয়ে জরুরীভাবে যেটা শিখিয়েছি তা হলো, যেহেতু ওরা কো-এডুকেশনে পড়ে, স্কুলে কোনো মেয়ের জামায় দাগ দেখলে তা নিয়ে যেনো কোন বাজে মন্তব্য না করে, যতটুকু সম্ভব বন্ধুর যত্ন নেয়।

সময় এসেছে পাল্টাবার। বদলাতে হবে ঘর থেকেই। আলোচনা করুন, কথা বলুন পরিবারেই। পিরিয়ড নিয়ে ভয় শংকা কাটিয়ে মেয়েরা উড়ে বেড়াক জীবনের দিগন্তে। পিরিয়ড নিষিদ্ধ কোন বিষয় নয়, পাপ নয়, গ্লানিও নয়।সঠিক সময়ে পিরিয়ড হওয়াটা একটি মেয়ের শারীরিক ও মানসিক সুস্থতার পূর্বশর্ত।

কথা হোক, ট্যাবু ভাঙ্গুক। সুস্থ থাকুক নারী, সুস্থ থাকুক পরিবার, স্বাভাবিক হোক নারীত্ব।

ছবি: গুগল