পুজোর গন্ধ…

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

সুদীপা চ্যাটার্জি

(কলকাতা থেকে): ছাদে আজ বাঁশ পড়লো, আর একতলায় রান্নাঘর প্রায় রেডি। প্যান্ডেল শুরু হবার আগের এই দিনটা যেন আর পাঁচটা দিনের চেয়ে এক্কেবারে আলাদা। সারা দুপুর কাঁচের জানলা দিয়ে চেয়ে চেয়ে দ্যাখা- দড়ি বেঁধে ছাদে বাঁশ তোলা হচ্ছে। আজ আমার আদিও-জানলায় দাঁড়িয়েই দুপুরের খাওয়া সেরেছে। কিছু একটা টের পেয়েছে বোধহয়।জানলার রড শক্ত হাতে ধরে আছে। যাবে না কিছুতেই।
এবার রোজ একটু একটু করে তৈরী হবে-মণ্ডপ,আলোকসজ্জা…শুরু হবে হুড়োহুড়ি…ঝগড়া,আড়ি-ভাব। লুকিয়ে লুকিয়ে,বাথরুমে গানের রিহার্শাল-অষ্টমীর রাতে,সবাইকে টেক্কা দিতেই হবে। পুরোনো রেসিপি ঘাঁটা-এবার বড়বৌদির কুমড়োর ছক্কায় কী ছানা ছিলো?….তা নিয়ে হবে জোর জল্পনা।
আর মনের মধ্যে একটু একটু করে আঁকা হবে- পেঁজা তুলোর মতো মেঘের আল্পনা। দুরে বাজবে-ঢাকের বোল-‘ঠাকুর আসবে কতক্ষন/ঠাকুর যাবে বিসর্জন…’
হাওয়ায়-হাওয়ায় একটা ফুর্ত্তি ফুর্ত্তি ভাব।
শুনলুম-আমাদের আমিরুদ্দিনের ( সব নাম পরিবর্তিত) নাকি এখন দম ফেলার ফুরসত নেই। আমাদের সঙ্গে সঙ্গে চৌধুরীদেরও মা দুর্গার ওই অত্তবড় তারের মুকুট আর সাজ বানানোর ভার এবার তার কাঁধেই।
দত্ত জুয়েলার্সে ঢুকতেই- ফয়জান ভাই চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে বললেন-‘দিদি! এখনও মায়ের অস্ত্র পালিশে দিলেন না,ঈদের জন্য কারিগর কিন্তু ছুটি নিয়ে রেখেছে। নতুন অর্ডার নেবে না।’

কুমোরটুলিতে মায়ের হাতের মাপ নিতে গিয়ে আলাপ হলো- আখতারের সঙ্গে। সে এক বক্তিয়ার খিলজী। বড় বড় ঠাকুর-সে সযত্নে কিভাবে,এ-গলি সে-গলি বেয়ে পৌঁছে দ্যায়-মণ্ডপে মণ্ডপে এবং অস্ত্র থেকে চালচিত্তির,সব নিজ দায়িত্বে রাত জেগে-যথাস্হানে পৌঁছে,তবেই বাড়ী ফেরে- সে গল্প শুনে তো আমি অবাক। টালার ট্যাঙ্কের পেছনের দিকে যে কোনো রাস্তা আছে- তাইই জানতুম না এতদিন!

সবশেষে বলি- সাবিনার কথা। সাবিনা- আমাদের পাড়াতেই থাকে। ওর দুই ছেলে- আমার বড় প্রিয়। আগেরবার আমি pregnant যেনে আমায় ফোন করে বলেছিলো-‘পুজোর কোনো কাজে কোনো দরকার হলে-আমায় ডেকো?’
আমি বললুম-‘তুমি জানো পুজোর কাজ?’
কি মিষ্টি একগাল হেসে বলেছিলো-‘না। শিখে নেবো?’
এই যে লোকগুলো এতদিন ধরে পরিশ্রম করে,এত সুন্দর একটা মণ্ডপ তৈরী করছে-মা আসবে বলে।আমরা কী কেউ জানতে চাই,-কি তাদের ধর্ম?
মাকে ভালো না বাসলে-এমন নিখুঁত কাজ -হয় কখোনো?
এই যে এত আনন্দ চারিদিকে-কে যেন ছড়িয়ে দিয়ে গ্যাছে- তা কি জাত-ধর্ম বিচার করে,টুপ্ করে আমার গায়ে ঝরে পড়ছে? ওই যে আমিরুদ্দিন,ওই যে সাবিনা,ওই যে অগনিত মানুষ-প্যাকেট হাতে করে,রাস্তায় নেমে পড়েছে,পুজোর বাজার করতে…..এ আনন্দ তো কি তাদের পাশ কাটিয়ে- ধর্ম খুঁজে,অন্য কাউকে চেপে ধরছে?
দুর্গাপুজো-বাঙালীর সবচেয়ে বড় উৎসব। এ এমন এক পুজো- যাতে,পুজো কম,উৎসবই বেশি।
‘বলো দুগ্গা মাঈকি! জয়…’ – এ তো হিন্দি আর বাংলা মেশানো এক জয়ধ্বনি। কে বানালো বলুন তো? বাঙালীর সবচেয়ে বড় উৎসবের tag line কিনা হিন্দিতে?
‘ব্যাপারটা cultivate করতে হচ্ছে মশাই!!’

ছবি: লেখকের ফেইসবুক থেকে

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]