পুথি কাহিনী…

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

নার্গিস আক্তার

খুব ছোটবেলায় আমাদের গ্রামের বাড়িতে বিশালকারের দু’টি গ্রন্থ দেখেছিলাম। ধূসর স্মৃতিতে যেটুকু দেখতে পাই গ্রন্থগুলো ছিলো মোটা কাগজে রঙিন কভারে মোড়ানো হাতে বাঁধাই করা। একটির নাম ছিলো “গাজি কালু ও চম্পাবতী” অন্যটি “কাসাসুল আম্বিয়া”। সে সময় সবাই এই গ্রন্থ দু’টিকে কিতাব বলতো। আমার মাকেও দেখেছি মাঝে মাঝে তিনি সেই কিতাব যত্নসহকারে পড়তেন; ধর্মীয়গ্রন্থ পড়ার মতোই ভক্তি নিয়ে। বড় হবার পর মায়ের কাছে জেনেছি ছন্দবন্ধ কাহিনীর এই গ্রন্থ দু’টি ছিলো পুথি সাহিত্য। যেগুলি ছিলো আমার দাদার। দাদার বাবা পুথি দু’টি সংগ্রহ করেছিলেন। বড় হয়ে জেনেছি পৌষ আর মাঘী পূর্ণিমায় আমার দাদা নওশের আলী খান বৈঠকখানায় বসে পুথি পাঠ করতেন। শ্রোতা ছিলেন তাঁর সহচরগণ। তাঁরা বৃত্তাকারে বসে শুনতেন সেই সুরেলা পুথিপাঠ। এমন কি নারী শ্রোতারাও আড়ালে দাঁড়িয়ে সেই পুথিপাঠ আসরের অংশীদার হতেন। গাজি কালু ও চম্পাবতীর আনন্দ বেদনায় শ্রোতারা এতোটাই আপ্লুত হতেন যে তাদের আনন্দে শ্রোতারাও আনন্দিত হতেন আবার বেদনায় ঝরাতেন চোখের জল। কাসাসুল আম্বিয়ার নবী কাহিনী শ্রোতাদের আপ্লুত করতো ভীষণ। পুথিপাঠ শুনেই সাধারণত মানুষ ধর্মীয় নেতাদের সঙ্গে পরিচিতও হতেন। সময়টা ঊনিশ শতকের গোড়ার গল্প। আনুমানিক ১৯৩০/৩৫ সালের কথা। আমার বাবা যখন পঞ্চম শ্রেণিতে পড়েন দাদা তখনই অল্প বয়সে মারা যান। তারপর অনেক বছর সেই পুথি দু’টি আমার বাবা ও কাকা যত্ন করে রেখে দিয়েছিলেন। অবসরে কাকাও পড়তেন শুনেছি অনেকটা দাদার মতোই। আরো অনেকগুলো বছর পর আমার মা এসে সেই পুথির যথাযথ মূল্যায়ন করেন। খুব ছোটবেলায় আমার মাকে আমিও পুথি পড়তে শুনেছি। সুরেলা কন্ঠে তিনি পুথি পড়তেন পাশে বসে শুনতেন বাড়ির নারীশ্রোতাগণ।

সে সময় গ্রামে নির্মল বিনোদনের মাধ্যম ছিলো পুথিপাঠ আর গল্প বলা। একটি গল্প বলার আসরের স্মৃতি আমার ধোঁয়াশা ধোঁয়াশা মনে পড়ে।। আমি তখন খুব ছোট। বাড়ির সবার খুব উৎসুক অপেক্ষা। কেননা রাতের খাবার খেয়েই গল্পের আসরে বসবে সবাই। উঠানে খড় বিছিয়ে তার ওপর পাটি পাতা হয়েছে। সেখানে বসলেন নারী-পুরুষ, সঙ্গে শিশুরাও। দরাজ কণ্ঠের অধিকারী একজন পুরুষ গপ্পবাজ যিনি আমাদের ঘনিষ্ঠ আত্মীয়, তিনি শুরু করলেন গল্প বলা। বড়বোনদের কাছে শুনেছি, দর্শক শ্রোতাদের মনোসংযোগ ছিলো অকল্পনীয়। গল্পের আসর এতোটাই জমে উঠতো যে ফজরের আযান পর্যন্ত এ-গল্পের আসর বিরামহীন চলতো। রামায়ণ-মহাভারতের কাহিনী থেকে শুরু করে নবী-পয়গম্বরদের গল্প এবং নানা কল্পকাহিনীর গল্প নিয়ে জমে উঠতো গল্প বলার আসর।

পুথির কথাই বলি। বড় হবা’র পর জেনেছি পুথি দু’টি নড়বড়ে হয়ে গিয়েছিলো বলে আমার মা একজনকে “কাসাসুল আম্বিয়া” পুথিটি বাঁধাই করে দেবা’র জন্য দায়িত্ব দিয়েছিলেন। যে দোকানে দেয়া হয়েছিলো সেখান থেকে পুথিটি উধাও হয়ে যায়। কেউ একজন চুরি করে নিয়ে গেছে নাকি কিনে নিয়ে গেছে স্পষ্ট জানা যায় নি। হয়তো অমূল্য গ্রন্থ বুঝতে পেরেই কেউ একজন নিয়ে গেছে। অনেক খোঁজাখুঁজি করেও সেই পুথির হদিস আর কেউ দিতে পারেনি। দুর্লভ পুথিটি হারানোর বেদনায় আমার মাকে মাঝে মাঝেই আফসোস করতে শুনেছি। অন্যটি এতোটাই পুরানো ছিলো যে পুথির পাতাগুলো নাকি নষ্ট হয়ে গিয়েছিলো।

পুথি বলতেই ছন্দময় কাহিনী যা বিশেষ ঢংয়ে সুর করে পড়তে হয়। ধর্মীয় কাহিনী অথবা কল্পকাহিনী অথবা সমাজে ঘটে যাওয়া গল্পই ছিলো পুথির বিষয়বস্তু। আরবি, ফার্সি, উর্দু ও হিন্দি ভাষার মিশ্রণে রচিত ছিলো বাঙলা ভাষার পুথি সাহিত্য। আরো পরে জেনেছি পুথি শব্দের অর্থ হচ্ছে পুস্তক। সংস্কৃত পুস্তিকা শব্দ থেকেই এসেছে পুথি। আর এই পুথি হচ্ছে বাঙলা সাহিত্যের আদি রূপ যখন ছাপাখানা আবিষ্কৃত হয়নি। যে কারণে সে সময় পুথি ছিলো হস্তাক্ষরে লেখা, মুদ্রাক্ষরে ছাপানো নয়। একই পুথি হাতে লিখেই কয়েকটি কপি করা হ’তো। পুথি, পুস্তক অথবা গ্রন্থ এক কথা হলেও পুথির বিশেষত্ব হচ্ছে হস্তাক্ষরে লেখা, মূদ্রাক্ষরে নয়। যদিও পরবর্তী সময়ে ছাপাখানা আবিষ্কার হ’বার পর মুদ্রাক্ষরে ছাপানো পুথি সাহিত্য প্রচার-প্রসার লাভ করে। অর্জন করে জনপ্রিয়তা। আদি ও মধ্যযুগের বাঙলা সাহিত্য মূলত ছিলো পুথি সাহিত্য। কালে কালে সাহিত্যগ্রন্থ তার আকার বদলেছে, সময়ের সঙ্গে বদলেছে ভাষা, বদলেছে বিষয়বস্তুও। তবুও বাঙলা সাহিত্যের ঐতিহ্যকে অবহেলা করবার উপায় নেই। সেই আদিপথ ধ’রে বাঙলা সাহিত্য তার যাত্রা শুরু করে আজ এতোটা পথ পাড়ি দিয়েছে।

ছবি: গুগল

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]