পুরনো বৃষ্টির দিনে

ইরাজ আহমেদ

ভাবছিলাম বৃষ্টির কথা। ভাবতে ভাবতে চল্লিশ বছর আগের পাড়ায় বৃষ্টি নামলো। সিদ্ধেশ্বরীর আকাশ অন্ধকার করে বৃষ্টি নামলো। সেই ঢাকা শহরে বৃষ্টি এখনকার মতো এতো কৃপন ছিলো না । এতো লুকোচুরিও ছিলো না তার। হয়তো সকালবেলা বৃষ্টি নেমেছে। কখনো রাতে নামা বৃষ্টি-ই শেষ হয়নি। ঝুপ ঝুপ করে ঝরছে তো ঝরছেই। রাস্তায় পানি জমেছে।বৃষ্টিতে ভিজে কেউ বাজারে যাচ্ছে, ভোরে দরজার তলায় ভেজা খবরের কাগজ, কোনো বাসায় ক্যাসেট প্লেয়ারে গান-ওগো বৃষ্টি আমার চোখের পাতা…। ছাতা মাথায় সকাল দশটায় কোনো বন্ধু এলো। একই ছাতার তলায় দুই বন্ধু হয়তো বের হয়ে পড়েছি পথে। কালী মন্দিরের গা ঘেঁষে পরেশ দা‘র মুদির দোকান। আমাদের সেই কৈশোরে সিগারেট খাওয়ার গোপন আস্তানা ছিলো ওই দোকান। ভেজাছাতা মুড়ে ঢুকে পড়েছি দোকানের ভেতরে। চালের বস্তার উপরে বসে সিগারেট নিধন চলে। সস্তা সিগারেটের কটু গন্ধে পরেশ দা‘র দোকান আচ্ছন্ন। বৃষ্টি কিন্তু থামার নাম নেই।আমার ছত্রপতি হয়ে রাস্তায়। স্যাণ্ডেল ভিজছে, ভিজছে শার্ট, ভিজছে একমনে কারো বাগানে সাদা গন্ধরাজ। কোনো বন্ধুর বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে শিস দিচ্ছি, বৃষ্টি চারপাশ আচ্ছন্ন করে নামছে। বৃষ্টির হাওয়ায় আমাদের গলাছেড়ে গান আজো কি ভেসে আছে সেই গলিতে?

বৃষ্টিতে আমাদের প্রিয় একটা কাজ ছিলো বয়েজ স্কুলের মাঠে ফুটবল খেলা। বর্ষাকালে মাঠের ঘাস বেড়ে উঠেছে। তলায় কাদার ভারী স্তর। কিন্তু তাকে কী! ঝুম বৃষ্টিতে চলছে আমাদের খেলা। কাদা আর পানিতে মাখামাখি নিজেদের চেহারা নিজেরাই আর চিনতে পারতাম না। বিকেলে বৃষ্টি নামতো মন বিষন্ন করে দিয়ে। মাঠে পানি জমে গেলে খেলা বন্ধ। তখন আমাদের আশ্রয় হতো কারো বাড়ির ছাদের সিঁড়িঘর অথবা ছাতা মাথায় গলির মোড়ে। সঙ্গে চার আনা মানে পঁচিশ পয়সার বাদাম। মাঝে মাঝে বৃষ্টিতে আটকে যেতাম শান্তিনগর মোড়ে হক রেস্তোরাঁয়। সন্ধ্যায় বৃষ্টিক্লান্ত রেস্তোরাঁয় এক কাপ চা ভাগ করে খাওয়া, সঙ্গে গরম পুরি।
কোনো এক বৃষ্টির দুপুর। দলবেঁধে সাঁতার কাটতে যাচ্ছি নওরতন কলোনীর পুকুরে। তখন বেইলি রোডে নয় ভাইয়ের বিশাল বাড়ির পুকুর। নয়টা ঘাট। গভীর পুকুরে নামতে তাপ্পি মারা রাবারের টিউবই ভরসা। তখন বৃষ্টি নামলে সহজে বিদায় হতো না। শহরের নিম্নাঞ্চলে পানি জমে যেতো। পানির উপর ভাসতো সাদা স্ট্রিট লাইটের আলো।

সারারাত বৃষ্টির পর বাসার পেছনের উঠানে জমা পানিতে নৌকা ভাসালো ছোট ভাই আনন্দ; ভালোবাসা হাহাকারে বদলে দিয়ে সে-ও কবে চলে গেছে এই পৃথিবী ছেড়ে। মনে পড়ে, মনে পড়ে নৌকা ভাসানোর দিনগুলো।নৌকা বানাতে জানতাম না। এখনো পারি না। ওর জন্য অপটু হাতে বানাতাম। কাগজের নৌকা আমাদের। খানিক ভেসে থেকে ডুবে যেতো। ডুবন্ত সেই তরী দেখে ভাইয়ের হাসিমাখা মুখটা মনে পড়লো।
বৃষ্টির রাতে চোর আসে। এরকম ঘোর বৃষ্টির রাতে ঘুম ভেঙ্গে উঠানে হতবিহ্বল এক চোরকে দেখেছিলাম। ভিজতে ভিজতে বাড়ির বাগানের দেয়াল টপকে চলে যাচ্ছে। মায়া পড়ে আছে তার জন্যও। ক্রুদ্ধ বৃষ্টিও হয়তো সেদিন দমন করতে পারেনি তার অভাব আর ক্ষুধা।

বৃষ্টির রাতে পোষা কুকুরটা বাড়ি না ফিরলে বসে থাকতাম। আমারই মতো জেগে থাকা ইলেকট্রিক বাল্বে উড়ে এসে ধোক্কা খায় পোকা। দৃশ্যগুলো ভেজা রাসপ্রিন্ট যেন। যায় না, যেতে চায় না। বৃষ্টি নেই এই বর্ষাকালে। তবু বসে বৃষ্টির কথাই ভাবছি। কতকাল আগে শহরের আকাশ উজাড় করে বৃষ্টি নামতো। আমরা এক দঙ্গল কিশোর অথবা তরুণ বৃষ্টির আনন্দে ভেসে যেতাম। চশমার কাঁচে বৃষ্টির ফোঁটার মতো লেগে স্মৃতি মুছে তাকাই। ভাবি, তেমন বৃষ্টি আর এই শহরে নামে না। সত্যিই আসে না?

ছবিঃ প্রাণের বাংলার