পুরুষেরা ভাবুন

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

শারমিন শামস্

আমি একজন পুরুষ শিল্পীকে চিনি, যার ইচ্ছে করে সারাদিন বসে ছবি আঁকবেন। আরেকজন পুরুষকে চিনি যিনি চান গান নিয়েই থাকতে। কিন্তু তারা তা করতে পারেন না। কারণ তাদের নয়টা পাঁচটা অফিস করতে হয়। নানা রকম ধান্ধা করতে হয়। কারণ সংসার চালানোর মূল দায় তাদের, পুরুষের। তারা তাদের সংসারের মূল উপার্জনকারী।

পিতৃতন্ত্র ঠিক করে দেয় কার দায় কোনটা। অর্থ উপার্জন, প্রোডাকশনের দায় পুরুষের। নারীর দায় গৃহকর্মের, সন্তান লালনের, সেবার। এখন সেটা কেন পিতৃতন্ত্র ঠিক করে দেয়? কে কোন কাজে ভাল সেটি তো জেন্ডার দ্বারা মাপা যায় না। বহু  পুরুষ গৃহকর্ম ভালবাসে, সন্তানলালনে আনন্দ পায়। আবার বহু নারী কৃষিকাজ ভালবাসেন, কলকারখানার কাজ পছন্দ করেন। অথচ পিতৃতন্ত্রের ঠিক করে দেয়া ডিভিশন অব ওয়ার্ক নারীকে মেনে চলতে হয়।নারী বন্দি।

নারীবাদ নিয়ে নারীই বেশি কথা বলে। অথচ পুরুষের জীবনে নারীবাদ একই মাত্রায় জরুরি ও উপকারী। আফসোস, এদেশের পুরুষেরা এখনো ভেবে বসে আছে, পিতৃতন্ত্র তাদের উপকারে লাগছে। অথচ পিতৃতন্ত্র তাদের একইভাবে শোষন করছে, যেভাবে নারীকে করে।

নারীবাদ নিয়ে আরও গভীর আলোচনায় যাবো, সেই সুযোগই তৈরি হয়না। বেশিরভাগ লোক ধরেই রেখেছে, নারীবাদ হলো পুরুষতন্ত্রের বিপরীত একটা জিনিস। মানে নারীবাদ ওদের কাছে নারীর শাসন আর পুরুষের শোষিত হওয়া। চিন্তার জায়গা এতই প্রিলিমিনারি পর্যায়ে আটকিয়ে আছে যে, সেই জট আর কিছুতেই ছুটছে না। ফলে আলোচনা সামনে আগানোই বিরাট পরিশ্রমের কাজ হয়ে যায়।
এরা আলাপ করে এই টোনে- ‘আমি নারীবাদ পুরুষবাদ বুঝি না। আমি বুঝি মানবতাবাদ/ মানববাদ…ব্লা ব্লা ব্লা!’ ‘নারীবাদ পুরুষতন্ত্র দুইটাই খারাপ। এর কোনটাই ঠিক না ব্লা ব্লা ব্লা’।

নারী পুরুষ উভয়রেই এইসব বলতে দেখি। অথচ নারীবাদ বা ফেমিনিজম লিখে গুগলে একটা সার্চ মারলেও মাত্র দুই সেকেন্ডে ফেমিনিজমের মানে উদ্ধার করা যায়। ইতিহাস মিতিহাস ওয়েভ ময়েভ তো পরের কথা। এগুলা না পড়েন না-ই পড়েন, অ্যাট লিস্ট ফেমিনিজম, জেন্ডার, সেক্সিজম, সেক্সিস্ট- এই শব্দগুলার অন্তত মানে শেখেন। একটু মাথা ঘামালেই হয়। মাত্র দশ মিনিটের মামলা কিন্তু।

পুরুষতন্ত্র কিন্তু পুরুষকে আসলে ভাল রাখে না। ভাল রাখে না বলেই আপনাদের কান্ধে রাজ্যের ভার তুলে দেয়া। আপনাদের স্বপ্নগুলারে খুন করে। বুকের ভেতরে যে নরম কোমল সুন্দর অনুভূতিগুলা আছে, সেইগুলারে পিষে মারতে শিখায়। কাঁদতে দেয় না। মন খুলে হাসতেও দেয় না। পুরুষতন্ত্র একটা নারীকে যেমনে নিয়ন্ত্রণ করে, ঠিক একইরকম মাত্রায় পুরুষকেও করে। শুধু পদ্ধতি আলাদা, ক্ষেত্র আলাদা। পিতৃতন্ত্র নারীকে ঘরে ঠ্যালে আর নিয়ন্ত্রণ করে। আর পুরুষরে বাইরে ঠেলে আর নিয়ন্ত্রণ করে। দুই ক্ষেত্রেই দুইটা জেন্ডার পিতৃতন্ত্রের হাতে ঝুলানো রশির ডগায় ঝুলতেছে।
দুনিয়াজোড়া করে খাচ্ছে যে পুঁজিবাদ, আপনি তার হাতের পুতুল মাত্র। আর পিতৃতন্ত্র আপনার সেই পুঁজিবাদ ভাইয়ার সহমত ভাই। তার উইপন। তার অস্ত্র। কিংবা ক্ষেত্র বিশেষে ভাইস ভার্সা।

নাইজেরিয়ান ফেমিনিস্ট লেখক, কথক chimamanda ngozi adichie নিজের কথা বলতে গিয়া বলেছেন, ছোটকালে একবার তার টিচার ক্লাসে এসে বললেন, একটা ছোট টেস্ট হবে। টেস্টে যে ফার্স্ট হবে, সেই হবে ক্লাস ক্যাপ্টেন। তো আদিচি ভীষন উৎসাহী ছিলেন ক্যাপ্টেন হতে। যথারীতি পরীক্ষা হলো। আদিচি ফার্স্ট হলেন। কিন্তু টিচার (আগে বলতে ভুলে গিয়েছিলেন) জানাইলেন, কোন মেয়ে ক্যাপ্টেন হতে পারবে না। ফলে সেকেন্ড হয়েছে যে ছেলেটি, তাকে ক্যাপ্টেন করা হলো। অথচ ছেলেটার এই ক্যাপ্টেনশিপের ব্যাপারে একটুও আগ্রহ ছিলো না। সে এসব পছন্দই করতো না। অথচ জোর করে তাকেই ক্যাপ্টেনের দায়িত্ব দেয়া হলো।

পিতৃতন্ত্রের খবরদারির খুব ছোট্ট অথচ গুরুত্বপূর্ণ একটা উদাহরণ। আমি প্রত্যাশা করি, আমাদের পুরুষেরা নিজের ব্যাক্তিগত জীবনে পিতৃতন্ত্রের এই খবরদারি আর প্রভাব নিয়ে একটু ভাবার অবকাশ পাবেন।

ছবি: গুগল

 

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]