পুষ্পহীন যাত্রাশেষে মৃণাল সেন

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

শেষ ইচ্ছায় নিষেধ জানিয়ে গেছেন নিজের মৃতদেহের উপর ফুল রাখতে, নিজের প্রাণহীন শরীর কোথাও শায়িত রেখে শ্রদ্ধার্ঘ নিতেও ঘোর আপত্তি তাঁর। তাই মৃত্যুর পর এ ধরণের কোনো আনুষ্ঠানিকতায় সিক্ত হবেন না মৃণাল সেন, ভারতীয় চলচ্চিত্রের কৃতি পুরুষ। ফুল অথবা শ্রদ্ধার আনুষ্ঠানিকতায় বিমুখ থাকলেও ক্যামেরার পেছনে থাকা এই মানুষটির জন্য সিনেমার দর্শকদের ভালোবাসা, শ্রদ্ধা ফুটে রইলো অদৃশ্য সেলুলয়েডে।   

মৃণাল সেনের প্রয়াণের মধ্য দিয়ে বাংলা চলচ্চিত্রের একটি বিশেষ যুগের অবসান হলো। সদ্য বিদায়ী বছরের একেবারে শেষপ্রান্তে  ৩০ ডিসেম্বর পর্দা নামলো এক উজ্জ্বল জীবনের মঞ্চে, নিভে গেলো আলো, থামলো তাঁর লাইট, ক্যামেরা আর অ্যাকশনের পৃথিবী।

৯৫ বছর বয়সে চোখ বন্ধ করলেন চিরবিদ্রোহী চলচ্চিত্র পরিচালক মৃণাল সেন। সত্যজিৎ রায় যখন ঊনিশ শতকীয় মানবিকতাবাদকে চলচ্চিত্রীয় বাস্তবে রূপান্তরিত করার চেষ্টায় রত বা ঋত্বিক ঘটক যখন ইতিহাসের উপাদানগুলিকে পৌরাণিক লোককথার সঙ্গে জুড়ে এক ধরনের বিস্ফোরক বাস্তবতা তৈরি করছেন, তখন মৃণাল সেন  নিজের সিনেমার বিষয় হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন মধ্যবিত্ত ও নাগরিকতার পৃথিবীকে। উপহার দিয়েছেন ‘ভুবন সোম’ ‘খারিজ’ ‘খন্ডহর’, ‘কলকাতা ৭১’ ‘চালচিত্র’, ‘আকালের সন্ধানে’-এর মতো সিনেমা।

১৪ মে, ১৯২৩ বাংলাদেশের ফরিদপুর জেলায় জন্ম নেন মৃণাল সেন। প্রাণের বাংলার প্রচছদ আয়োজনে এবার এই অসাধারণ চলচ্চিত্র নির্মাতার প্রতি রইলো গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা। 

র‌্যাডিক্যাল, মার্ক্সবাদী, কখনো বিদ্রোহী বহু অভিধায় অনেকে তাঁকে ব্যাখ্যা করতে চেয়েছেন। কিন্তু মানুষ হিসেবে অন্য সংজ্ঞার মানুষ ছিলেন বোধ হয় মৃণাল সেন। ভালোবাসতেন গোপাল ভাঁড়ের গল্প করতে। পুত্র এবং নিজের বন্ধুদের সঙ্গে ছিলো তাঁর মজার সম্পর্ক। শোনা যায়, নিজে থেকে বানিয়ে বানিয়ে হাসির গল্প বলতেন মৃণাল সেন। আর সেসব গল্প গোপাল ভাঁড়ের বলে চালিয়ে দিতেন।

নিজের জীবন নিয়ে খুব অনায়াসে বলেছেন, ‘‘থামা নেই। ঘড়ির কাটার মতো জীবন। আর প্রতি মুহূর্তে বিজ্ঞান প্রযুক্তি ও মননের প্রথাসিদ্ধ নিয়ম ভেঙ্গে বেনিয়মের খেলায় মেতে থেকেছি। যা করেছি, যা করে চলেছি , ঠিক বা বেঠিক, পরোয়া করিনি কখনো। ভাবনা কীসের!’’

স্ত্রী গীতা সেন প্রয়াত হয়েছেন এক বছর আগে। স্ত্রী বিয়োগের পর এক ধরণের নিঃসঙ্গতা ঘিরে ধরেছিলো তাঁকে। অভিনেত্রী গীতা সেনের স্বামী সম্পর্কে লিখেছেন ‘‘ না খেয়েও ইয়ার্কি করার একটা অভ্যাস ওর ছিলো। কিন্তু একদিনের মতো ভেঙ্গে পড়তে আমি কোনোদিন দেখিনি। সেদিন মাঝরাতে এমনকী বাচ্চাটাকে বাড়িওয়ালাদের বাসায় রেখে দু’জনে আত্মহত্যা করার কথাও উঠেছিলো। আমি বলেছিলাম – কপর্দকশূন্য অবস্থায় আমি বিয়ে করেছিলাম, এ কথা শোনার জন্য নয়। যেভাবেই হোক বাঁচতে হবে। একথা যে চিরকাল বলে এসেছে তার মুখে মৃত্যুর কথা আমি মানতে পারিনি। তারপর আবার ছবি করার সুযোগ পায় প্রায় আড়াই বছর পরে- ‘নীল আকাশের নিচে’।

মৃণাল সেন তাঁর প্রতিটি ছবিতে এক্সপেরিমেন্ট করেছিলেন। খুঁজেছিলেন বিষয়-ভাবনা। এখানেই মৃণাল ছিলেন সকলের চাইতে ভিন্ন। ফিল্ম নিয়ে তাঁর পরীক্ষানিরীক্ষা ছিলো একজন বৈজ্ঞানিকের মতো। একজন বিজ্ঞানীর যেমন গবেষণার অস্ত্র মাইক্রোস্কোপ, ঠিক তেমনই মৃণালের মাইক্রোস্কোপ ছিলো তাঁর ক্যামেরা, তাঁর চিত্রনাট্য।

১৯৮২ সালের কান চলচ্চিত্র উৎসব। মৃণাল সেনের সঙ্গে আলাপ হলো গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজের।  উৎসবে জুরি সদস্য হিসাবে গিয়েছিলেন মৃণাল সেন। সেখানে মার্কেজও ছিলেন জুরি সদস্য হিসাবে। সেখানেই প্রথম দেখা। এরপর সেই আলাপ দ্রুত বন্ধুত্বে পরিণত হয়। এর বছর দুই-তিন পর হাভানায় ফের দেখা হয় দু’জনের। মার্কেজ প্রসঙ্গে মৃণালের কথাতেই জানা যায় মার্কেজ সিনেমা বানাতে বলেছিলেন মৃণাল সেনকে। অথচ অসাধারণ কথাসাহিত্যিক চাইতেন না তার লেখা নিয়ে কেউ ছবি করুক। কারণ মার্কেজ বিশ্বাস করতেন, নিজের গল্পের ধারা ভেঙ্গে সিনেমা করা কঠিন কাজ। তাতে গল্পের মূল মেজাজটাই নষ্ট হয়ে যাবে। কিন্তু মৃণাল সেনকে তিনি তাঁর ‘অটাম অব দ্য পের্টিয়ার্ক’উপন্যাস অবলম্বনে ছবি বানানোর প্রস্তাব করেছিলেন। কাজটা করার জন্য মার্কেজ নিজেও কোনো পারিশ্রমিক নেবেন না বলেও জানিয়েছিলেন। কিন্তু মৃণাল সেন এ ব্যাপারে তাঁর অপারগতার কথা সরাসরি বন্ধুকে জানিয়ে দিয়েছিলেন।

এমন একটা প্রস্তাব মৃণাল সেন ফিরিয়ে দিয়েছিলেন কেন? আসলে মৃণাল সেন বুঝতে পেরেছিলেন এই উপন্যাসের গল্প ও চরিত্রের মেজাজ এতটাই লাতিন আমেরিকান ছিলো যে সে গল্প ভেঙ্গে বাংলাদেশের আবহে সিনেমা নির্মাণ করা কঠিন হবে।

সত্যজিৎ রায়ের সঙ্গে এক বন্ধনীতে উচ্চারিত হতো যার নাম, সত্যজিতের মৃত্যুর ছাব্বিশ বছর পর বিদায় নিলেন মৃণাল সেন। তাঁর গুণমুগ্ধ পরিচালক শ্যাম বেনেগাল বিবিসিকে বলছেন, “মৃণাল’দা কিন্তু কখনওই দ্বিতীয় সত্যজিৎ ছিলেন না। তিনি ছিলেন তার মতো করেই অনন্য!”

ছিলেন পদার্থবিদ্যার ছাত্র। লেখাপড়া করেছেন কলকাতার স্কটিশ চার্চ কলেজে। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকেই স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ। প্রথম জীবনে বাধ্য হয়ে কলকাতার বাইরে মেডিক্যেল রিপ্রেজেন্টেটিভের কাজ করেছেন। তবে সে জীবন তাঁর দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। আবার তিনি ফিরে আসেন কলকাতায়। কাজ নেন কলকাতা চলচ্চিত্র স্টুডিওতে একজন অডিও প্রযুক্তিবিদ হিসেবে। এখান থেকেই শুরু তাঁর পথচলা।একজন মৃণাল সেন হয়ে ওঠার সূচনা।

তাঁর মৃত্যুতে বলিউড অভিনেতা অমিতাভ বচ্চন টুইট করেছেন, ‘এক অমায়িক, অনন্য ও সৃষ্টিশীল সিনেমাটিক মনের বিদায়!’

আমিতাভ জানিয়েছেন, মৃণাল সেনের বিখ্যাত ছবি ‘ভুবন সোম’-এ তিনি জীবনের প্রথম নেপথ্য কন্ঠ দিয়েছিলেন।

বাংলা সিনেমার যাত্রায় এ ধরণের আলাদা আভিজাত্য যোগ করেছিলেন মৃণাল সেন। সত্যজিৎ রায় এবং ঋত্বিক ঘটকের পাশাপাশি একেবারে নিজের ভাষায় কথা বলেছিলো তাঁর ক্যামেরা, তৈরী হয়েছিলো ‘প্যারালাল’ বা সমান্তরাল সিনেমার সময়। সত্যজিৎ রায় এবং ঋত্বিক ঘটক বিদায় নিয়েছেন অনেক আগেই। শেষ প্রদীপ নিভে গেল গত রবিবার।

শ্যাম বেনেগাল মনে করেন, “সত্যজিৎ-ঋত্বিক-মৃণাল ভারতীয় সিনেমার তিন দিকপাল ও কিছুটা সমসাময়িক ঠিকই। কিন্তু তারা একে অন্যের চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা ঘরানার আর মৃণাল’দার কাজ তো তার নিজস্ব বৈশিষ্ট্যে অনন্য!সত্যজিৎ রায়কে যেমন সারা দুনিয়া ‘পথের পাঁচালী’র জন্য চেনে, তেমনি শুধুমাত্র ‘ভুবন সোমে’র জন্যই মানুষ মৃণাল সেনকে মনে রাখবে বলে তাঁর বিশ্বাস।

ভুবন সোম, কোরাস, মৃগয়া ও আকালের সন্ধানে-সহ ১৬টি ছবির জন্য মৃণাল সেন জাতীয় পুরস্কারও পেয়েছেন।

বাংলাদেশের ফরিদপুর জেলায় তাঁর জন্ম। বাল্য -কৈশোর কেটেছে এখানেই। ফরিদপুরের রাজেন্দ্র কলেজের ছাত্র মৃণাল সেন ১৯৪০ সালে তৎকালীন পূর্ব বাংলা ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন ঘটনাবহুল কলকাতায়। তিনি দেখেছিলেন দাঙ্গার আগুন, দেখেছিলেন দুর্ভিক্ষ আর দেশভাগ। এসব অভিজ্ঞতাই তাঁর ভেতরে তৈরী করেছিলো একজন প্রতিবাদী মানুষকে। যোগ দিয়েছিলেন ভারতীয় গণনাট্য সংঘ বা আইপিটিএতে। সহকর্মী হিসেবে ছিলেন সলিল চৌধুরী, তাপস সেন, কলিম শরাফী এবং অবশ্যই ঋত্বিক কুমার ঘটক।পরে কমিউনিস্ট পার্টি অব ইন্ডিয়ার সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত ছিলেন এই পরিচালক।

‘নীল আকাশের নিচে’ ছবির আগে তৈরী করেছিলেন ‘রাতভোর’। মহানায়ক উত্তমকুমার কাজ করেছিলেন শেষের ছবিটিতে। কিন্তু তখনও মৃণাল সেন সিনেমায় নিজস্ব পথ খুঁজে পাননি। তাঁর প্রথম উল্লেখযোগ্য ছবি ‘বাইশে শ্রাবণ’। ১৯৬০ সালে নির্মিত এই ছবিতে বড় অংশ হয়ে রয়েছে দুর্ভিক্ষ। বাংলাদেশের দুর্ভিক্ষের কাহিনি পরবর্তী সময়ে তাঁর ‘কলকাতা-৭১’ ও ‘আকালের সন্ধানে’তে বড় আকারে এসেছে।

কিন্তু মৃণাল সেনকে স্বতন্ত্র ধারায় চিহ্নিত করলো তাঁর ‘ভুবন সোম’। ছবিটি নির্মানে অল্প সাহায্য করেছিলো ভারতীয় ফিল্ম ফাইন্যান্স কর্পোরেশন। খুব অল্প ব্যয়ে তৈরী এই সিনেমাটি তরঙ্গ তুলেছিলো। একজন কড়া আমলা হিসেবে উৎপল দত্তের অনন্য অভিনয় ও এক সরল গ্রাম্য তরুণী হিসেবে সুহাসিনী মুলের সাবলীল পর্দা উপস্থিতি ছবিটিকে ভিন্ন মাত্রা দিয়েছিলো।

নকশাল আন্দোলনের অস্থির সময়ে মৃণাল সেন নির্মাণ করেছিলেন তাঁর কলকাতা ট্রিলজি ‘ইন্টারভিউ’, ‘কলকাতা ৭১’ এবং ‘পদাতিক’। এই তিনটি সিনেমায় তিনি ভারতের পশ্চিমবঙ্গের সেই উত্তাল সময়কে তুলে ধরেছিলেন।

তাঁর সর্বশেষ ছবি, ‘আমার ভুবন’ তৈরি করেন ২০০২ সালে।

পদ্মভূষণ সম্মানে সম্মানিত হয়েছিলেন তিনি। ২০০৫ সালে দাদাসাহেব ফালকে সম্মানেও ভূষিত করা হয় তাঁকে। তিনি পেয়েছেন দেশবিদেশের বহু স্বীকৃতি ও পুরস্কার।

১৯৯৮ সাল থেকে ২০০৩ সাল পর্যন্ত তিনি ভারতীয় পার্লামেন্টের সম্মানীয় সদস্য ছিলেন। ফরাসি সরকার তাঁকে কম্যান্ডুর ডি ল অর্ডারে দেস আর্টস এট লেটার্স (কমান্ডার অফ দ্য অর্ডার অফ আর্টস অ্যান্ড লেটারস)-এর সর্বোচ্চ সম্মান প্রদান করেছিলো।

প্রাণের বাংলা ডেস্ক
তথ্যসূত্রঃ ডেইলি ও, আনন্দবাজার পত্রিকা, দৈনিক আজকাল, ইন্টারনেট
ছবিঃ গুগল

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]