পুড়তে থাকা পাণ্ডুলিপিগুলি

মিখাইল বুলকাকভ

নিকোলাই গোগল

প্রখ্যাত রুশ সাহিত্যিক মিখাইল বুলগাকভ তাঁর বিশ্বখ্যাত উপন্যাস ‘দ্য মাস্টার অ্যান্ড মার্গারিটা’র প্রথম পাণ্ডুলিপি পুড়িয়ে ফেলেছিলেন।আর পাণ্ডুলিপি পোড়ানোর পর বলেছিলেন, ‘পাণ্ডুলিপি কখনো পুড়ে নিঃশেষ হয় না। আশ্চর্য শব্দের সমন্বয়ে লেখা পাণ্ডলিপিগুলো আসলে নথিভূক্ত হয়ে থাকে মাথার ভিতরে’। সোভিয়েট রাশিয়ায় বসে ১৯২৮ থেকে ১৯৪০ সালের মধ্যে বুলকাকভ উপন্যাসটি লিখেছিলেন। তখন রাশিয়া বেঁচে  ছিলো স্ট্যালিনের লৌহ শাসনের অন্তরালে। উপন্যাসটি কিন্তু বুলগাকভের জীবদ্দশায় আলোর মুখ দেখেনি। লেখা হওয়ার প্রায় ২৭ বছর পরে ১৯৬৬ থেকে ১৯৬৭ সালের  মধ্যে একটি রুশ পত্রিকায় সেটির কাটছাট হওয়া সংস্করণ ছাপা হয়। অবশ্য তার আগেই বিংশ শতাব্দীর অন্যতম এই কথাসাহিত্যিক প্রথম পাণ্ডলিপিটি পুড়িয়ে ফেলেছিলেন ক্ষিপ্ত হয়ে। কারণ তখনকার রুশ শাসকরা তাঁর ‘কাবাল অফ হিপোক্র্যাটস’ নামে একটি নাটক নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছিলেন। আঙুল তোলা নিষেধের বেড়াজালের বিরুদ্ধে বুলগাকভের প্রতিবাদ ধ্বনিত হয়েছিলো আগুনের ভেতর দিয়ে।

পরে অবশ্য তিনি স্মৃতি থেকে আবার লিখেছিলেন ‘দ্য মাস্টার অ্যান্ড মার্গারিটা’। ১৯৬৭ সালের পরে নিজের দেশে নয়, প্যারিসে ছাটাই হওয়া অংশগুলো জোড়া দিয়ে উপন্যাসটি প্রথম বই আকারে প্রকাশিত হয়।বুলগাকভ নিজেই বলতেন, তার রান্নার স্টোভটাই হলো সবচাইতে বড় সম্পাদক।

বরিস পাস্তারনাক

তখন তিনি লিখে ফেলেছেন ‘ডায়েরি অফ এ ম্যাডাম’ ‘দ্য নোজ’ বা ‘ওভারকোট’-এর মতো ছোট গল্প। তাঁর সাহিত্য কর্ম নিয়ে মত্ত তখন আলোচক-সমালোচকরা। কিন্তু তিনি? লেখক নিজে তখন ঘুমে অথবা জাগরণে মনের মধ্যে এক অশান্ত সমুদ্র নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। অতৃপ্তি ছুরির মতো মনের ভেতরটাকে কেটেছিঁড়ে তৈরি করছে এক অদ্ভুত দোলাচল। তিনি আরেক প্রবাদসম রুশ কথা সাহিত্যিক ও নাট্যকার নিকোলাই গোগল। ছোট গল্পগুলোর সাফল্য তাকে আলোড়িত করছে ঠিকই কিন্তু মুহূর্তেই আবার ঢেকে ফেলছে উদ্বেগে আর হতাশার কালো পর্দায়। গোগলের লেখক জীবনে হতাশাও যেন এক বিখ্যাত চরিত্র। আর তাই হয়তো ‘ডেড সোলস’-এর মতো উপন্যাস লিখেও পার্ফেকশনিস্ট লেখক গোগল তৃপ্ত হতে পারেননি। উপন্যাসের প্রথম খণ্ড লিখে আলোচনা ও সমালোচনা দুই-ই জুটেছিলো লেখককের কপালে। কিন্তু দ্বিতীয় খন্ড লেখার জন্য তাঁর ওপর চাপ ছিলো পাঠকের। সেই চাপটাই তোকে নিয়ে গিয়েছিলো আবার লেখার টেবিলে। পাঁচ বছর পরিশ্রম করে ১৯৪৫ সালে শেষ করা উপন্যাসের দ্বিতীয় খন্ড গোগল কিন্তু পুড়িয়ে ফেলেছিলেন ১৮৫২ সালে। মনের আগুনে ক্রমাগত পুড়তে থাকা নিকোলাই গোগলের কাছে পুরো লেখাটাই হয়ে উঠেছিলো অসম্পূর্ণ।হতাশার অন্ধকার আবার কালো পর্দায় ঢেকে দিলো মনের চারপাশ। এবার আর সেই পর্দা ভেদ করে আলো প্রকাশিত হলো না। হতাশার অন্ধকারে ডুবতে ডুবতে ১৮৫২ সালে মাত্র ৪২ বছর বয়সে জীবন থেকেই বিদায় নেন নিকোলাই গোগল।

হয়তো নিজের লেখা আগুনে পুড়িয়ে ফেলা লেখকদের এক ধরণের মানসিক জ্বর। এমনি জ্বরে ভোগা আরেক সাহিত্যিক বরিস পাস্তারনাক পুড়িয়ে ফেলেছিলেন নিজের প্রায় সব লেখার প্রথম পাণ্ডুলিপি। ‘ইন দিস ওয়ার্ল্ড’ নামে একটি নাটক লিখেছিলেন। সমালোচনার মুখে দুম করে পুড়িয়ে ফেললেন। ‘থ্রি নেইমস’ নামে উপন্যাসের প্রথম খসড়ারও শেষ আশ্রয় হয়েছিলো রান্নাঘরের চুলার আগুন।

প্রাণের বাংলা ডেস্ক
তথ্যসূত্রঃ রাশিয়া বিয়ন্ড
ছবিঃ গুগল


প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না, তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]


https://www.facebook.com/aquagadget
Facebook Comments Box