পূজার ফুল…

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

মোর্জিনা মতিন কবিতা

এই রকম গুমোট গুমোট আবছায়া দিনগুলোর একটা আলাদা রঙ আছে। কুয়াশা রঙ। কাশফুল রঙ। নীল আকাশে সাদা মেঘ- থেকে থেকে মেঘেরা হয়ে ওঠে ঘোলাটে। আকাশ হয়ে ওঠে ধোঁয়াটে। বৃষ্টিদানাগুলো খুব হালকা হয়ে ভাসে বাতাসে, না পেরে খুব অল্পই পতিত হয় মাটিতে। মাটি তাতে ভেজে কী ভেজে না, মন ভেজে আমাদের। এইসব মনোময় দিন এলে ছুটি হয়ে যায় বুয়েট। সম্ভবত ঢাকার আর সব শিক্ষালয়ও। কেননা, এইসব দিনে শরৎ আসে, পূজা আসে আর আসেন ঢাকা থেকে বুয়েটের সুকোমল‘দা, অসীম‘দা, ঢাকা ইউনিভার্সিটির স্বপন‘দা।

ক্লাস ফাইভে আমরা যারা, সামনেই আমাদের বৃত্তি পরীক্ষা। তাই গাবের পাড়া সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের দরজা তখনো খোলা। জানালাও। আসলে, পুরোনো জং ধরা টিনের ‘এল’ আকৃতির ইশকুল ঘরটাতে অনায়াসে সব দিক থেকে প্রবেশ করা যায়। জানালা দরজার বালাই নাই। বেঞ্চ দিয়ে ক্লাসরুমের পৃথক সীমানা টানা থাকে। ১ম শ্রেণী থেকে ৫ম শ্রেণী পর্যন্ত মোট পাঁচটি শ্রেণীর কোনোই ‘প্রাইভেসি’ নেই।

পূজায় ইশকুল ছুটি থাকলেও আমাদের ফাইভের বৃত্তি পরীক্ষার্থীদের পড়ায় কোন ছুটি নাই। শৈলেন স্যার আমাদের পড়ান। লেখান। সবুজ রঙের হার্ড বোর্ডে সাদা চক দিয়ে লিখে দেন সব সাব্জেক্ট, নোট করে দেন সবকিছু। আমরা দেখে লিখি, লেখাটা মুখস্থ করি, না দেখে আবার খাতায় লিখি।

শৈলেন স্যারের পুত্র সুকোমল‘দা, ভাতিজা অসীম‘দা আর স্বপন‘দা। অসীম‘দা আর স্বপন‘দা পরস্পর সহোদর। এই তিন ভাই তাদের ছুটির দিনগুলোতে আমাদের পড়ান। শৈলেন স্যারের সাবস্টিটিউট হিসেবে। সুকোমল‘দা একটু কড়া, স্বল্পভাষী। গণিত করান বেশি। অসীম‘দা ‘আমার নাম অসীম’ বলতে বলতে নামটা হার্ডবোর্ডে লেখেন প্রথম দিন। স্বপন‘দা একদিন ব্যাকরণ পরীক্ষা নেন। ‘গবাক্ষ’ এর সন্ধি বিচ্ছেদ লিখতে দেন। আমরা ওটা ছাড়া আর সব পারি। তিনি চেয়ারে হেলান দিয়ে মাথাটা টিনের চালামুখী করে, মিটমিট করে হেসে, চালাকির মতো করে বলেন- ‘গো+অক্ষ’। আমরা কেউ বিশ্বাস করি না। লিখিও না। আমাদের নম্বর কাটা যায়। পরে ইয়া মোটা টেস্ট পেপার খুলে দেখি, স্বপন‘দা ঠিকই বলেছেন।

পড়া শেষে কাঁকালে বই আর হাতের আঙ্গুলে ফাউন্টেন পেন জড়িয়ে হেঁটে বাড়ি ফিরি। ফেরার পথে কোন কোন দিন প্রিয় সখী মুক্তা আর প্রিয় সখা সমাপ্তদের বাড়ি যাই। মুড়ি-মুড়কি-নাড়ু-খই খাই। পরম যত্নে লেপে দেয়া তুলসী গাছের নিপাট বেদী দেখি, তুলসী গাছ ছুঁয়ে আসা ভেষজ গন্ধ নাকে পাই। ফুলকি‘দি’দের বাড়ির ঢালু পথ দিয়ে নামতেই, পূঁতি ধরে একটা গাছে, সম্ভবত ফুল ঝরে গেলে ফলটাই পূঁতি হিসেবে ধরে থাকে ডালে, ডালের শলায় গেঁথে থাকে, আলগোছে খুলে নেয়া যায়। আমি পরম কৌতুহলে খুলে নিই। বাড়ি এসে সুই সুতায় মালা গাঁথি। বিনিসুতায় এমন আরো অনেক মালা গাঁথি অসীত, ময়না, সরস্বতী‘দি, চায়না‘দি, রাশমনি, অমর, গৌরাঙ্গ, বিষ্ণু‘দি, রিনা‘দি, বেবি‘দি, চন্দনা‘দি, বিকাশ‘দা, পঙ্কজ‘দা, লিটন‘দা নামের। আর একটা মালা- শিউলী ফুলের মালা। পান পাতার মতো সবুজের আড়াল থেকে খসে পড়া সাদা-কমলা শিউলী ফুল। দুনিয়ার সেরা রঙ সাদা আর সেরা কম্বিনেশন সাদা-কমলা। ঐশ্বরিক ফুল। পূজার ফুল। শৈশবের নাসিকায় করে তুলে নেয়া মনোময় গন্ধ।

আমি একা ইশকুলে আসি, একা বাড়ি যাই। সহপাঠী অনেকে, সহযাত্রী কেউ নয়। কেননা, সবাই সনাতন ধর্মাবলম্বী আর সবারই বাড়ি ইশকুলের কাছে। ফুলকি দি’দের বাড়ি ধরে সোজা পশ্চিম দিকে হাঁটলে একটা ঋষি বাড়ি, সেই বাড়ি ধরে আরো পশ্চিমে রতনের বাড়ির পুকুর, পুকুরের ঠিক আগের আলপথে একটা শিউলী গাছ, চোখ মেললেই শুদ্ধতম বর্ণ, নাক পাতলেই পবিত্রতম গন্ধ। অনগ্রসর সম্প্রদায়ের এক বাড়িতে দুর্গা পূজার সবচাইতে সম্ভ্রান্ত ফুল…

ছবি: সজল

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]