পৃথিবীজোড়া প্রেম

সদ্য বিলেত ফেরত যুবক রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বেপরোয়াভাবে প্রেমে পড়েছিলেন ভাইয়ের স্ত্রী, বাল্যের খেলার সঙ্গী ‘নতুন বউ ঠাকরুণ’ কাদম্বরী দেবীর। সুধীন্দ্রনাথ দত্ত যে কারণে অকম্পিত কলমে লিখেছিলেন ‘‘ He fell desperetly in love with her”।
ফরাসী বিপ্লবের প্রবাদ পুরুষ জ্যাঁ জ্যাক রুশো প্রেমে পড়েছিলেন তাঁর শিক্ষিকা মাদাম ডি ওয়ারেনসের।মাদাম ওয়ারেনস ছাত্রকে ডাকতেন  ‘মাই চাইল্ড’, রুশো তাঁকে ডাকতেন ‘মামন’।
আবার শোনা যায় নিজের জীবনের অন্তিম রাতে প্রাণের আলো নিভিয়ে দেয়ার আগে হলিউডের সেই রহস্যাবরণে ঘেরা অভিনেত্রী মেরিলিন মনরো শেষ ফোনটি করেছিলেন ভালোবাসার মানুষ প্রেসিডেন্ট কেনেডিকেই।
ভালোবাসা তো আসলে সরল পথে চলে না। তার চলার পথ বড় বিচিত্র, বড় অদ্ভূত। তা-না হলে জ্যঁ পল সার্ত্রের অবিচ্ছেদ্য সঙ্গিনী সিমন দ্য বোভায়া প্রেমে পড়েন তাঁর চাইতে ১৭ বছরের ছোট ছাত্রের সঙ্গে? প্রেমের বিচিত্র গতি না হলে পাবলো পিকাসোই বা কেন বারবার প্রেমে পড়বেন অসম বয়সী নারীদের সঙ্গে? ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাকঁড় জড়িয়ে যাবেন তার চাইতে ২৫ বছরের বড় শিক্ষিকার সঙ্গে বিয়ের বন্ধনে?
এবার প্রাণের বাংলার প্রচ্ছদ আয়োজন দুনিয়া জুড়ে ঝড় তোলা সেইসব মানুষদের তীব্র, গহন প্রেমের কাহিনি নিয়ে।

নতুন বৌঠানের চোখ দুটো এমনভাবে আমার মধ্যে গেঁথে আছে যে…

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর পান্তাভাত খেতে ভীষণ পছন্দ করতেন। যদি সেই পান্তার স্বাদের সঙ্গে যুক্ত হতো বউদির আঙুলের স্পর্শ, ‘‘অল্প একটু লঙ্কার আভাস দিয়ে’’(রবীন্দ্রনাথ)।

রবীন্দ্রনাথ ও কাদম্বরী দেবী

ছেলেবেলায় যে মানুষটির আঙুলের স্পর্শে বদলে যেত খাবারের স্বাদ বড় হয়ে হয়ে সেই মানুষের সঙ্গে এক গভীর আকর্ষণে জড়িয়ে গিয়েছিলেন সে কথা আজ আর আড়ালে নেই। দুটি অদৃশ্য স্রোত যে কোন এক বাঁকে এসে খুব কাছে চলে এসেছিল তা প্রমাণ করতে গবেষকদের এখন গবেষণার অন্ত নেই। রবীন্দ্রনাথ তো তাঁর নিজের লেখাতেই নতুন বৌঠানের গভীর কালো চোখ আর চুলের প্রশংসা করে গেছেন এভাবে ‘‘নতুন বৌঠানের চোখ দুটো এমনভাবে আমার মধ্যে গেঁথে আছে যে মানুষের ছবি আঁকতে বসলে অনেক সময়েই তাঁর চোখ দুটো আমার চোখের সামনে জ্বলজ্বল করতে থাকে-কিছুতেই ভুলতে পারিনে। তাই ছবিতেও বোধহয় তাঁর চোখের আদল এসে যায়।’’
কাদম্বরী দেবী ছিলেন রবীন্দ্রনাথের চাইতে দু বছরের বড়। সেই বালক বেলাতেই এই নারী রবীন্দ্রনাথের মধ্যে ঘটিয়েছিলেন মুগ্ধ রসায়ন, যার থেকে রবীন্দ্রনাথ কোনদিন বের হয়ে আসতে পারেননি।রবীন্দ্রনাথ বিলেত যাবার পথ থেকে ফিরে এসে ঠাকুর বাড়িতে না উঠে সোজা চলে গিয়েছিলেন চন্দন নগরের বাগান বাড়িতে বৌদির কাছে। এ নিয়ে ঠাকুর বাড়ির ওপর মহলে কথা উঠবে জানতেন কবি। কিন্তু কোন প্রথা, কোন লোকলজ্জা সেদিন তাকে আটকে রাখতে পারেনি। ভালোবাসার টান কবিকে উন্মনা করে দিয়েছিলো।
ঝড় উঠেছিল ঠাকুর বাড়ির অন্দর মহলেও। কিন্তু সেই ঝড়ের মধ্যেই ভালোবাসার তরীটিকে চালনা করেছিলেন তিনি। কাদম্বরী দেবীর আত্নহত্যার ঘটনার পর কবি লিখেছেন, ‘‘ সেই দুজনে মিলিয়া কল্পনার রাজ্যে বিচরণ, সেই মৃদু গম্ভীর স্বরে গভীর আলোচনা, সেই দুজনের স্তব্ধ হইয়া নীরবে বসিয়া থাকা, সেই প্রভাতের বাতাস, সেই সন্ধ্যার ছায়া, একদিন সেই ঘনঘোর বর্ষার মেঘ, শ্রাবণের বর্ষণ, বিদ্যাপতির গান-তাহারা সব চলিয়া গিয়াছে। কিন্তু আমার ভাবনাগুলির মধ্যে তাহাদের ইতিহাস লেখা রহিল।’’ এর পর এক ধরণের মারাত্নক স্বীকারোক্তি করে তিনি লিখলেন, ‘‘আমার এই লেখার মধ্যে লেখা রহিল, এক লেখা তুমি-আমি পড়িব, আর এক লেখা আর সকলে পড়িবে।’’ রবীন্দ্রনাথের বিয়ের চার মাস পর ১৮৮৪ সালের ১৯ এপ্রিল অফিম খেয়েছিলেন কাদম্বরী দেবী। তাঁর আত্নহত্যার সমস্ত প্রমাণ আর সুইসাইড নোট সরিয়ে দেয়া হয়েছিল। মুখ বন্ধ করা হয়েছিল পত্রিকার। কাদম্বরীর মৃত্যু সংবাদ কোন কাগজে ছাপা হয়নি।

তখনই পেয়েছিলাম শতবর্ষের শান্তি

বহু বহু আগে মার্চ মাসের এক রবিবার জেনেভার ছেলে জাঁ জ্যাক রুশো  ফ্রান্সের আনোসি গ্রামে পৌঁছায়। রুশোর বয়স মাত্র ১৬, জন্মের ন’দিন পরেই মা মারা গিয়েছেন। বাবা কয়েক বছর আগে দূর সম্পর্কের পিসিকে নিয়ে অন্যত্র সংসার বেঁধেছেন। বালক রুশো তার পর থেকে মামাবাড়িতেই মানুষ।

রুশো ও মাদাম ওয়ারেনস

মামা এক ঘড়ির কারিগরের কাছে শিক্ষানবিশি করতে রুশোকে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন। রুশো এমনিতেই গণিত আর কারিগরি বিষয়ে দক্ষ ছিলেন। কিন্তু একটু ভুলচুক হলেই পিঠে আছড়ে পড়তো কারিগরের বেত। শিক্ষানবিশি, জন্মশহর জেনিভা সব ছেড়ে তাই রুশো পালিয়ে গেলেন। পালাতে পালাতে আল্পস পাহাড়ের নীচে আনেসি। এই গ্রামেই মাদাম ডি ওয়ারেনস থাকেন। স্যাভয় শহরে এক জনের সঙ্গে রুশোর দেখা হয়েছিল। তিনিই মাদাম ওয়ারেনস-এর সঙ্গে দেখা করার বুদ্ধিটা দিয়েছিলেন।  ভবিষ্যতে মাদামের কাছেই রুশো ওষুধবিজ্ঞান শিখবেন, জানবেন ধর্মতত্ত্ব, পড়বেন বহু বই। মাদাম ওয়ারেনস ছাত্রকে বলতেন ‘মাই চাইল্ড’, রুশো তাঁকে ডাকতেন ‘মামন’।
মা-ছেলে বা শিক্ষিকা-ছাত্রের সম্পর্ক সেই অষ্টাদশ শতকে শুধুই প্রথাগত সীমারেখায় আটকে থাকেনি। আল্পস পাহাড়ের নীচে চেম্বুরি শহরে তাঁর এস্টেটে নিয়ে গেলেন মাদাম ওয়ারেনস, সেখানে দুজনে সারা দিন ঘুরে বেড়ান। রাতে দুজনে এক বিছানায়।
ভবিষ্যতে মাদামের সঙ্গে প্রথম দেখা হওয়ার সেই রবিবারের বিশদ বিবরণ দিয়েছেন ফরাসি বিপ্লবের স্রষ্টা দার্শনিক। মাদাম বাড়িতে নেই, গির্জায় গিয়েছেন। কিন্তু গির্জায় ঢোকার আগেই তাঁকে রাস্তায় পাকড়াও করে নিজের পরিচয়পত্র দিলেন রুশো। ‘তার পর থেকে কত বার ওই জায়গাটা চোখের জলে, চুমুতে ভিজিয়ে দিয়েছি। ওখানে একটা সোনার রেলিং তৈরি করে দেওয়া উচিত ছিল। প্রেমকে যারা  সম্মান করে, তারা সকলে নিশ্চয়ই ওই রেলিং-এর সামনে নতজানু হয়ে বসতো,’ আত্মজীবনী ‘কনফেশন্‌স’-এ লিখছেন রুশো।
একটা সময় রুশো চেম্বুরি, স্যাভয় ছেড়ে চলে এলেন প্যারিসে। তার দশ বছর বাদে, ১৭৫৪ সালে স্ত্রীকে সঙ্গে নিয়ে আবার গিয়েছিলেন আনেসিতে। মাদামের তখন প্রবল অর্থাভাব, রুশো তাকে প্যারিসে গিয়ে একসঙ্গে থাকার প্রস্তাব দিয়েছিলেন। মাদাম রাজি হননি। উলটে তাঁর আঙুলের আংটিটি পরিয়ে দিলেন রুশোর স্ত্রী টেরেসার আঙুলে। সেই বছরেই তাঁর মৃত্যু। রুশোও বিদায় নেন ১৬ বছর পরে। অসমাপ্ত স্মৃতিকথায় শুধু লেখা থাকলো-‘সেই নারীর সঙ্গ যে পাঁচ-সাত বছর ছিলাম, তখনই পেয়েছিলাম শতবর্ষের শান্তি।’

শেষ ফোন কেনেডিকেই

মাত্র ৩৬ বছর বয়সে তার প্রাণহীন দেহ পাওয়া গিয়েছিলো নিজের বাড়িতে। সে দিন ছিলো আগস্ট মাসের ৫ তারিখ, সালটা ১৯৬২। রহস্যময় জীবনের প্রদীপ তিনি নিজের হাতে নিভিয়ে দিয়ে তৈরী করে গিয়েছেন আরো এক রহস্য। অভিনেত্রী মেরিলিন মনরোর মৃত্যুরহস্য, যা নিয়ে আজো আলোচনা ফুরায় নি এই পৃথিবীতে। শোনা যায় মনরো নাকি শেষ ফোনটি করেছিলেন তখন আমেরিকার আলোচিত প্রেসিডেন্ট জন এফ কেনেডিকে তাঁর ব্যক্তিগত টেলিফোনে। যে ফোনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কথা বলতেন দুজনে সারা রাত জেগে।

কেনেডি ও মনরো

মনরো প্রেমে পড়েছিলেন কেনেডির। কেনেডিও তাই। তখন হলিউডি সেক্সবম্ব মেরিলিন মররোর জীবনে নেমে আসছে দুঃসহ নিঃসঙ্গতা! তৃতীয় বর, লেখক ও নাট্যকার আর্থার মিলারের সঙ্গে সম্পর্ক চুকে

বুকে যাচ্ছে। নাম জড়িয়ে পড়ছে কখনও সহ-অভিনেতা-পরিচালক-প্রযোজকের সঙ্গে। কখনও হাওয়ায় উড়ছে গোপন প্রেমের গুজব। তবে সবচেয়ে চর্চিত, কেনেডির সঙ্গে সম্পর্ক!
দুজনের আলাপ হয়েছিল এক পার্টিতে। তখন কেনেডি পার্টিতে থাকা মানেই নারীদের বুকের মধ্যে অন্য কম্পন, দুরুদুরু এক সময়। সেরকম এক ঝলমলে পার্টিতেই কেনেডির পাশে এসে বসেছিলেন মনরো। আর তারপরেই বিখ্যাত প্রেমের সূচনা। মোহময় এই প্রেম নিয়ে কম চর্চা হয়নি মার্কিন মুলুকে। কোনও কোনও এজেন্সি লেখে, মাঝে মাঝে জন কেনেডি মেরিলিনের সঙ্গে ডেটিং করতেন সমুদ্র কিনারে, এক আত্মীয়ের বাড়িতে। এমন এক গোপন অভিসারে ১৯৬২ সালের মার্চে এক বার কেনেডি ও মনরো পাম স্প্রিং-এর একটি জায়গায় দেখা করেন। মনরোকে কেউ যাতে চিনতে না পারে, সে জন্য পরচুলা পরেছিলেন সুন্দরী। আবার এমন তথ্যও মেলে, যেখানে মনরো নাকি নিজেই এক সময় মার্কিন ফার্স্ট লেডি জ্যাকলিন কেনেডিকে বলেন, ‘তোমার স্বামীকে ভালবাসি।’ জানাজানি হয়, প্রেসিডেন্ট নাকি চলে আসতে চান অভিনেত্রীর কাছে। ঘর বাঁধতে চান দুজনে। বিন্দুমাত্র বিচলিত না হয়ে ফার্স্ট লেডি জ্যাকুলিন মনরোকে বলেছিলেন, ‘তুমি বিয়ে করো জ্যাককে। এস হোয়াইট হাউস-এ। সব সমস্যা তোমাকেই কিন্তু সামলাতে হবে।’
কিন্তু মনরোর সাদা বাড়িতে আর আসা হয়নি! মৃত্যুর আগে কয়েক মাস ধরে চলছিলো টানাপড়েন। সে বছরই তৃতীয় স্বামী আর্থার মিলারের সঙ্গে তাঁর ছাড়াছাড়ি পর্ব শেষ। মনরোর দুটো অস্ত্রোপচার হয়েছে, ওজন কমে গিয়েছে ২৫ কেজি। তবু শুটিং শুরু হল, তাঁর শেষ সিনেমা ‘দ্য মিসফিটস’-এর। প্রায় দিনই ফ্লোরে গরহাজির। কোনও দিন বলেন, সাইনাস ইনফেকশন। কোনও দিন জ্বর, মাথাব্যথা। এরই মধ্যে কেনেডির জন্মদিন, ২৯ মে। হোয়াইট হাউস থেকে আমন্ত্রণের চিঠি এল। অনুষ্ঠান হবে নিউ ইয়র্কের ম্যাডিসন স্কোয়ার গার্ডেনে। ইউনিটের সবাই ভেবেছিল, অভিনেত্রী যেতেই পারবেন না। কিন্তু মনরো গেলেন। পরনে হীরকদ্যুতি ছড়ানো সাদা ক্রিস্টালের পোশাক। ঠিক রাত সাড়ে আটটায় পার্টি শুরু হল।
মদিরার পাত্র ছলকে পড়ছে সে রাতে। প্রেসিডেন্টকে শুভেচ্ছা জানাচ্ছেন সকলে।এক সময় উঠে গিয়ে মাইক্রোফোনের সামনে দাঁড়ালেন মনরো। শরীরের প্রতিটি চড়াই-উৎরাই, বাঁক-উপবাঁকের ভুবন দৃশ্যমান। মঞ্চে তাঁকে ঘিরে আলোকবৃত্ত। মনরো একটু থামলেন, কী যেন ভাবলেন। অতঃপর, সেই চিরচেনা হাসি, চোখের তারায় ঝিলিক। মোহময় কণ্ঠে কেনেডির দিকে চেয়ে গেয়ে উঠলেন, হ্যাপি বার্থডে টু ইউ…

 অন্নপূর্ণার সঙ্গহীন জীবনে এলেন রুশি

অন্নপূর্ণা দেবী

রুশিকুমার পাণ্ডিয়া আমেরিকার কলেজে সাহিত্য পড়াতেন। বাজনা শিখতেন উস্তাদ আলি আকবর খাঁ-র কাছে। কোম্পানি এগজিকিউটিভদের তখন স্ট্রেস ম্যানেজমেন্ট পড়ানোর সুবাদেই বছরে দু’তিন মাস ভারতে এসে থাকতে হয়। এক দিন আলি আকবর বললেন, ‘যাচ্ছ তো মুম্বাই? রেওয়াজ ওখানেও করতে পারো, আমার বোন থাকে ওখানে। সেতার, সুরবাহার, সরোদ সবই প্র্যাকটিস করতে পারবে।’মুম্বাইয়ের বহুতল এক বাড়ির সাত তলায় উঠে দরজায় টোকা দিলেন রুশি। দরজা খুলে যেতেই তাঁর সামনে বাবা আলাউদ্দিন খাঁ-র কন্যা। আলি আকবরের বোন। সেই জীবন্ত কিংবদন্তি! অন্নপূর্ণা! ঘটনাটা ১৯৮২ সালের।
এর প্রায় চার দশক আগে পণ্ডিত রবিশঙ্করের সঙ্গে অন্নপূর্ণার ছাড়াছাড়ি হয়ে গিয়েছে। কমলা শাস্ত্রী থেকে সু জোন্স, অনেকেই এসেছেন রবিশঙ্করের জীবনে। কিন্তু অন্নপূর্ণা নিজেকে সরিয়ে নিয়েছেন আলোকবৃত্ত থেকে। সেই সঙ্গহীন জীবনে এলেন রুশি।অতঃপর ১৯৮২ সালেই ওঁদের বিয়ে হয়। একবিংশ শতাব্দীতেই পৃথিবী ছেড়েছেন রুশি। অন্নপূর্ণা আবার নিঃসঙ্গ।

ভালোবাসার নদী কি বয়সের বাধা মানবে

সিমোন দ্য বেভোয়া

সিমোন দ্য বেভোয়া-র ঘটনাটাও কিন্তু অদ্ভূত ছিলো। জঁ পল সার্ত্র-এর সহপাঠিনী, সঙ্গিনী। বিবাহপ্রথাকে দূরে সরিয়ে আজীবন বৈদগ্ধ্যমণ্ডিত সহবাসে রত ছিলেন এই দম্পতি। প্রথার বাইরে বসবাস করতেন বলেই হয়তো সিমোনের জীবনে ঢুকতে ক্লদ লানজামান-এর কোনও অসুবিধা হয়নি। ১৯৫২ সাল। সার্ত্রের রু বোনাপার্তের স্টাডিতে পড়াশোনা করতে জড়ো হন তরুণ ছাত্ররা। সিমোন দ্য বোভোয়া লানজামানের চাইতে গুনে গুনে ১৭ বছরের বড় ছিলেন।জুলাই মাসে এক ছাত্রীর বাড়িতে পার্টি। কয়েক দিন পরেই সার্ত্র আর সিমোন যাবেন ইতালি, লানজামান যাবেন ইজরাইলে। সে দিন তিনি অনেকটা মদ খেয়ে ফেললেন।
পর দিন সকালে সিমোনের ফোন বাজল। ফোনের ওপাশে লানজামান তাকে সিনেমায় নিয়ে যাওয়ার আমন্ত্রণ জানালেন। রাজি হয়ে গেলেন সিমন। বিকেলে দুজনে বেরোলেন। লানজামান সে দিন প্রবল ফ্লার্টিংয়ের মেজাজে। সিমোন হেসে বয়সের ফারাকের দেয়াল তুলতে চেয়েছিলেন। কিন্তু ভালোবাসার নদী কি দেয়ালের বাধা মানবে? সে রাত এবং তার পরের দুটো রাতও লানজামান সিমোনের ফ্ল্যাটেই থেকে গেলেন।সেই শুরু। তারপর ’৫২ থেকে ’৫৯ অবধি সাত বছর লানজামান-সিমোন একত্র থেকেছেন।

জীবনানন্দের চাচাতো বোন শোভনার প্রতি কবি দূর্বল ছিলেন

কথিত আছে, কবি জীবনানন্দ দাশের সঙ্গে তাঁর প্রথম প্রেমিকা মুনিয়ার দেখা মেলে বরিশালের অক্সফোর্ড মিশনের গির্জায়।

জীবনানন্দ দাশ

মুনিয়ার মা এই গির্জায় সেবিকার কাজ করতেন। শুধু কি তাই? বরিশালের এই পুরোনো গির্জাটির সঙ্গে জীবনানন্দের সম্পর্কও ছিল নিবিড়। ছাত্রাবস্থায় অক্সফোর্ড মিশনের ছাত্রাবাসে থাকতেন তিনি। ফলে এখানকার ফাদার ও মাদারদের সঙ্গেও ছিল তাঁর ঘনিষ্ঠতা। আচ্ছা, হঠাৎ গির্জা নিয়ে এত কথা কেন? কারণ আছে। গির্জাটি যে ১০০ বছরের পুরোনো। আর এর সঙ্গে যে জড়িয়ে আছে জীবনানন্দ দাশের নাম। জীবনানন্দের বাড়ি থেকে দু-কদম এগোলেই গির্জাটির সীমানা।

কিছুদিন আগে জীবনানন্দের ডায়েরির প্রথম অংশ প্রকাশিত হয়েছে কলকাতায়। ভূমেন্দ্র গুহের কাছে জীবনানন্দের ডায়েরি রাখা আছে। সেই ডায়েরিতে লিটারেরি নোটস্‌ হিসেবে Y নামে এক মেয়ের নাম লেখা আছে। জীবনানন্দ তার নিজের হস্তাক্ষরে লিখে রেখেছেন Y=শচী; এই ‘শচী’ জীবনানন্দের গল্প ‘গ্রাম ও শহরের গল্প’র শচী। ডায়েরির অন্যান্য পৃষ্ঠা বিবেচনায় ভূমেন্দ্র গুহ বলেছেন, জীবনানন্দের চাচাতো বোন শোভনার প্রতি কবি দূর্বল ছিলেন। এই শোভনাই হচ্ছেন ওয়াই বা শচী বা বনলতা সেন। কবি তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘ঝরা পালক’ এই শোভনা মজুমদারকে উৎসর্গ করেছেন। কবি হিসেবে জীবনানন্দ দাশের উপেক্ষা কুড়ানোর, যন্ত্রণায় বিক্ষত হওয়ার সময়ে  তাঁর কবিতার মুগ্ধ পাঠিকা ছিলেন শোভনা, দরজা বন্ধ করে প্রায়ই কবি শোভনাকে কবিতা পাঠ করে শোনাতেন। অর্থাৎ ভূমেন্দ্র গুহের বিবেচনায় বনলতা সেন নিখাদ প্রেমের কবিতা।
কিন্তু অশোক মিত্রকে অবশ্য একেবারেই উল্টো কথা বলেছিলেন স্বয়ং কবি জীবনানন্দ দাশ। কবি বনলতা সেন বিষয়ে অশোক মিত্রের সরাসরি প্রশ্নের উত্তরে শুধু জানিয়েছিলেন, বনলতা সেন নামটি তিনি পেয়েছিলেন পত্রিকা থেকে। সে সময় নিবর্তক আইনে বনলতা সেন নামে একজন রাজশাহী জেলে বন্দিনী ছিলেন। পত্রিকায় তাঁর নাম ছাপা হয়েছিলো। সেখান থেকেই কবি এই নামটি গ্রহণ করেন। এই বনলতা সেন পরে কলকাতার কলেজে গণিতের শিক্ষকতা করতেন।
বনলতা সেন রচনার পচাত্তর বছর পূর্তিতে কলকাতার আনন্দবাজার পত্রিকায় একটি প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়। সেই প্রবন্ধে আশোক মিত্র এই তথ্য উল্লেখ করেন।

নারীরা যন্ত্রণা উৎপাদনকারী যন্ত্র মাত্র

পিকাসো ও তার প্রেমিকা

প্রেমের সোজাসাপ্টা কোনও ফর্মুলা নেই। যদি দু’পক্ষের হৃদয়ের তন্ত্রীতে তোলপাড় ওঠে, রাজি থাকে দু’পক্ষ, বয়স বা সামাজিক প্রথাকে পাত্তা না দিয়ে তখন এগিয়ে যাওয়া যায় অনেক, অনেক দূর হয়তো। হয়তো বললাম এজন্য যে পৃথিবী বিখ্যাত চিত্রকর পাবলো পিকাসো কিন্তু প্রেমে তোলপাড় করে ওঠা হৃদয় নিয়ে ভালোবাসার সন্ধান করেছেন। এক সময়ে ক্ষিপ্ত হয়ে বলেছেন, নারীরা তাঁর কাছে ‘যন্ত্রণা উৎপাদনকারী যন্ত্র মাত্র’। কিন্তু তারপরেও শিল্পীর অসিআথর, জটিল হৃদয় অনুসন্ধান থেকে নিবৃত্ত হয়নি। পিকাসোর জীবনে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিলেন সাত জন নারী। তাঁর শিল্প সৃষ্টির নানা বাঁকে এরা ভূমিকা পালন করেছে অনুপ্রেরণা হয়ে। কিন্তু মজার ব্যাপার হচ্ছে, এই সাতজন নারীর মধ্যে দু’জন আত্নহত্যা করেছিলেন পিকাসোর বিরহ সহ্য করতে না পেরে। আর দুজন মনের ভারসাম্য হারিয়ে হয়ে গিয়েছিলেন উন্মাদ। এদের মধ্যে মাত্র একজন স্বাভাবিক ভাবে মৃত্যুবরণ করেছিলেন।

তিনি বিয়ে করেছেন পঁচিশ বছরের বড় শিক্ষিকাকে

আমাদের রচনার শেষ মানুষটি ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাক্‌রঁ। তিনি বিয়ে করেছেন তাঁর চাইতে কমপক্ষে পঁচিশ বছরের বড় শিক্ষিকাকে। প্রেসিডেন্ট স্বয়ং ছাত্র ছিলেন শিক্ষিকা ব্রিজিতের। এখন এই বিয়ের কাহিনি নিয়ে পত্রিকার পাতায় চলছে জোর গুঞ্জন।

মাক্‌রঁ ও ব্রিজিত

ব্রিজিত ফ্রান্সের আমিয়েন্স অঞ্চলে একটি স্কুলে ফরাসি ও লাতিন ভাষার শিক্ষিকা ছিলেন। মাক্‌রঁ ওই স্কুলেরই ছাত্র। ব্রিজিত স্কুল-ফাংশনের রিহার্সাল করান, ছাত্র মাক্‌রঁও সেখানে যেতেন। দিদিমণিকে তাঁর ভাল লাগার, ভালবাসার কথা হঠাৎ করেই একদিন প্রকাশ করে ফেলেন তিনি। কিন্তু ব্রিজিত এক ব্যাঙ্কারের স্ত্রী, তিন ছেলেমেয়ের মা। ছাত্রের ভালোবাসা কি তবে সেখানেই মুখ থুবড়ে পড়েছিলো? না। ঘটনার বহু পরে ২০০৬ সালে, ওই দাম্পত্য ভেঙে প্যারিসে এসে প্রেমমুগ্ধ ছাত্রটিকে বিয়ে করেন ব্রিজিত। তখন মাক্‌রঁ পড়াশোনা করেন, ব্রিজিত নতুন সংসার টানতে ফের শিক্ষিকার চাকরি নিয়েছেন। গত বিয়েতে জন্মানো ব্রিজিতের তিন ছেলেমেয়ের এক জন আজ আইনজীবী, এক জন ইঞ্জিনিয়ার, অন্যজন ডাক্তার। মাক্‌রঁ তাঁর সমবয়সি বা বয়সে বড় তিন জনকেই দত্তক নিয়েছেন। দত্তক পুত্রকন্যার সুবাদে নাতি-নাতনিও রয়েছে!
সম্প্রতি ব্রিজিতের আইনজীবী কন্যা চমৎকার এক কথা বলেছেন। মিডিয়া যখন মাক্‌রঁ-ব্রিজিতের অসম সম্পর্ক নিয়ে ব্যস্ত, ব্রিজিত কন্যা সাফ জানিয়েছেন, ‘কে কার শিক্ষিকা ছিলেন, বউ বয়সে বরের চেয়ে কত বড়, এগুলি একেবারে সেক্সিস্ট কথা। আধুনিক দুনিয়ার মুখে মানায় না।’
আধুনিক পৃথিবীর গল্প এটাই। তিনশ বছর আগে এরকম ঘটনা ঘটেছে স্রেফ প্রেমের টানে। এখনো ঘটছে। ভালোবাসার এই অসম টান আর পরিণতির বিপজ্জনক বাঁকগুলো সারা জীবনই যেন হয়ে থাকলো রূপকথার গল্পের মতো।

আদিল হাসান
তথ্যসূত্রঃ আন্দবাজার পত্রিকা, আদরের উপবাস রবীন্দ্রনাথ-রঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায়,
ডেইলি মেইল
ছবিঃ গুগল