পৃথিবীর ছাদে…

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

তিয়াষ মুখোপাধ্যায়

এগারো.­­

গোটা এক্সপিডিশনের খারাপতম, ব্যর্থতম, অন্ধকারতম দিন ছিলো এটা। দুঃস্বপ্নের মতো একটা দিন। অনেক বড় বিপদের সম্ভাবনা বয়ে আনা একটা দিন। এই দিনটা অভিযানে না থাকলেই ভালো হতো। এই দিনের গল্প বাদ দিয়ে বাকি সবটা লিখতে পারলেই ভালো হতো।

ইসমাইল সোমানি। হাতের মশালটা আর গেটের মাথার মুকুটটা সোনার।

কিন্তু যেহেতু এটা গল্প নয়, আর যেহেতু আমি ঘটনাক্রম ‘সবটা’ই লিখছি, তাই কিছুই বাদ দেওয়া বা বদলে দেওয়া যাবে না।

আগের দিনে একেবারে ঘুম হয়নি কারও, আগেই বলেছি। ভোর ভোর উঠেই পড়লাম সবাই। এ দিনের পথও ছিলো দীর্ঘ। অনেকটা দীর্ঘ। তাই আগে বেরোনোই ভালো। তার উপর গত দিনের অভিজ্ঞতা ভাল ছিলো না। পৌঁছাতে দেরি হয়ে যাচ্ছিলো।

সব দিক ভেবে, বেরিয়ে পড়া হলো বেশ ভোরে। ব্রেকফাস্ট করারও সুযোগ হয়নি। বেরিয়ে, খুব খারাপ রাস্তায় ঘণ্টা খানেক চালিয়ে, মেটাল রোড পাওয়া গেলো অবশেষে। এত দিন যে পথে চালিয়েছি, সেই তুলনায় এই পথ যেন কালো মাখনের মতো। মসৃণ, নির্বিবাদী, সোজা। আগেই জানতাম রাস্তা ভালো থাকবে, সে জন্যই ৪০০ কিলোমিটারের পথ এক দিনে পার করা হবে বলে আগে থেকেই ঠিক করা হয়েছিলো। কোনও অসুবিধাও ছিলো না। এ রাস্তায় এক দিনে ৪০০ যাওয়া যায়।

একটু পরে ব্রেকফাস্টের জন্য দাঁড়ানো হলো ছোট্ট এক দোকানে। পথের ধারে সবে দোর খুলেছে সে। বাইরে খাট পাতা। সেখানেই খাওয়া। ভেতরে ঢুকে, ফ্রিজ খুলে দেখিয়ে এলাম, কী কী খাবো। খাবারে অবশ্য বৈচিত্র্য নেই। সেই পাঁউরুটি, সেই ডিম, সেই সসেজ।

বাইকের ডাক্তারখানা

খাওয়ার পরে সকলেরই ইচ্ছে, একটু গড়িয়ে নেওয়া। কিন্তু উপায় নেই, অনেক পথ। আর এই দিন তেমনি গরম ছিলো। লেগগার্ড, জ্যাকেট পরে থাকতে হাঁসফাঁস করছিলো রীতিমতো। খেয়ে উঠে আমি বললাম, লেগগার্ড ঢুকিয়ে রাখি, পরবো না। আজ তো ভালো রাস্তা। বাদলদাও নিমরাজি হলো। তাল করতে লাগলো, নিজেরটাও না পরার। রূপা‘দি স্বভাবসুলভ আদেশ আর অনুরোধ মেশানো গলায় বললো, কী দরকার বাবা, পরেই থাক, শুধু শুধু কেন রিস্কটুকু নিবি, কত আর কষ্ট হবে, বাইক চললেই হাওয়া লাগবে……ইত্যাদি।

চুপচাপ পরে নিলাম। ভাগ্যিস।

প্রদীপদার বাইক সামনে ছিলো, আমাদেরটা একটু পেছনে। হু হু করে ছুটছিলো, ৮০-৮৫ স্পিডে। পাশ দিয়ে হুস হুস করে বেরিয়ে যাচ্ছে অন্য গাড়ি, কোনওটার স্পিড ১২০-র কম নয়। আমরা ডান পাশ দিয়ে চলেছি, রোজ যেমন যাই। বাঁ দিকে খাদ। খাদের নীচে নদী। নদীর ওপারে আফগানিস্তান। আর ডান দিকে পাহাড়ের গা। পাহাড়ের গা আর রাস্তার মাঝে ফুট দুয়েক চওড়া আর ফুট দুয়েক গভীর একটা ড্রেন মতো রয়েছে। শুকনো, বাঁধানো। সম্ভবত জল যাওয়ার জন্য।

ডান দিক দিয়ে চলতে চলতে ওই বড় ড্রেনে পড়ে গেলো চলন্ত বাইক। প্রায় ৯০ স্পিডে। প্রচণ্ড ক্লান্তিতে মুহূর্তের ভগ্নাংশে হয়তো নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছিলো চোখের পাতা। আর সেই ভুলেরই মাশুল দিতে হলো। পাহাড়ে যেমন হয়। পড়ে গিয়ে ১৫-২০ ফুট ছেঁচড়ে বাইকটা থামলো। ওই ড্রেনেই, যেটা রাস্তার পাশ দিয়ে চলেছে। আমরাও ততটা ছেঁচড়ে গিয়ে ডান দিকের পাথুরে অংশে ছিটকে পড়লাম। রক্তাক্ত। আড়ষ্ট। সামনে একটা লোকাল গাড়ি দাঁড়িয়ে ছিলো, ছুটে এলেন সবাই।

তার পর যা হয়। উঠিয়ে বসানো, জল দেওয়া, ফার্স্ট এইড। (ভাগ্যিস ওই গাড়িতে জল ছিলো!)

টানেল ছিল কয়েকটা

আমার ডান পা থেকে ঝরঝর করে রক্ত পড়ছে। লেগগার্ড, প্যান্ট, জুতো, মোজা– সমস্ত ছিঁড়ে খুবলে গিয়েছে শিনবোনের ডান পাশের অংশে মাংস। আর পায়ের পাতায় ইঞ্চি দুয়েক ফালা। রাইডিং জ্যাকেট ছিলো বলে হাতে, বুকে, পিঠে তেমন কোনও চোট লাগেনি। তবে লেগগার্ড না থাকলে সম্ভবত শিনবোন গোটা থাকতো না। এই লেগগার্ডই কিছু ক্ষণ আগে না পরার বায়না করেছিলাম আমি।

আর বাদল‘দা! তার তো কোথাও রক্ত নেই তেমন। তা হলে? একটু পরে পরিষ্কার হলো। খুচরো ব্যথাদের পার করে ডান হাত জানান দিলো, কাঁধের মুভমেন্ট হচ্ছে না পুরোপুরি।

সামনের গাড়ির মানুষগুলি যতটা সম্ভব সাহায্য করলেন। ডিসইনফেকট্যান্ট দিয়ে সাফসুতরো করে ব্যান্ডেজ করে দিলেন ক্ষতগুলো, ওষুধ দিলেন ব্যথার। পথচলতি গাড়ি থামিয়ে ড্রেন থেকে বাইকটা তোলার ব্যবস্থা করলেন। এত কিছুর মধ্যে এটাই ভাল ব্যাপার, যে বাইকটা অক্ষত ছিলো। বাদল‘দা বাইক স্টার্ট দিলো আবার। আর আমাদের সাহায্যকারী চারচাকা গাড়িটা সামনে এগিয়ে গেলো, প্রদীপ‘দাদের খবর দেবে বলে।

ও দিকে প্রদীপ‘দারা খানিক দূর গিয়েই থেমেছে। আমাদের গোটা পথেই, যে সামনে থাকতো সে পেছনের জনকে দেখতে না পেলে অপেক্ষা করতো। এটাই ঠিক ছিলো আগে থেকে। তাই প্রদীপ‘দাও থেমেছে তখন। ভেবেছে হয়তো আমরা ছবি তুলছি, বা ব্রেক নিয়েছি। কিন্তু এত সময় তো লাগার কথা নয়, এই ভেবে আবার পেছন দিকে ফিরতে শুরু করেছে। এই সময়েই দেখা ওই গাড়িটার সঙ্গে। তারা খবর দিয়েছে, যে এই অবস্থা হয়েছে আমাদের।

আরও কিছু ক্ষণে মধ্যে আমরাও এসে পৌঁছলাম। বাদল‘দার হাতে কী হয়েছে বোঝা যাচ্ছে না। উঁচুতে তুলতে পারছে না। কিন্তু অসহ্য যন্ত্রণা নেই। ফুলেছে সামান্য। একটা স্কার্ফ দিয়ে টেমপোরারি সাপোর্ট দেওয়া হলো। ভেবেছিলাম, মাসেলে স্প্রেন হয়েছে হয়তো।

পার্লামেন্ট। পথের ধারে ছোট্ট মতো…

ঠিক হলো, অসুবিধা খুব বাড়লে সামনে কুলোব বলে একটা শহর আছে, সেখানে ডাক্তার দেখানো হবে। আর তা না হলে, সম্ভব হলে দুশনবে চলে যাওয়া হবে। দুশনবে রাজধানী শহর, সেখানে সমস্ত সুবিধা ও অপশন বেশি। অভিযানের পরবর্তী রূপরেখাও দুশনবে পৌঁছনোর আগে ঠিক করা মুশকিল।

এত দিনের এত খারাপ পথ পার করে এসে, এত দুর্গমকে ঠিকঠাক নেগোশিয়েট করে এসে, সহজতম, মসৃণতম পথে ভুল হয়ে গেলো আমাদের। অভিযান যখন শেষের মুখে, ফেরার পথ প্রায় ধরে ফেলেছি, তখনই এলো সব চেয়ে বড় বাঁধা।

পরে ভেবে দেখেছি, এত বড় অভিযানের নিরিখে ভাবলে, এটা অল্পের ওপর দিয়েই গেছে বলা যায়। যাঁরা লং রুটে বা পাহাড়ে বাইক চালান তাঁরা জানেন, একটানা মসৃণ রাস্তা অনেক সময়েই মনোযোগের বিঘ্ন ঘটায়। ক্লান্তি আসে। খারাপ রাস্তায় বরং নার্ভ অনেক বেশি সতর্ক থাকে।

যাই হোক, ওই অবস্থাতেই চললাম আমরা। আরও ৩০০ কিলোমিটার বাকি তখনও। রাস্তা যদিও খুব ভালো। যে কোনও বিপদে বাদলদার একটা কমন ডায়ালগ আছে, “আমায় শুধু বাইকে বসিয়ে দাও, বাকিটা দেখে নিচ্ছি।” ওই ডায়ালগটাই আবার দিলো। চললাম আমরা। আমার পায়ে তীব্র ব্যথা। আর বাদলদার কথা ছেড়েই দিলাম। অমানুষিক সহ্যশক্তি, আগেই জানি।

একটা বড় পেট্রোল পাম্পে ব্রেক নেওয়া হলো। একটু ফ্রেশ না হলে আর পারছিলাম না কেউ। ও, বলতে ভুলে গেছি। এই দিন আমার ছাড়া সকলেরই খুব পেট খারাপ হয়েছিলো। গরমে, ঘুম না হওয়ায়, জল কম খাওয়ায়… সব মিলিয়ে। ফলে সেটাও একটা সমস্যা ছিলো।

সক্কলের বাড়িতে এরকম আঙুর ধরে রয়েছে। অনাদরে, অবহেলায়।

সন্ধের ফুটপাথ…

শেষমেশ বিকেল বিকেল দুশনবে পৌঁছে গেলাম আমরা। দুশনবে ঢোকার আগে বেশ অনেকটা রাস্তা অসম্ভব সুন্দর। একটা লেকও পড়ে বিশাল। কিন্তু বলাই বাহুল্য, তখন আর আমরা ঠিক সুন্দরগুলো এনজয় করতে পারছি না আর কী… কত ক্ষণে পৌঁছবো, সেটাই চিন্তা।

একটা হোস্টেলে গিয়ে ওঠা হলো। কাছেই হাসপাতাল। গিয়ে খোঁজ নিয়ে আসা হলো ডাক্তারের, কিন্তু সেই রাতে আর কিছুই সম্ভব হলো না। রূপা‘দি-প্রদীপ‘দা শুকনো খাবার নিয়ে এল ঘরে। খেলাম। ওষুধ খেলাম। ঘুমোলাম।

পরদিন সকাল সকাল হাসপাতাল নিয়ে গিয়ে বাদল‘দার এক্স-রে করিয়ে জানা গেল, হাড় ভেঙেছে। কাঁধ ও হাতেক জয়েন্টে যে সকেটে হাতের বলটা থাকে, সে সকেটের একটা অংশ ভেঙে খুলে গেছে। ওঁরা বললেন, অপারেশন করতে। আমরা বললাম, দেশে ফিরে করবো। তখন বললেন, প্লাস্টার করতে। আমরা বললাম, সম্ভব নয়। গাড়ি চালাতে হবে। ওঁরা বললেন, তা হলে আর কী, কিছুই তো করবে না, হাতে এটা ঝুলিয়ে রাখো। একটা টেম্পোরারি কাপড়ের সাপোর্ট দিলেন। আর বললেন, বাইক চালানো যাবে না।

এই গোটা পর্বটা বুঝতে আর বোঝাতে আর এক ভাষা-ঝড় পোহাতে হলো। সে কথা আর কী বলবো আলাদা করে।

সারা দিন ভাবনাচিন্তা করা হলো।

দুশনবে তাজিকিস্তানে, আর আমাদের বাইক রেন্টাল কিরঘিজস্তানের বিশকেক থেকে। এক দেশ থেকে অন্য দেশে বাইক পিক আপ করে নিয়ে যাওয়ার যা খরচ জানা গেলো…… সে যাক গে, আমাদের নাগালের বাইরে। তার উপর, তার পরের দু’দিন ১১ এবং ১২ ঈদ। ওই দু’দিন কিছু পাওয়া যাবে না। সেই ১৩ তারিখ যা হওয়ার হবে। সেটাও বেশ চাপ। অত দিন অপেক্ষা করা মুশকিল। আমাদের আবার ১৬ তারিখ ফেরার টিকিট কাটা আছে।

আর এ সবের মধ্যে বাদল‘দার একটাই কথা, “এক বার বাইকে বসলে আমি দেখে নেব বাকিটা।” আর ব্যথা করছে কি না জিজ্ঞেস করলে, সব সময়েই উত্তর “না, ঠিক আছে।” এর সঙ্গে অবশ্য থেকে থেকেই ফ্যাঁচফ্যাঁচ কান্না, “আমি দায়িত্ব নিয়ে সঙ্গে করে আনলাম, ফিরে গিয়ে তোমার বাড়িতে মুখ দেখাব কী করে।” কিছুতেই আর বুঝিয়ে পারি না, আমার চামড়ার ক্ষত শুকিয়ে যাবে, কিন্তু তোমার ভাঙা এবং বুড়ো হাড় কী হবে কেউ জানে না।

লেক…

ওই দিনটা সারা দিন রেস্ট নেওয়া হলো। বেলায় এক বার বাইক সার্ভিস করাতে যাওয়া হলো কাছেই। বাদল‘দা চালালো, বললো তেমন অসুবিধা হচ্ছে না। মানে অসুবিধা তো ডেফিনিটলি হচ্ছে, কিন্তু ওই আর কী। আমারও হাঁটাচলা বেশ চাপ হচ্ছে। আর আরও মুশকিল হচ্ছে বাইকে পা ঝুলিয়ে রাখা। যাই হোক, দু’জনেরই ভরসা পেনকিলার।

বিকেলে সকলেই অনেকটা ফ্রেশ। একটু ঘোরা হলো। ইসমাইল সোমনির বিশাল এক মূর্তি আছে শহরের কেন্দ্রে। সেখানে গেলাম ট্যাক্সি করে। ইসমাইল সোমনি স্বাধীন তাজিকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা। তাঁর নামেই তাজিক টাকার নাম সোমনি। আমাদের আট টাকায় ওদের এক সোমনি।

রাতে খাওয়া হলো ‘দিল্লি দরবারে’। ভারতীয় খাবার। কাবাব, নান, থালি– এই সব। সিদ্ধান্ত হলো, পরের দিনও চালাবে বাদল‘দা। পরের দিন রাস্তা খুব ভালো। আর আমাদের গন্তব্য ইসফারা। তাজিক আর কিরঘিজের বর্ডারে। একটু টেনে চালাতে পারলে আমরা ইসফারার পরে বর্ডার পার করে কিরঘিজস্তানেও ঢুকে যেতে পারি।

বাদল‘দা জানাল, তার ‘জোশ’ খুবই ‘হাই’ এবং তাকে এক বার শুধু বাইকে বসিয়ে দিতে হবে। বাকিটা নাকি সে ‘দেখে নেবে’।

তার পর…(চলবে)

ছবি: লেখক

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]