পৃথিবীর ছাদে

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

তিয়াষ মুখোপাধ্যায়

আচ্ছা, কারও সঙ্গে এ রকম হয়েছে, যে অনেকগুলো পদ নিয়ে খেতে বসে, খাওয়া শেষ করার পরে, থালা চাটার সময়ে, পাতের কোনও এক প্রান্ত থেকে সব চেয়ে সেরা পদটার একটা টুকরো আচমকা খুঁজে পাওয়া…! বা, কোনও অনুষ্ঠান বাড়িতে খেতে বসে, হাত চাটার পরে জানতে পারা, আরও একটা দারুণ পদ বাকি আছে…!

কবি তক্তগুল…

হয়নি? আমার তো খুবই হয়। ছোটবেলায় আরও বেশি হতো। হয়তো ডাল-ভাত দিয়ে পোস্তর বড়া খাওয়ার সময়ে একটা টুকরো বাঁচিয়ে রেখেছি, পরে খাব বলে। তার পরে তরকারি, মাছ পার করে ফেলার পরে, চাটনি চেটে নেওয়া হয়ে গেলে হঠাৎ দেখি, পাতের এক কোণে জ্বলজ্বল করছে সেই পোস্তর বড়ার টুকরো…!

বলাই বাহুল্য, এই সব কিছু শেষের পরে আবিষ্কার করা মহার্ঘ টুকরোটা আর নিছক প্রিয় খাবারের অংশ থাকে না, আলাদা একটা প্রাপ্তি হয়ে ওঠে। আনন্দটাই এখানে আসল, সুস্বাদের থেকেও বেশি প্রিয় সেই আনন্দ।

অভিযানের এই দিনটাও ঠিক সে রকমই ছিলো আমাদের কাছে।

সমস্ত সেরা অংশ পার করে ফেলেছি। পামিরের পথে অভিযাত্রা শেষ। শহরে ফেরার পথ ধরা হয়ে গেছে। সে পথে একটা দুর্ঘটনাও ঘটানো হয়ে গেছে। এবার সেখানে পৌঁছনো বাকি, যেখান থেকে শুরু করেছিলাম অভিযান।

এরকম একটা সময়ে আমাদের পথে পড়ল তক্তগুল। নারিন নদীর একটা বিশাল রিজ়ার্ভার। কিরঘিজ় কবি তক্তগুল স্যাটিলগানভের নামে নাম তার।

এত সুন্দরে, এত শান্তিতে অথচ এত সমারোহে কারা চিরঘুমে যায়…!

পার্ল অফ কিরঘিজস্তান যাকে বলে, সেই ইসাক কুল লেক দেখা হয়ে গেছে। সং কুল লেকের বিশালতায় মুগ্ধ হওয়া হয়ে গিয়েছে। কারা কুল লেকের অপূর্ব নীলিমা চোখে মাখা হয়ে গিয়েছে। ধারণা করতে পারিনি, তক্তগুল সে সব কিছুকে ছাপিয়ে যাবে।

এ দিন ব্রেকফাস্ট করে, ওশ থেকে রওনা দেওয়ার ১০০ কিলোমিটার পরে পড়ল জালাল-আবাদ শহর। তার পরে সে শহরের পথ ছেড়ে আমরা ধরে নিলাম নারিন নদীর কোল-ঘেঁষা পথ। এক দিকে রুক্ষ পাহাড়, অন্য দিকে দুরন্ত নদী, মাঝখানে একফালি কালো পথ বেয়ে আমাদের ছুটে চলা।

এ দিন গত দু’দিনের তুলনায় আমাদের ব্যথা-বেদনা একটু কম। বা বলা ভাল, সয়ে গেছে। রাস্তাও একেবারে ঝকঝকে। আমরা সুন্দর চলেছি। কেবল কষ্টকর ছিলো, অস্বাভাবিক রোদ আর গরম। খুবই ক্লান্ত হয়ে পড়ছিলাম থেকে থেকে। যেখানেই দাঁড়াচ্ছিলাম, জল আর ‘বাবর্স মূত্রা’ খাওয়া হচ্ছিলো।

আর একটা সমস্যা ছিলো, চার জনেরই পেট ডাউন। গরমে এবং ক্লান্তিতে। ফলে মাঝে মাঝেই থামতে হচ্ছে। এ ছাড়াও নারিনের অপরূপ নীল জল আমাদের দাঁড়িয়ে যেতে বাধ্য করছে বারবারই।

এক সময়ে একটা জায়গা এলো, যেখানে একটা বড় অংশ জুড়ে গোল্ডেন পাহাড়ের ক্যানিয়ন। এক ঝটকায় মনে পড়ে গেলো, সফরের সেই গোড়ায় দেখে আসা ফেয়ারিটেল মাউন্টেনের কথা। আর এক ফালি রূপকথার রুমাল যেন আমাদের জন্যই শেষবেলায় মেলে রেখেছিলো পাহাড়।

যেন আরও এক বার মনে করিয়ে দিলো, ঠিক কতটা সুন্দর পেরিয়ে এসেছি আমরা! মনে করিয়ে দিলো, সুন্দরদের মনে করতে করতেই এবার শেষের জন্য প্রস্তুত হতে হবে।

তক্তগুল

সে প্রস্তুতি করতে করতেই অপূর্ব সুন্দর এবং দীর্ঘ পথ পার করে, ঠিক বিকেল হওয়ার মুখে যখন সূর্যের তেজ নরম হয়ে আসছে, হাওয়ার স্পর্শ শীতল হয়ে আসছে, যখন পাহাড়ের খাঁজে খাঁজে কনে দেখা আলোয় হাতের স্নিগ্ধ পাতা সেঁকে নিচ্ছে প্রকৃতি, তখনই আমাদের সামনে ধরা দিলো তক্তগুল।

কী অপরূপ, কী বিশাল, কী গভীর! সামনে থেকে নড়তে না পারার মতো এক অসীম সৌন্দর্য নিয়ে বিরাজ করছে সুস্থির, সুবিশাল এক নীল! সূর্যের রশ্মি গায়ে মেখে, তাকে ঘিরে রয়েছে রাশি রাশি পাহাড়। যেন অমূল্য কোনও সম্পদের চার পাশে বসানো গম্ভীর এক প্রহরা-মালা!

নারিন নদীর কোলে

আরও আরও আরও এক বার নতজানু হয়ে গেলাম আমরা। নতজানুই ছিলাম। নতজানু না হয়ে প্রকৃতির কাছে পৌঁছনো যায় না। কিন্তু এই তক্তগুল যেন পুরোপুরি নুইয়ে দিলো আমাদের। এমন অপার্থিবকে স্বচক্ষে দেখছি! সত্যি!

খুব কাছ পর্যন্ত যাওয়া যায় না। এই লেকের ধার ঘেঁষে যথেচ্ছ তাঁবু ফেলার দুর্মতিও এখনও পর্যন্ত এ দেশে হয়নি। পর্যটন-ব্যবসা নিয়ে আরও বেশি করে ভাবনাচিন্তা শুরু করলে, ভবিষ্যতে হয়তো হবে।

বিস্ময়ে, তাই জাগে…

আসল তক্তগুল শহরটা লেক থেকে কয়েক কিলোমিটার দূরে। সেখানে পৌঁছে একটা হোমস্টে খুঁজে নিলাম আমরা। সন্ধ্যে ঘনিয়ে এসেছে তখন। হোমস্টে-র মালকিন রান্নাবান্না শেষ করে ফেলেছেন। আমরা গিয়ে জুড়ে বসলাম। প্রথমে অনেক বার না বলেও, শেষে রান্না চাপালেন অসীমা‘দি। আর আমরা হাতমুখ ধুয়ে হাঁ করে অপেক্ষা করতে লাগলাম কখন রান্না শেষ হবে।

ডিনারের পরে জমাটি ঘুম নেমে এল চারটে ক্লান্ত শরীরে।

তার পর…(চলবে)

ছবি:লেখক

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]