পৃথিবীর ছাদে

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

তিয়াষ মুখোপাধ্যায়

তেরো.

হিসেব মতো, অভিযানের আর একটি মাত্র দিন বাকি। ১৪ তারিখ। এই দিন বিকেলেই শুরুর দিনের শহরে পৌঁছে বাইক দু’টো জমা দিয়ে দিয়েছিলাম আমরা।

আলা বেল পাস…

আমি ১৩ তারিখ অবধি লিখে ফেলেছি, ফলে আর একটাই দিনের কথা লেখা বাকি। যদিও আমায় এখনও কম করে হলেও চারটে পর্ব তো লিখতেই হবে। সে আমার ভেতরে সঞ্চয় করা সবটুকু উজাড় করার জন্যই হোক, বা আমার কোনও কিছু অল্প কথায় সেরে ফেলতে না পারার অক্ষম কারণেই হোক।

কেউ না পড়লেও লিখতেই হবে আমায়।

কিন্তু আজ যখন ভাবছি শেষের দিনে পৌঁছেই গেলাম, যে দিনটা ভ্যানিলা কেকের উপর আলতো করে শুয়ে থাকা ছোট্ট লাল চেরিটুকুর মতোই সুন্দর আর মিষ্টি আর আতুসী ছিল… তখনই আবার মনের কপাল জুড়ে নতুন করে ছড়িয়ে পড়ছে মনখারাপের জ্বর। অভিযান শেষে যে শূন্যতা নিয়ে ফিরেছিলাম, সে শূন্যতা ছুঁয়ে যেন আরও এক বার জ্বলে উঠছে বিচ্ছেদের স্ফূলিঙ্গ।

যদি ‘শেষ দিন’ বলে কিছু না হতো, তবে কি খুব খারাপ হতো? অভিযান শেষ করা আমার হাতে ছিল না। কিন্তু এই লেখা শেষ করাটা আছে। শেষ দিনটা হাতের মুঠোয় না রাখতে পারি, এই ভাঙা মুঠোফোনের নোটবুকে তো জমিয়ে রাখতে পারি আরও একটু…!

বাকি রইল গল্প… বাকি রইল শেষের শুরু…
আঁধারের গায়ে গায়ে অপেক্ষার শিশির জমুক রাতভর…

পামিরের ঘন পপলার-পথে ফেলে আসা প্রেমের কান্না ভাঙুক আরও…

এই যে, ওয়াগন বাড়ি।

সমস্ত অভিযানের কিছু নির্দিষ্ট মুহূর্ত থাকে। স্পেশ্যাল কিছু নয়, পরিচিত ও সাধারণ, সকলের জন্যই হয়তো একই, কিন্তু সুনির্দিষ্ট। বাইক এক্সপিডিশনের ক্ষেত্রে, প্রতি দিন সকালে স্টার্ট দেওয়ার সময়টা তারই একটা।

অচেনা কোনও জনপদের আধো ভোরবেলায়, শিরশিরি শীতে চনমনিয়ে যখন বাইকটা প্রথম শব্দ করে ওঠে রাজকীয় গরিমায়, আস্তে আস্তে তার শান্ত ইঞ্জিনটা জেগে ওঠে, পেট্রোলের আলতো গন্ধ ছেড়ে ধোঁয়াটা বেরোয়… তখন আমাদেরও চোখের প্রান্তে লেগে থাকা শেষ ঘুমের রেশটুকু মিলিয়ে যায়। প্রত্যেক দিনই একই শব্দ, একই ধোঁয়া, একই গন্ধ.. তবু রোজ নতুন করে ভাল লাগে। অদ্ভুত এক ভাল লাগা, হয়তো একটা চাপা উত্তেজনাও।

আজ ভোরের সেই বাইক স্টার্টের মুহূর্তটা, সেই শব্দটা, সেই ভাল লাগাটা মনে করিয়ে দিল, কাল সকাল থেকে আর এই শব্দ শোনা হবে না। আজই শেষ এই ভাল লাগাটুকুর।

তক্তগুলের সকাল বড় সুন্দর, বড় মায়াবি। পুরোপুরি জ্বলে ওঠার আগে আলসে সূর্য যখন সবুজ গাছেদের পাতায় উঁকি দেয়, আর তাকে ছুঁতে ঝিরঝির করে ছুটে আসে হাওয়া… তখন যে পৃথিবীর স্নিগ্ধতম দৃশ্যপট তৈরি হয়, তা এ দিনই জানলাম। এরকম ছোটছোট নুড়ি-পাথরের মতো জানাগুলো দিনভর সঞ্চিত হতে থাকে। স্মৃতি কিছু রেখে দেয়, বাদবাকি ফেলে দেয়।

খুব ঠান্ডা লাগতে লাগল, পাহাড়ি পথে ওঠা শুরু হতেই। শেষ কয়েক দিন আমরা গরমে অভ্যস্ত হয়েছিলাম। আজ আবার হঠাৎই ঠান্ডা। শুধু পাহাড়ি পথ বলে নয়, মেঘও করে ছিল খুব। এতটাই ঠান্ডা, যে রাস্তায় বাইক থামিয়ে ফ্লিস চাপাতে হল গায়ে।

খানিক পরে কফি ব্রেক। সবুজ প্রান্তরে ছোট্ট ছোট্ট সাদা ইয়র্ট। বাইরে প্রজাপতির মতো উড়ছে কিছু বাচ্চা। ভিতর থেকে আমাদের দেখছেন এক মধ্যবয়সি মহিলা। কফি ব্যাপারটা বুঝিয়ে ভেতরে ঢুকে বসা গেল। বাচ্চাগুলোর ভারী ফূর্তি হয়েছে, চারটি ভিন্ গ্রহের প্রাণী দেখে। আমি হেসে হেসে ছবি তুলছি।

লাঞ্চব্রেক…

একটা বাচ্চার হাতে একটা আধখাওয়া ভুট্টা ছিল। বাদলদা সেটা দেখার জন্য বা দু’টো দানা খাওয়ার জন্য তার হাত থেকে নিতেই সে ভ্যাঁঅ্যাঁঅ্যাঁ করে কেঁদে দিল। তাড়াতাড়ি ভুট্টা ফিরিয়ে দিয়েও কান্না থামানো গেল না। তার সামনে বাদলদাকে ছদ্ম বকাঝকা ও মারধর করেও তাকে শান্ত করা গেল না। আর এক জনকে কাঁদতে দেখে বাকিরাও থমথম করছে। এর মধ্যে প্রদীপদা একটা ক্ষুদ্রতর ছানাকে কোলে নিয়ে ‘আয় তোর গালের আপেলটা খাই’ বলে আদর করতেই সে-ও কেঁদে দিল। দু’টো উইকেট পড়ার পরে বাকি ছিল আর দু’টো। তার মধ্যে একটা কোনও কারণ ছাড়াই দুই অগ্রজর পথ ধরল। শেষ পড়ে থাকা ছেলেটা টিকে গেল। বাকি তিনের কান্না দেখে সে হাসতে লাগল।

আমরা বুকে বড় বল পেলাম। সে-ই আমাদের ভরসা। নইলে তো ভাবছিলাম আমাদের এসে না পেটায়, বাচ্চাদের কাঁদাচ্ছি বলে। কফি খেয়ে, ফের বেরিয়ে পড়া। বড় সুন্দর পথ। মেঘের আবছায়ায় অন্য এক মায়া নিয়ে ধরা দেয়। বিষণ্ণ হয়ে ওঠে চার পাশ। ভাবতে ভাল লাগে, আমাদের ঘরে ফেরার দিনে পাহাড় মন খারাপ করে আছে হয়তো…

আলা বেল পাস ক্রস করলাম। এই পাসে উঠছিলাম বলেই শীত বাড়ছিল। পাসের পরে নামা শুরু। আর যত নামতে শুরু করলাম, কিরঘিজস্তানটা যেন আর্জেন্টিনা হয়ে যেতে শুরু করল। স্কুলের ভূগোল বইয়ে আর্জেন্টিনার পম্পাস তৃণভূমি। জানি না, কার কার মনে আছে। আমার ছিল না। প্রদীপদা মনে করাল। যেন মনে হতে লাগল, বিশ্বের সেই বৃহত্তম তৃণভূমি পম্পাসেই পৌঁছে গেছি। সীমাহীন বিস্তৃত ঘাসজমি। দিগন্তে জেগে আছে রাশিরাশি সবুজ পাহাড়। মাঝখান দিয়ে ছুটেছে রাস্তা, সে রাস্তায় ছুটছি আমরা।

এত বেশি রকমের সুন্দর, যে এক দিক দেখলে এক দিক মিস হয়ে যায়। চার পাশে যেন ক্যালেন্ডারের পাতা উড়ছে! কোনটা ছেড়ে কোনটা দেখব! ক্ষণে ক্ষণে বায়না করি গাড়ি থামানোর। দেখব, ছবি তুলব। এমনিতেই আমার বদনাম আছে, সময় নষ্ট করার। আমি নাকি খুবই ‘হাঁ-করা’ মেয়ে। সবেতেই হাঁ করে দেখি। আমি তো বুঝে পাই না, মুখ-চোখ বন্ধ করে এরা কী করে সাঁ সাঁ করে গাড়ি ছোটায়। অসহ্য।

একটা ক্যালেন্ডারের পাতার সামনেই দাঁড়ানো হল। অপূর্ব ল্যান্ডস্কেপ। সবুজের নানা রকম শেড বিছিয়ে গেছে মাঠ জুড়ে। গরু-ঘোড়া-ভেড়া একসঙ্গে চরে বেড়াছে। কয়েকটা সাদা ইয়র্ট আর ওয়াগন বাড়ি একলা দাঁড়িয়ে।

পাসের মাথায়…

ওয়াগন বাড়ি ব্যাপারটা কিরঘিজস্তানের কান্ট্রি সাইডে ভর্তি। একটা ছোট কামরার মতো বাক্স। চাকা লাগানো। দেখে মনে হবে, বাতিল কোনও গাড়ি। তার ভেতরে পার্টিশন করে দিব্যি আলাদা আলাদা ঘরের মতো করা আছে। ট্রেনের সিঁড়ির মতো সিঁড়ি রাখা সামনে। সম্ভবত, আগে, এদের পূর্বপুরুষেরা যখন সত্যিকারের নোম্যাড ছিলেন, জায়গায় জায়গায় ঘুরে বেড়াতেন, তখন এরকম চাকা লাগানো ঘরে থাকতেন। ঘর-সুদ্ধুই হয়তো চলে যেতেন এক জায়গা থেকে আর এক জায়গা। কিন্তু এই ওয়াগনগুলোর উৎস কী, কারা কেন তৈরি করেছিলেন, তা জানতে পারলাম না। মানে প্রশ্নটা কাউকেই বোঝাতে পারলাম না আসলে।

সুন্দর, খুব সুন্দর, দুর্দান্ত, অসাধারণ, অপূর্ব, অভূতপূর্ব দৃশ্যদের পার করে, পাহাড়ের আঁকাবাঁকা পথে নেমে, শহরের দিকে এগোতে লাগলাম আমরা। সেই প্রথম দিনে ছোঁয়া চুই নদী ফের বাইকের পায়ে পায়ে জড়াল। বিকেলের দিকে এত হাওয়া দিচ্ছিল, মাঝে মাঝে মনে হচ্ছিল উল্টে যাবে বাইক!

বিশকেক ঢুকছি। সেই বিশকেক, যেখান থেকে শুরু হয়েছিল যাত্রা।

পাহাড়-পথ পার করে কোনও শহর ঢোকার আগের যে সময়টা, সেটার নির্দিষ্ট ফিচার আছে কিছু। রাস্তা সোজা হয়ে যায়, গাছেরা বদলে যায়, পাহাড়ের রং ও টেক্সচার বদলে যায়, গাড়ি বেড়ে যায়…এই সব। এটা যত হতে লাগল, তত যেন চিনচিন করে বাড়তে লাগল মনখারাপ। আর একটুকু সময়, তার পরেই সব শেষ!

আসলে একটা মেশানো অনুভূতি হচ্ছিল। অ্যাকসিডেন্টটা হওয়ার পর থেকে আমাদের এক ও একমাত্র লক্ষ্য ছিল আর কোনও রকম সমস্যা ছাড়া যাতে ভালয় ভালয় বিশকেকে পৌঁছতে পারি। সেই লক্ষ্য ক্রমেই কাছে আসছিল, তার একটা তৃপ্তি ছিল। শরীরের চোটগুলো বিশ্রাম পাবে, আর এতটা করে চালাতে হবে না, তার একটা নিশ্চিন্তি ছিল। আর এ সব কিছুর ওপরে একটা কষ্ট ছিল বিচ্ছেদের। অভিযান শেষের থেকেও, বাইক দু’টোর ওপরে যে কী মায়া পড়ে গেছিল!

পম্পাস…

শহরে ঢুকে পড়ার পরে একটা আজব ব্যাপার হল। বাঁ পাশ দিয়ে একটা গাড়ি খুব কাছে চলে এল, কিছু বোঝার আগেই, ড্রাইভারের সিট থেকে হাত বার করে একটা জ্যুসের বোতল ধরিয়ে দিল একটা ছেলে। গাড়ি চালাতে চালাতেই। আমি তো অবাক! পরে জানলাম, রূপাদিকেও দিয়েছে আর একটা বাইকে। জ্যুসের বোতল দিয়ে, বুড়ো আঙুল দেখিয়ে চিয়ার করে, ফের এগিয়ে গেল গাড়িটা। জানি না কে, সারা দিনের ক্লান্তি আর তেষ্টার সামনে এরকম নাটকীয় ভাবে জ্যুসের বোতল ধরল!

সেই চেনা গ্যারেজে পৌঁছে গেলাম। এগিয়ে এল, ডেনিসরা সবাই। ওরাও খুব খুশি, রীতিমতো উচ্ছ্বসিত। বারবার করে বলল, আমরা যে সবটা করে ফেলব, ভাবতে পারেনি ওরা। ভেবেছিল, মাঝপথ থেকে ফিরে আসব। বারবার করে বলছিল, তোমরা ইনডিয়ানরা কী করে ফেললে, তোমরা নিজেরাও জানো না। খুব ভাল লাগছিল শুনতে।

ওদের বাইক এক্সপিডিশনে আসলে নির্দিষ্ট সংখ্যক বাইক থাকে এক একটা টিমে। সঙ্গে সাপোর্ট ভ্যান, যাতে ডাক্তার, মেকানিক, লিয়াজ়োঁ অফিসার সকলে থাকেন। সব রকম সাহায্য মেলে সেই ভ্যানে। বিভিন্ন দেশের অভিযাত্রীরা এসে দল বাঁধেন। প্যাকেজ হিসেবে টাকা নেওয়া হয়। তার পরে থাকা, খাওয়া– সব এজেন্সির তরফ থেকে ঠিক করা। বাইকার শুধু নির্দিষ্ট বাইকে এসে ওঠেন, তার পরে ওদেরই ঠিক করে দেওয়া রুটে চলেন। থামেন। থাকেন। কারও কিছু এতটুকু অসুবিধা হলে, সাপোর্ট ভ্যান সব রকম সাহায্য করে।

সেই জায়গায় আমরা নিজেরা বাইক নিয়ে, কোনও সাপোর্ট ছাড়া, কোনও প্রি-বুকিং ছাড়া, এত বড় এবং কঠিন রুট, ডাবল ক্যারি করে চালিয়ে শেষ করে ফেলেছি ঠিকমতো, এটা ওদের কাছে রীতিমতো বিস্ময়। আর সে বিস্ময়ের একটা প্রধানতম উপাদান হল, ইনডিয়া! কারণ এর আগে কখনও ইনডিয়ান দেখেইনি ওরা! জানতই না, ইনডিয়ানরাও বাইক নিয়ে কখনও পামিরে এক্সপিডিশন করতে আসবে!… কী ভীষণ ভাল লাগা না এটা…!

ওই পথ গেছে বেঁকে…

এই দিন, এক বন্ধু আগে থেকে একটা হোটেল বুক করে রেখেছিলেন আমাদের জন্য। খোঁজাখুঁজি করতে হল না আর, সোজা গিয়ে উঠে পড়লাম। সেই বন্ধুই অ্যারেঞ্জ করে দিলেন ডিনারের। চিকেন কাবাব, মাটন লাল মাস, রুটি, স্যালাড। অভিযান শেষের পারফেক্ট ডিনার।

বিছানায় কোমর রাখতেই, ঘুমের জন্য আর অপেক্ষা করতে হয়নি দশ সেকেন্ডও। সমস্ত দিনের থেকে যেন এই দিন ক্লান্তি বেশি ছিল। অভিযান শেষে মেন্টালি একটা কিছু কাজ করে। পরের দিন আর চাপ নিতে হবে না– এই ফিলিংটা অবচেতনে চারিয়ে যায়। ফলে শরীর যেন আরও বেশি ছেড়ে দেয়।

পরের দিনটাও আমাদের বিশকেকেই থাকা। বেশ কিছু প্ল্যান আছে। তার মধ্যে একটা, সেই বন্ধুর সঙ্গে সকাল সকাল কিরঘিজ়স্তানের ইন্ডিয়ান এমব্যাসি পৌঁছে যাওয়া। কারণ পরের দিন ১৫ অগাস্ট। ছোট্ট করে পালিত হবে দেশের স্বাধীনতা দিবস। এই বন্ধুর পরিচয়ও পরের দিনই দেব।

তার পর…(চলবে)

ছবি: লেখক

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]