পৃথিবীর ছাদে

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

তিয়াষ মুখোপাধ্যায়

চৌদ্দ.

স্বাধীনতা দিবস। দেশের স্বাধীনতা দিবসে এই প্রথম বিদেশের মাটিতে। কিন্তু পতাকা তুলবো, জাতীয় সঙ্গীত গাইবো… এ সব ভেবে বড্ড উত্তেজনায় ছিলাম আগের রাত থেকেই।

সকাল সকালে বুজাই‘দা এসে গেল। আগের পর্বে লিখেছিলাম, এক বন্ধুর কথা। বলেছিলাম, পরের পর্বে তারঁ কথা বলবো। সেই বন্ধু হলো, এই বুজাইদা। বিশকেকে থাকা একমাত্র বাঙালি সম্ভবত, যার ভাল নাম সুদিপ্ত দাদাকে চিনতাম না। ইন ফ্যাক্ট ভাবতেও পারিনি, বিশকেকে কোনও বাঙালি থাকতে পারেন কাজের সূত্রে!

অ্যামবেসি

আমাদের এক্সপিডিশন শুরু হওয়ার আগে, যখন আমি লিখতে শুরু করলাম তখন হঠাৎই এক দিন একটা পোস্টে কমেন্ট করেছিল পিউ‘দি । ইনবক্স চেক করতে বলেছিল। ফ্রেন্ডলিস্টে না থাকায় দিদির মেসেজ দেখতে পাইনি আমি আগে।

চেক করে দেখলাম, দিদি বলছে, আমার হাজ়বেন্ড বিশকেকে থাকে। কোনও সমস্যা হলে অবশ্যই জানাবে। ও খুবই এক্সাইটেড তোমাদের এক্সপিডিশনের কথা শুনে…….ইত্যাদি। আমি নম্বর সেভ করে নিলাম। তখনই দিদির পাঠানো কনট্যাক্ট থেকে ডাকনামটা জেনে ফেলেছিলাম…

আমি তো অবাক! এ যে অভাবনীয়! বিশকেকে বাঙালি! কিন্তু যাওয়ার সময়ে আমাদের শিডিউল এতই প্যাকড ছিলো, আর সত্যি বলতে সে রকম কখনও কোনও বড় অসুবিধায় না পড়ায়, দাদার সঙ্গে যোগাযোগ করতে হয়নি এত দিন।

প্রথম মেসেজ করলাম, বিশকেকে ফেরার দিন। পরিচয় দিতেই তো উচ্ছ্বসিত। তার পরে সেই দিনের হোটেল, ডিনার সব বুজাই‘দাই ঠিক করে দিলো। আর বললো, পরের দিন আমাদের বিশকেকের ইন্ডিয়ান অ্যামবেসিতে নিয়ে যাবে, স্বাধীনতা দিবস পালন করতে।

সকাল সকাল স্নান সেরে, ব্যাগের তলায় ঢুকিয়ে রাখা যে একটামাত্র পরিষ্কার জামা সেটা বার করে পরে, চললাম অ্যামবেসি। গিয়ে ফ্ল্যাগ তোলা হলো। জাতীয় সঙ্গীত গাওয়ার সময়ে অদ্ভুত এক অনুভূতি। তার পরে অ্যামবাসাডরের ভাষণ। মোদীজির বার্তা পড়ে শোনালেন উনি। আর সেটা শুনেই বুঝতে পারলাম, ঠিক কী কারণে এনআরআই-রা ভাবেন, মোদীর জমানায় দেশের সুদিন এসেছে।

ওশ বাজার…

যাই হোক, এর পরে সারা দিন টুকটাক ঘোরাঘুরি। একটা আসল জায়গা ছিলো ঘোরার জন্য, ওশ বাজার। বিশকেকের ওশ বাজার পৃথিবীর বিখ্যাত বড় বড় বাজারগুলোর মধ্যে একটা। বলা হয়, এমন কোনও জিনিস নেই, যা এই বাজারে পাওয়া যায় না। হ্যাঁ, আমাদের বড় বাজারের মতো। বিশাল লোহার কাঠামোর মাথায় ফাইবারের চাল দেওয়া, তার তলায় খোলা দোকান সারি সারি, রাশি রাশি।

হয়তো কোনও গলিতে মশলা পাওয়া যায়। তা হলে সেই গলির প্রতিটা দোকানেই রাশিরাশি মশলার সম্ভার। এরকমই কোথাও ড্রাইফ্রুট, কোথাও আনাজ, কোথাও বাসন, কোথাও রুটি, কোথাও মাংস, কোথাও ফল, কোথাও চিজ়… থরে থরে সাজানো সব।

চকলেট, বিস্কুট…

ওশ বাজারের ইতিহাস অনেক পুরনো। এই বাজারের পাশ দিয়েই গেছে বিখ্যাত সিল্ক রুট। মানে এখন আর সিল্ক রুট নয়, এক সময়ে ছিলো সিল্ক রুট। ব্যবসা-বাণিজ্যের আখর ছিলো এই ওশ বাজার। উজবেকিস্তান, তাজিকিস্তান, কাজাখাস্তান এ সব জায়গার (আগে সবটাই এক ছিল) বহু দূরদূরান্ত প্রান্ত থেকে ব্যাপারীরা আসতেন তাঁদের পসরা নিয়ে। মূলত ফল বিক্রি হতো। বিদেশের ব্যবসায়ীরা কিনে নিয়ে যেতেন খুবানি (অ্যাপ্রিকট), পিচ, আপেল, আঙুর, প্রুনস, তরমুজ ইত্যাদি। নিয়ে যেতেন এলাচ, দারচিনি, প্যাপরিকা এই সব মশলা। নিয়ে যেতেন জমাট বাঁধা চিজ়, বাটার।

একটা সূত্র বলছে, ওশ মানে সোমবার। আগে শুধু সোমবার করে বেচাকেনা হতো বলে, এই বাজারের নাম ওশ বাজার। আমি নিশ্চিত নই এটা, হতেও পারে।

বিশকেকের রাস্তা…

যাই হোক, ঐতিহাসিক সেই বাজারে ঘুরে, টুকিটাকি কেনাকাটা সেরে, ছবি-টবি তুলে দিন শেষ হলো। এই দিন আমাদের রাতে নেমন্তন্ন ছিলো বুজাই‘দার বাড়িতে।

বুজাই‘দা একা থাকে। পরিবার কলকাতায়। একটা মেডিক্যাল কোম্পানির কান্ট্রি হেড হয়ে বিশকেকে শিফ্ট করেছে, আট মাস হলো। বাইরে আসাটা খুব অনিচ্ছেয় নয়, কিন্তু পাণ্ডববর্জিত জায়গায় গিয়ে মাসের পর মাস থাকাটা… শুনতে হয়তো মনে হচ্ছে, বেশ অ্যাডভেঞ্চারাস, কিন্তু আদতে ততটাও নয়। ভাষাটাও যেখানে অচেনা, জীবন যাপনে এতটুকু মিল নেই, চাইলে একটু পছন্দের খাবার পা

মা লক্ষ্মী মশলা ভাণ্ডার।

ওয়া যায় না, নির্বান্ধব… কয়েক দিনের জন্য ঠিক আছে। রোজের জন্য মুশকিল।

রুটির পাহাড়..

পাকিস্তান অ্যামবেসি, ইন্ডিয়ান অ্যামবেসি আর বাংলাদেশি কনস্যুলেটের কিছু লোকজন আছেন, বন্ধু হিসেবে। সপ্তাহান্তে তাদের এবং তাদের পরিবারের সঙ্গে হয়তো একটু আড্ডা।

এই দিন ছিলাম আমরা। আমাদের হোটেলের কাছেই বুজাই‘দার ফ্ল্যাট। গিয়ে দেখি বিরিয়ানির গন্ধে ভরে আছে ঘরের আনাচকানাচ। আমাদের জন্য সমস্ত জোগাড়যন্ত্র করে নিজের হাতে বানিয়েছে মাটন বিরিয়ানি! সঙ্গে দোকান থেকে আনা চিকেনের আইটেম।

অত দিন পরে বাঙালি শেফের হাতে আলু-ওয়ালা সুগন্ধী বিরিয়ানি যে কতটা ভালো লাগলো, সে আর বলে বোঝানোর নয়। আর খাবারের থেকেও বেশি যেটা ছুঁয়ে যায়, আন্তরিক আতিথেয়তা। হোমলি ফিলিং।

পরের দিন আমরা যাব আলা আরচা জঙ্গলে। এটাকে আমাদের এক্সপিডিশনের শেষ পাতের চাটনি বলা যায়। ঠিক হল, বুজাই‘দা অফিস ছুটি নিয়ে আমাদের সঙ্গে যাবে। তার পরে ঘুরে এসে, বিকেলে ফ্লাইট আমাদের।

রাতে হোটেলে ফেরার সময়ে আর পা চলছে না! কোনও রকমে ফিরেই শরীরটা বিছানায় ঠেকানোর অপেক্ষা।

তার পর…(সমাপ্ত)

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]