পৃথিবীর ছাদে

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

তিয়াষ মুখোপাধ্যায়

দুই.

ভোর চারটের সময় কোনও রকমে চোখটোখ কচলে, ব্রেকফাস্ট ছাঁদা বেঁধে (কমপ্লিমেন্টারি ছিলো, নিতেই হবে), আলমাতির হোটেলের বাইরে বেরিয়ে দেখি সন্তোষ’দা দাঁড়িয়ে আছে গাড়ি নিয়ে। আজ ঠিক করেছিলাম, ওঁর ছবি তুলবোই, এত মানুষ দেখতে চেয়েছেন।

ট্রায়াল রান নয়, ট্রায়াল সিট

কিন্তু ভোররাতে, একটা ফুলের মতো সুন্দর, নিষ্পাপ, ছোট্ট মেয়ে, ঘুমচোখে, ভুবন ভোলানো হাসি সহযোগে গুড মর্নিং উইশ করেও সন্তোষ’দার ঠোঁটের কোণে ভাঁজটুকু ফেলতে পারলো না। এমনিতে কাজাক মানুষজন হাসিখুশি। কিন্তু এই মানুষটি কোনও এক অজ্ঞাত কারণে খুবই গম্ভীর, যিনি নিজের কাজটুকুর বাইরে চোখের পাতাও ফেলেন না।

আলো ফোটার আগেই এয়ারপোর্টে পৌঁছে, গুচ্ছ চেকিং শেষ করে, কফি খেয়ে, সুন্দর ছেলেপিলে দেখে দেখে বোর হয়ে গিয়ে, অবশেষে বোর্ডিং হলো। আলমাতিকে বিদায় জানিয়ে, ৫০ মিনিটের যাত্রা বিশকেকের দিকে। অপরূপ সুন্দর এক উড়ান। ছোট্ট দেশের বড় বড় ধানখেত, গাছগাছালি পেরিয়ে আর এক নতুন দেশে উড়ে এলাম। অপরূপ দেশ এই কিরঘিজস্তান…

বিশকেকে পৌঁছে, মানে মানস এয়ারপোর্টে নেমে যে কেমন অনুভূতি হচ্ছিলো…! সেই মানস… এপিক হিরো মানসের ভূমি…!

এয়ারপোর্টের বাইরে হাসি মুখে প্ল্যাকার্ড হাতে দাঁড়িয়ে ছিলো ভ্লাদ। এই ভ্লাদের সঙ্গেই এত মাস ধরে দীর্ঘ প্ল্যানিং হয়েছে এক্সপিডিশন নিয়ে। পাতার পর পাতা চ্যাট হয়েছে। অসংখ্য মেল চালাচালি হয়েছে। বড্ড সুন্দর, বুদ্ধিদীপ্ত, দায়িত্ববান ছেলে এই ভ্লাদ। ভ্লাদ আমাদের বাইক ভাড়া দিচ্ছে।

ফ্রুঞ্জ নামের একটা জায়গায় একটা হোস্টেল বুক করা ছিলো। ছোট্ট একটা ঘরে দু’টো দোতলা খাট মিষ্টি মতো। এসে, মালপত্র রেখেই ছুট ভ্লাদের সঙ্গে। সিমকার্ড কেনা, কারেন্সি বদলানোর মতো কাজকর্ম সেরে, ভ্লাদের অফিসে মিটিং। আরও এক বার সামনাসামনি বসে ঝালিয়ে নেওয়া অভিযানের খুঁটিনাটি রুটম্যাপ। ভ্লাদের দায়িত্ব ওইটুকুই। বাকিটা পথেই ঠিক করে নেব আমরা।

পেটের ছুঁচোগুলোকে মৃতপ্রায় অবস্থায় নিয়ে, পৌঁছলাম খেতে। লোকাল কিরঘিজ ফুডে জমাটি দুপুর। রকমারি মাংস, ব্রেড, চিজ। অত্যন্ত সুন্দর ও সৌম্য ওয়েটার-ওয়েট্রেসের দল। উজ্জ্বল ও রাজকীয় কারুকার্য। মিষ্টি মতো ছেলেটার নাম দেওয়া হলো সত্যেন। আর পাশের টেবিলের বিদেশিনির নাম কাদম্বরী। খাওয়ার থেকে খিল্লি আর ফূর্তি বেশি করে, সব শেষে বিল হাতে নিয়ে যা হওয়ার তাই হলো। চমকে চ। তবে ডলারে বদলে আশ্বস্ত হলাম, হিসেবের মধ্যেই আছি। কিরঘিজ কারেন্সির নাম সোম। এক সোম এক টাকার সমান।

পথে। এমনিই এরকম

অপূর্ব সুন্দর শহর বিশকেক। এত শান্ত, পরিচ্ছন্ন, হাসিখুশি…মনকে বড় আরাম দেয়। পথে-ঘাটে কত ফুল, কত গাছ। কোনও বিজ্ঞাপন নেই, কোনও চিৎকার নেই। যানবাহন চলে ধীরে, হর্ন না বাজিয়ে। মানুষজন নিজের মতো কর্মচঞ্চল। ঊর্ধ্বশ্বাস ব্যস্ততা এ শহরের বৈশিষ্ট্য নয়। ও, আর একটা অবজার্ভেশন করেছি সারা দিনে, এ শহরের মেয়েরা চোখের ওপর ফল্স আইল্যাশ লাগায়, প্রায় সকলেই।

আমাদের নমিতাও লাগিয়ে রয়েছে সেই সাত সকাল থেকে রাত। হোস্টেলের রিসেপশনিস্ট মেয়েটির নাম দেওয়া হয়েছে নমিতা। আর তার মা হলেন নমিতার মা। দু’জনেই ওই নামে সাড়াও দিচ্ছেন। যদিও এক বর্ণ ইংরেজি বোঝেন না তাঁরা। অথচ অসুবিধাও কিছু হচ্ছে না। দিব্য কাজ চলছে।

এ দিকে, নমিতার এক ভারী মিষ্টি ছানা রয়েছে, বছর তিনেকের। সে কোনও এক অজ্ঞাত কারণে বাদল’দার প্রতি তীব্র আকৃষ্ট। জাস্ট ছাড়ছে না বাদল’দাকে। গলা জড়িয়ে ধরে খ্যাপার মতো হাসছে। বাদল’দা খুবই আশায় আছে, ছানা এবং ছানার মায়ের পছন্দ যদি কোনও ভাবে মিলে যায়….

খাবার

দুপুরে খাওয়ার পরে বেরিয়ে কারও আর নড়তে ইচ্ছে করছে না আমাদের। এত বেশি খাওয়া বলে নয়, ক্লান্তিতে। কত দিন ঘুম নেই…! তার ওপর আজ ভোরে ফ্লাইট থেকে নেমে অবধি দৌড় চলছে। স্নানও হয়নি কারও। এখানে খাবারদাবার খুব কম মশলায় রান্না হয়। ব্যবহার হয় অলিভ অয়েল। তাই জন্যই হয়তো রাতারাতি ফুড হ্যাবিট একেবারে বদলেও কোনও সমস্যাই ফিল করছি না কেউ। তবে তীব্র গরম। রোদের ঝাঁঝ কয়েক গুণ বেশি। ঘাম নেই, কিন্তু চিড়বিড়ে অস্বস্তি আছে।

এই সময় হোস্টেলে ফিরে একটু গড়ানোর প্ল্যান ছিলো আমাদের, ফের বিকেলে বেরোতাম। কিন্তু তখনই খবর এলো, আমাদের পক্ষীরাজেরা রেডি। আমরা গিয়ে চেক করতে পারি। নিমেষে উধাও ক্লান্তি। ছুটলাম গ্যারেজ।

বিএমডব্লিউয়ের জায়গায় একটা হোন্ডা আর একটা কাওয়াসাকি দেখে আমি বেজায় বেজার হলাম। কিন্তু যারা চালাবে, তারা বড়ই খুশি। স্যাটিসফায়েড বাইক দেখে। ছোট্ট করে টেস্টরাইড সেরে, সব খুঁটিনাটি বুঝে, হোস্টেলে ফিরে প্যাকিং। আসলে বাইক দু’টো চোখে দেখার আগে অবধি আমরা কিছুতেই আন্দাজ পাচ্ছিলাম না, কী ভাবে কী হবে। ক্যারিয়ার নিতে হবে নাকি স্যাডেল ব্যাগ ফিট করবে, স্যাডেল ব্যাগ ফিট করলে সেটা ওরা দেবে, না আমাদেরটাতেই হবে… এই সব নানা ছোটখাটো বিষয় ছিলো।

প্যাকিং সারতে সন্ধ্যে সাতটা। বাইরে তখনও ঝলমলে আলো। কিন্তু আমাদের বাতি তখন নিভে এসেছে। ভাল করে রেস্ট না নিলে, কাল থেকে বেশ মুশকিল। গায়ের জোরে যে লড়াই করছি ক্লান্তির সঙ্গে, সেটা বাইকিংয়ের সময়ে করা মুশকিল। তাই বাতিল হলো বিশকেকের গন্তব্যগুলো। ফেরার পথে হবে। আজ রেস্ট চাই। হোস্টেলেই খেয়েদেয়ে, হিসেবপত্র সেরে, সোজা বিছানায়।

কাল থেকে শুরু, পামিরের পথে বাইকিং…(চলবে)

ছবি: লেখকের ফেইসবুক থেকে

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]