পৃথিবীর ছাদে…

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

তিয়াষ মুখোপাধ্যায়

তিন.

মাঝে ডেনিস, গ্যারেজের সুপারভাইজার..

সকাল থেকে বাদল’দা আর প্রদীপ’দা উঠে অদ্ভুত আচরণ করতে লাগলো। কেউ মুখে ক্রিম মাখছে, তো কেউ ৫০ বার চুল আঁচড়াচ্ছে। টিশার্টের রং যথেষ্ট আকর্ষণীয় হয়েছে কি না জিজ্ঞেস করছে পরস্পরকে।

কী কেস?

না আজ নাকি তাদের প্রথম ডেটিং, নতুন গার্লফ্রেন্ডের সঙ্গে। নতুন বাইক চালানো আর নতুন গার্লফ্রেন্ডের সঙ্গে দেখা করতে যাওয়ার মধ্যে নাকি কোনও তফাৎ নেই। প্রথম দিন যেমন কিছু বেচাল করলেই গার্লফ্রেন্ড বিগড়ে যেতে পারে, বাইকের সঙ্গেও যথেষ্ট সুন্দর আচরণ না করলে সে খেপে যেতে পারে। আর এক বার খেপে গেলে নাকি তার ট্যানট্রামের শেষ নেই।

৯টায় গ্যারেজ খুলবে বলেছিলো ভ্লাদ। আমাদের পৌঁছতে ৯:১০ হলো। ১০ মিনিট গার্লফ্রেন্ড একা দাঁডিয়ে থাকবে, এই মর্মে দুঃখপ্রকাশ করে মুখোমুখি হলেন তারা। মুগ্ধতা বিনিময় হলো চার জোড়া চোখে। তার পরে প্যাকিংয়ের পালা। আমরা ডাফেলে করে সব নিয়ে গেয়েছিলাম, ওখানে গিয়ে স্যাডেলে প্যাক করার পালা। সময় লাগলো।

শেষমেশ ১১টা নাগাদ বেরোলাম গ্যারেজ থেকে। বেরিয়ে, তেল ভরে রওনা দিলাম। গন্তব্য, বোকেনভায়েবো। ২৮০ কিলোমিটার দূরত্ব। প্রথমে শহর ছাড়তেই অনেকটা সময় লাগলো। তার পর হাইওয়ে। সেটাও অনেকটা স্ট্রেচ। ঘণ্টা দু’য়েক পরে একটা চায়ের দোকানে ব্রেক নেই। ফলের দোকান। রাস্তার ধারে তরমুজ, আপেল, টোম্যাটো, খুবানি, আঙুর, পিচ নিয়ে বসেছেন স্থানীয় মহিলারা। পেট ভরে তরমুজ খাওয়া হলো।

হাইওয়ে…

ফের চলতে চলতে পাহাড় দেখা দিলো খানিক পরে। আমাদের পাশে পাশে ছুটছে চুই নদী। চুই নদীর ওপারেই কাজাকাস্তান। দু’দেশের সীমান্ত দিয়ে চু-কিত-কিত খেলতে খেলতে এগোচ্ছি আমরা। অ্যাট আ স্ট্রেচ লম্বা হাইওয়ে। ঘুম পেয়ে যায় টানা চালাতে। ঘুম কাটানোর মতো ঘটনা ঘটে গেলো। পুলিশ ধরলো।
কেন? না, জোরে চালিয়েছি আমরা। কিন্তু জোরে আমরা মোটেই চালাইনি। ৯০ কিলোমিটার পার আওয়ার স্পিড লিমিট, তার মধ্যেই ছিলাম। কিন্তু ধরা পড়ার পরে জানলাম, রাস্তায় নাকি মাঝেমাঝেই বোর্ড দিয়ে স্পিড লেখা ছিল ৪০-৫০-৬০ এই সব। দেখিনি। দেখলেও বুঝিনি।

এমনই করে মাছ বিক্রি হয় দিঘার মতো…

২০ হাজার সোম ফাইন চাইছে। এক বর্ণ ইংরেজি বোঝে না। কাল রিয়্যালাইজ করলাম, অন্য সব কিছু নানা ভাবে বোঝানো গেলেও, ‘ভুল হয়ে গেছে, এবার ছেড়ে দাও, টাকা নেই’ বোঝানো জাস্ট অসম্ভব। শেষে পাতি বাংলায় কাকুতিমিনতি শুরু করলাম। হাজার সোম দিয়ে পর ছাড় মিললো।

তার পরে একটু কান্ট্রিসাইড চলে আসার পরে নৈসর্গিক দৃশ্য জাস্ট অপূর্ব। চোখ ফেরানো যায় না। তার মধ্যে চমকে দিয়ে মাঝেমাঝেই আসছে একটা করে গোরস্থান। কী তাদের সৌন্দর্য…! কত যত্নে বানানো বেদি!

পাহাড়ের কোলে একটু একটু করে ঢুকে চলেছি আমরা। নতুন নতুন ভাবে ধরা দিচ্ছে পাহাড়। কখনও একেবারে ব্রাউন কখনও সবুজের ছিটে। কখনও আবার একেবারেই সবুজ।

সোনার পাহাড়…

ইসাক কুল পৌঁছলাম। ইসাক কুল হল কিরঘিজস্তানের একটা লেক। কুল মানে লেক। অপূর্ব সুন্দর। এত বড়, যে সমুদ্রের মতো লাগে… প্যাংগঙের মতোই জলটা নীল বলে জানতাম। কিন্তু মেঘলা আকাশ নীলের মধ্যে ধূসর মিশিয়ে দিয়েছে। এক অন্য রকম রূপ…

ইসাক কুল পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহত্তম অ্যালপাইন লেক। মানে পাহাড়কোলে যত লেক আছে, তার মধ্যে দ্বিতীয়। প্রথম হলো বলিভিয়ার তিতিকাকা লেক। ইসাক কুলকে বলা হয় পার্ল অফ কিরঘিজস্তান। কিরঘিজস্তানের মুক্তো দানা।

হাঁ করে সব দেখতে দেখতে চলেছি। এক সময় হাঁ অবস্থায় স্থির হয়ে গেলো মুখ। আকাশজোড়া রাম ধনু! আস্ত… পরিষ্কার হাফ সার্কেল… একটু ভাল করে দেখতেই, দেখি একটা নয়, দু’টো! দু’-দু’টো রামধনু দেখছি চোখের সামনে…!!

ফ্রুট-ব্রেক…

বিকেল পড়ে আসছে তখন। বিকেল মানে সন্ধ্যে। কারণ এখানে সূর্য ডোবে প্রায় ন’টায়। তার কিছু আগে, বোকোনবায়েভো ঢোকার খানিক আগে, সেইটেক গ্রামের একটা পেট্রোল পাম্পে ঢুকলাম আমরা।

আর তখনই ঘটে গেলো এক্সপিডিশনের প্রথম বিপর্যয়।

বাদল’দার বাইকে তেল ভরার পরে, ট্যাঙ্ক থেকে ইগনিশন কী বার করতে গিয়ে চাবির অর্ধেক টুকরো ভেতরে থেকে গেল! সে টুকরো ঠুকে বার করা হলো। কিন্তু ভাঙা চাবি দিয়ে গাড়ি আর স্টার্ট নিলো না। মানে না নেওয়ারই কথা।

ইসাক কুল…

সাড়ে আটটা বাজে, শীত করছে, অন্ধকার প্রায় নেমে গেছে, আমরা গালভর্তি মাছি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছি। অত ভারী গাড়ি ঠেলে নিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। তার চেয়েও বড় কথা, একটা বর্ণ কাউকে কিছু বোঝানো সম্ভব হচ্ছে না। কী অবস্থা!

আমি আর রূপাদি গেলাম, কাছাকাছির মধ্যে মাথাগোঁজার জায়গা কী আছে খুঁজতে। খুঁজতে গিয়ে দেখা পেলাম এঞ্জেলের। হ্যাঁ, ও এঞ্জেলই। গুলজাদা তার নাম। ইংরেজি জানে। সমস্যা শুনলো, বুঝলো। কাছেই একটা হোমস্টে-র সন্ধান দিলো। হোমস্টে যতটা কাছে, তার চেয়েও কাছে ওর কাজিনের বাড়ি, ও যেখানে আছে এখন। পেট্রোল পাম্পের ঠিক উল্টো দিকেই। সেখানে চাবিহীন বাইকটা পার্ক-ও করতে দিলো। আমাদের পৌঁছে দিলো হোমস্টে।

গোরস্থান…

ও এঞ্জেল নয়, তো কে এঞ্জেল?

হোমস্টে-তে গিয়ে দেখলাম সব খাবার শেষ। আশপাশের সব দোকানও বন্ধ। শেষমেশ ঘ্যানঘ্যান করতে, বললো স্যুপ বানিয়ে দেবে। তারপরে খেতে বসে দেখলাম… কী দেখলাম, সেটা ছবিতে রইলো।

ভীষণ, ভীষণ ক্লান্ত। বিধ্বস্ত। টেনশনও। জানি না, কাল কী হবে। ঘুমিয়ে গেলাম সবাই।

তার পর…( চলবে)

ছবি: লেখকের ফেইসবুক থেকে

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]