পৃথিবীর ছাদে…

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

তিয়াষ মুখোপাধ্যায়

চার.

রাতেই হোয়াটসঅ্যাপ করা হয়েছিলো ডেনিস আর ভ্লাদকে, চাবি ভেঙেছে বলে। ওরা জানিয়েছিল, দেখছে কী করা যায়। ইতিমধ্যে আমরা খবর নিয়ে নিয়েছি, ওখানে কোনও দোকানে চাবি বানায় না।

সকালে খবর এলো, চাবি আসছে। চাবি নিয়ে আসছে একটা ছেলে। প্রায় ৩০০ কিলোমিটার উজিয়ে। বললো, দুপুর ২টোয় পৌঁছে যাবে চাবি।

এরা বেশি কথা বলে না। কিন্তু যেটুকু বলে, সেটুকুর অন্যথা হয় না। কমিটমেন্ট ইজ কমিটমেন্ট।
ভ্লাদ আর ডেনিস বলেছিলো, কিরঘিজস্তানের বর্ডারের মধ্যে যে কোনও সমস্যায় জানাবে, হেল্প পৌঁছে যাবে। ব্যস, এটুকুই। একটা হোয়াটসঅ্যাপ করলাম রাতে, পরের দিন চাবি চলে এলো। কেবল দু’টোর জায়গায় চারটে হলো।

ঘটনাচক্রে, ওই দিন আমাদের রেস্ট ডে ছিলো। রেস্ট ডে ঠিক নয়, আশপাশের কিছু জিনিস দেখার, এক্সপ্লোর করার ছিলো। তারই মধ্যে একটা ছিলো ‘ঈগল হান্টিং’।

পামিরের নানা প্রান্তে প্রচুর যাযাবরের বাস। বলা ভাল, বাস ছিলো। পাহাড়ি অঞ্চলের এই যাযাবরদের মূল জীবন ও জীবিকা হলো, শিকার। ওদের স্টেপল ফুড হলো বিভিন্ন প্রাণির মাংস। এই মাংস সংগ্রহ করার উদ্দেশে ঈগল পুষত তারা। অনেক উঁচু অবধি আকাশে উড়ে পাহাড়ি শেয়াল, পাহাড়ি ছাগল, পাহাড়ি খরগোশ শিকার করে নিয়ে আসতো। তার বদলে সঙ্গে সঙ্গে তাকে দিতে হবে মাংসের ভাগ। এটাই ডিল।

পামির অঞ্চলে পাওয়া যায় সোনালি ডানার বিখ্যাত ঈগল। স্থানীয় ভাষায় নাম, কারাকুস। কেউ যদি ‘দুরন্ত ঈগল’ উপন্যাসটি পড়ে থাকেন, তবে এই বিষয়টা আরও খোলসা হবে।

এখন না আছে সেই যাযাবর জীবন, না আছে সেই সোনালি ঈগল। তারা এখন বিরল প্রজাতির। কিন্তু রয়ে গেছে সেই অভ্যেস, সেই সংস্কৃতি। যাপনে নয়, রোজগারে।

যাযাবরদের বংশধরেরা এখন শিকার করে খায় না, কিন্তু ঈগল নিয়ে শিকারের সেই খেলা দেখায় নানা রকম। ঈগল পুষে, তাকে দিয়ে খেলা দেখায় নানা রকম। কোনওটাই যে খুব অত্যাচারের বা চাপের তা নয়, কিন্তু একটা শিকারি পাখিকে পোষ মানিয়ে পুষে রাখার মতো অত্যাচার আর কী হয়…!

হাতে করে ঈগল নিয়ে নানা রকম খেলা দেখাল একটি ছেলে। ঈগলটির নাম কারাকুস। সে আবার ওই নামে ডাকলে সাড়াও দেয়। বয়স তার ২। ওজন ৫ কেজি। আমাদের এক্সাইটেড লাগছিলো খুবই, একই সঙ্গে বেশ খারাপও লাগছিলো। এটা বন্যপ্রাণ বিরোধী। কিন্তু সেই সঙ্গে এটাও ভাবছিলাম, যে ওদের রোজগারের অন্যতম একটা উপায় ওটাই। বড্ড যত্নও করে ওরা পাখিটাকে। রোজ এক কেজি করে মাংস খায় কারাকুস। খাওয়ার পরে যত্ন করে ঠোঁট মুছিয়ে দেওয়া হয় তার। কেবল পর্যটকদের সামনে চোখে বেঁধে রাখা হয় ‘তোমোগো’। গরুর চামড়া দিয়ে তৈরি ঠুলি। যাতে অচেনা মানুষ দেখে সে খেপে না যায়।

খানিকক্ষণ এভাবে খেলানোর পরে, বার করে আনলো আস্ত একটা খরগোশ। জ্যান্ত। ওটাকে ছেড়ে দেওয়া হবে মাঠে। আর উড়িয়ে দেওয়া হবে কারাকুসকে। লাইভ শিকার করে দেখাবে সে। আমরা হাঁ হাঁ করে উঠলাম। করতে হবে না শিকার, মারতে হবে না খরগোশটাকে।

মনটা খারাপই হয়ে গেলো, নতুন জিনিস দেখতে গিয়ে। এরকমটা হওয়ার কথা নয় একটা পাখির সঙ্গে। অথচ স্থানীয় যাযাবর সম্প্রদায়ের ওই মানুষগুলির রোজগারের বিকল্পই বা কী হতে পারে, জানি না।

মন খারাপ নিয়ে, লাঞ্চ করে, হোমস্টে-তে ফিরলাম। দুপুর দু’টো তখন। জানতে পারলাম, চারটে বাজবে চাবি নিয়ে আসতে। অপেক্ষা করছি বসে। তখনই ভাব জমলো পুচকু দু’টোর সঙ্গে। মহা দুষ্টু দুই ভাইবোন। ওদের মা তখন দিব্যি বিশ্রাম নিচ্ছে খাওয়াদাওয়ার পরে। আর ওরা চুটিয়ে দুষ্টুমি করছে আমাদের সঙ্গে। ছবি রইলো।

চাবি এসে যাওয়ার পরে, বেরিয়ে পড়লাম আমরা। গন্তব্য, ফেয়ারিটেল মাউন্টেন। একটা পাহাড়ের নাম নাকি ‘রূপকথা’…! যে দিন থেকে শুনেছিলাম, সে দিন থেকে চুম্বকের মতো টানছে এই পাহাড়… কিন্তু বিকেলে আকাশ মেঘলা। ‘ফেয়ারিটেল’ খুলবে না ভালো। তাই থেকে গেলাম একটা ক্যাম্পে। এখানে থাকার জায়গা বলতে ‘ইয়র্ট’। ইসাক কুল লেকের ধারে সাদা সাদা গোল গোল তাঁবু, ধানের গোলার মতো। ভেতরে ম্যাট্রেস পাতা। টয়লেট আর ডাইনিং আলাদা।

সন্ধ্যেয় একটা মনমাতানো সূর্যাস্ত উপহার দিলো ইসাক কুল। মেঘের ধূসর বিষণ্ণতা ধুইয়ে দিলো উজ্জ্বল কমলা আলোর স্রোত। আকাশ ভরে হোলি খেললো প্রকৃতি। আড়ম্বর করে পাটে বসলেন সুয্যিমামা…

আমাদের সময় হয়ে এলো ঘুমের দেশে যাওয়ার। পর দিন সকাল সকাল রূপকথায় পাড়ি দেওয়ার স্বপ্ন চোখে নিয়ে, ইয়র্টের ম্যাটে গা এলিয়ে দিলাম সকলে।

তার পর…

ছবি: লেখক

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]