পৃথিবীর ছাদে

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

তিয়াষ মুখোপাধ্যায়

পাঁচ.

সকালে ঘুম ভেঙেই মনে পড়ল রূপকথার পাহাড়ে যাওয়ার দিন আজ। তাড়াতাড়ি তৈরি হয়ে বেরিয়ে পড়লাম। ব্রেকফাস্টও করিনি। এই জন্যই আগের রাতে ঘাঁটি গেড়েছিলাম স্কাজকা গ্রামে। কিরঘিজ ভাষায় স্কাজকা শব্দের অর্থ রূপকথা।

অপূর্ব এক পথ পেরিয়ে পৌঁছলাম রূপকথার কোলে। এই পামির রিজিয়নের পাহাড়ের যা টেক্সচার, যা ফিচার, তার থেকে

কিরঘিজ দিম্মা.

সম্পূর্ণ অন্য রকম একটা রহস্যময় চেহারা নিয়ে, বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে বেড়ে উঠেছে এই রূপকথা। সাদা চোখে দেখলে, আমাদের লালমাটির পাহাড়ের মতো। ছোটনাগপুর মালভূমির মতোই লাল। কিন্তু মাটি নয়, পাথর আর বালি। আর রংটাও কেমন সোনালি আর রাস্ট মেশানো। তাতে আবার সবুজ, কমলার কারুকাজ। আমি জানি না, ক্যামেরায় কতটা ধরা পড়েছে।

এই ফেয়ারিটেল মাউন্টেন নিয়ে ফ্যাসিনেশন তৈরির পেছনে দায়ী যে মানুষটি, তার নাম Albert Dros. বিশ্ববিখ্যাত নেচার ফোটোগ্রাফার। নানা জায়গায় ঘুরে ঘুরে প্রকৃতির ছবি তোলেন। উনিই এক্সপ্লোর করেন কিরঘিজস্তানের এই অপূর্ব পাহাড়টা। তার আগে পাহাড়টা ছিলো না তা নয়, তবে তা শুধুই স্থানীয় মানুষের উইকেন্ড ট্রিপ। অ্যালবার্টের সেই ছবিটাও রইলো।

গোটা কিরঘিজস্তান দেশটাই আসলে ট্যুরিস্ট ও ট্র্যাভেলরদের কাছে অনাদৃত একটা জায়গা। কেউ আসেই না সে ভাবে! বিদেশিরা যাও বা খুব অল্প সংখ্যায় আসেন, ভারতীয়রা তো নয়-ই। সব জায়গাতেই অদ্ভুত বিস্ময়ের সম্মুখীন হচ্ছি আমরা। আর একটা মজার ব্যাপার, ইন্ডিয়া বলতে এখানে অনেকেই এক জনকে চেনেন। শাহরুখ নয়, সালমান নয়, তিনি মিঠুন চক্রবর্তী! ডিস্কো ডান্সার আর জিমি জিমি করে নেচে উঠছে লোকজন!

কাল ফেয়ারিটেল পর্ব শেষ করে আমরা রওনা দিলাম সং কুলের উদ্দেশে। পাহাড়ের অনেকটা ওপরে, কয়েকটা পাস পেরিয়ে, আরও একটি অপূর্ব লেক।

লেক

কিন্তু ভাগ্যদেবী প্রসন্ন ছিলেন না কালও। সং কুল পৌঁছনোর ঘণ্টা দুয়েক আগে, কোচকোর বলে একটা গ্রামের কাছে প্রদীপদার বাইকের চাকা গেল পাংচার হয়ে। আড়াই ইঞ্চির একটা বাঁকা পেরেক কী করে ঢুকে গিয়েছে টায়ারে। মাঝ রাস্তায় আবারও এক গাল মাছি। ফোনে নেটওয়ার্ক নেই, যে ভ্লাদের থেকে সাজেশন চাইবো।

আমাদের কাছে পাংচার সারানোর টুলকিট ছিলো। টিউবও ছিলো এক্সট্রা। ছিলো হাওয়া দেওয়ার যন্ত্রও। কিন্তু সমস্যা হলো, চাকাটা খোলা। এই উঁচু ডাট বাইকগুলোয় ডবল স্ট্যান্ড নেই। সিঙ্গল স্ট্যান্ড। ফলে এক দিকে কাত হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা অবস্থায় চাকা খোলা অসম্ভব।

ফেয়ারিটেল

পথচলতি ট্রাক দাঁড় করিয়ে, ওঁদের সাহায্য নিয়ে, গাড়ি চাগিয়ে, তলায় পাথর রেখে চাকা খোলা হলো কোনও রকমে। ওই ট্রাকে করে নিয়ে যাওয়া হলো, ২০ কিলোমিটার দূরের গ্যারেজে। আমি আর বাদল’দা গেলাম, রূপাদি আর প্রদীপদা রইল বাইক নিয়ে। গ্যারেজে চাকা সারিয়ে, ফের একটা অন্য গাড়ি করে আনা হলো স্পটে। সঙ্গে একটা যন্ত্র, যেটা দিয়ে বাইকটা চাগানো যাবে। এ দিকে আমরা তাড়াহুড়ো করে এসেছি, টাকা আনা হয়নি সঙ্গে। ফলে আমায় ‘গ্যারেন্টার’ হিসেবে রেখে বাদল’দা ফিরে গেল চাকা আর যন্ত্র নিয়ে। তখন সময় সাড়ে চারটে।

আর এই গোটা পর্বটা অসম্ভব ছিলো, যদি না আর এক দেবদূতের সাক্ষাৎ পেতাম। তার নাম দাস। ইংরেজি বোঝে সে। গোটা সমস্যাটা ও বুঝতে আর বোঝাতে পাররো বলেই শেষমেশ উপায় হলো।

ফেয়ারিটেল

এ দিকে আমি তো একা বসে আছি গ্যারেজে। আমার কাছে না আছে মোবাইল, না আছে ঘড়ি। সময় আর কাটে না… এই করে করে ছ’টা বেজে গেলো। মেঘ করে আচমকা ঝড় উঠলো। সঙ্গে ছুঁচবেঁধানো ঝিরঝিরে বৃষ্টি।

আলাপ হলো একটা ছেলের সঙ্গে। ২৮ বছর বয়স, কারা কুল এলাকায় থাকে। ওর ইন্ডিয়া সম্পর্কে ধারণা ছিলো, সেখানকার মেয়েরা খুব সফ্ট আর রোম্যান্টিক হয়। ইন্ডিয়া বলতে ও বোঝে, ‘কামসূত্র’। আমার সঙ্গে ১৫ মিনিট কথা বলার পরে সেই সফ্ট আর রোম্যান্টিক ধারণা ভেঙে খানখান হয়ে গেলো। কামসূত্রের দেশ যে এখন কেবল রাম আর মূত্রের দেশ, সে কথা জেনে আমার চেয়েও বেশি ডিপ্রেসড হয়ে পড়ল বেচারা।

দাস আর জাস

সাড়ে ছ’টায় প্রদীপদারা ফিরলো বাইক নিয়ে। তখন আর সম্ভব নয় এগোনো। রোদ থাকলে তবু হতো ঘণ্টা দুয়ের ড্রাইভ, কিন্তু যে আবহাওয়া ছিলো, তাতে আর সম্ভব হলো না।

গ্যারেজের উল্টো দিকেই দাসের বাড়ি। হোমস্টে-ও আছে। হোমস্টে-র নাম দাসতান। দাসের বৌ জাস। সে মেডিক্যাল স্টুডেন্ট। অসম্ভব মিষ্টি একটা পরিবার, অপূর্ব আতিথেয়তা। ঠিক যেন বাড়িতে কুটুম এসেছে, জাস ব্যস্ত হয়ে পড়ল চা-কফি বানাতে। রাতের খাবার তৈরি করতে। টায়ার পাংচারের বিপর্যয়টা না ঘটলে, বিদেশের মাটিতে এই উষ্ণতাটুকু পাওয়া হতো না। আবার অন্য দিকে, সব ঠিক থাকলে, আমরা নির্দিষ্ট সময়ে গন্তব্যে পৌঁছে যেতাম, দিন নষ্ট হতো না। কোনও দিকেই ক্ষতি নেই সব দিকেই লাভ।

ঘরের বাইরে বেরোলে তবে বোঝা যায়, গোটা পৃথিবীটাই আসলে ঘর। প্রতিটা মানুষই আত্মীয়। ভরসা করে ডানাটা মেলতে হবে কেবল।

তার পর…(চলবে)

ছবি: লেখক

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]