পৃথিবীর ছাদে

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

তিয়াষ মুখোপাধ্যায়

ছয়.

এই দিনটা ছিলো এই গোটা অভিযানের সব চেয়ে আকর্ষণীয় দিনগুলোর মধ্যে একটা। এই সৌন্দর্য, এই অপার মুগ্ধতা বর্ণনা করার ভাষা সত্যিই নেই আমার। ছবি

আমাদের ঘর..

কতটুকু বলবে, আমি জানি না।

আমাদের গন্তব্য ছিলো সং কুল। কুল মানে লেক, আগেই বলেছি। প্রায় তিন হাজার মিটার উচ্চতায় অসংখ্য পাহাড় দিয়ে ঘেরা এক তেপান্তরের মাঠ, সেই মাঠের কোলে বিশাল এক নীল জলের হ্রদ। মাঠের মাঝে ইয়র্টে থাকা। মাঠ পেরিয়ে লেক পৌঁছনো অসম্ভব ব্যাপার এক রকম। মাঠ মাঠ বলছি বটে, তবে তার আগে কিন্তু তেপান্তর কথাটাও বলেছি। এই মাঠে ইচ্ছে করলেই হারিয়ে যেতে পারে যে কেউ। এক মাথায় হারালে, আর এক মাথায় খবর পৌঁছবে না।

কোচকোর থেকে দাস আর জাসকে বিদায় জানিয়ে শুরু করতে একটু বেলাই হয়ে গেলো আমাদের। শহর ছাড়ার পর থেকেই মুগ্ধতা শুরু। দিগন্তবিস্তৃত সবুজ গিয়ে চুমু খেয়েছে পাথুরে পাহাড়ের পায়ে। পাহাড় আর গাছের সাজে এমন অপরূপ পথ কমই দেখেছি আগে।

প্রথমে অনেকটাই ঝকঝকে কালো রাস্তা, অ্যাট আ স্ট্রেচ চলেছে। তবে পাশের পাহাড়গুলোর ফিচার ক্ষণে ক্ষণে বদলাচ্ছে। এই এখুনি কমলা পাথরের ধূ ধূ পাহাড়, তো এই সবুজ তেকোণা গাছে মোড়া সুইজারল্যান্ড। কখনও আবার নিপাট চাষক্ষেতে চরে বেড়াচ্ছে গরু ঘোড়া ভেড়া… কোথাও আবার সবুজ বুগিয়ালে ম্যাজিকের মতো ভেসে বেড়াচ্ছে রোদ-ছায়া…

মার্ক আর তার গাড়ি

এক জার্মান কাপেলের সঙ্গে দেখা। দু’জনে দু’টো কেটিএম বাইক নিয়ে এসেছে। নিজেদের বাইক, জার্মানি থেকে উড়িয়ে এনেছে। তাই নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে কিরঘিজস্তান, তাজিকিস্তান, উজবেকিস্তান, রাশিয়া। বয়স ৫৪-৫৫। স্বপ্নের অভিযানে বেরিয়ে পড়েছে। ওঁদের ধুলো উড়িয়ে চলে যাওয়া দেখে ভাবি, এমনও জীবন হয়, এমনও স্বপ্ন হয়। এমনও হয় বেঁচে থাকা। এমন করেও ‘সংসার’ করে দু’টো প্রিয় মানুষ।

সং কুলে ওঠার শেষের দিকে, প্রাণান্তকর চড়াই। থেকে থেকে গরম হয়ে যাচ্ছে গাড়ির ইঞ্জিন। আর পথ ভর্তি অসংখ্য পাথর। বাইকের চাকা বসে যাচ্ছে প্রায়। ঠেলে তুলতে হচ্ছে। এক সময় আমি আর রূপা’দি নেমে গেলাম। ওই পথে ডাবল ক্যারি করে বাইক তোলা অসম্ভব। তাই আমরা হেঁটে হেঁটে এগোতে লাগলাম, প্রদীপ’দা আর বাদল’দা সাবধানে চালিয়ে আসতে লাগলো।

হাঁটতে হাঁটতে শব্দ পেয়ে দেখি, একটা গাড়ি চালিয়ে আসছে, একটা মেয়ে। সং কুলেই যাবে। লিফ্ট নিলাম আমি আর রূপা’দি। মেয়ের নাম মার্রা। সে-ও জার্মান। বয়স বড় জোর ২৭-২৮ হবে। একা বেরিয়ে পড়েছে, কিরঘিজস্তান ঘুরতে। এসে গাড়ি ভাড়া করেছে, রওনা দিয়েছে নিজের খুশিতে। গাড়িতে রাখা ছোট্ট টেন্ট, স্লিপিং ব্যাগ। যখন, যেখানে ইচ্ছে রাত্রিবাস। যা ইচ্ছে খাওয়া। যেমন ইচ্ছে যাওয়া।

কতটা সাহস, স্বপ্ন, স্ট্যামিনা থাকলে এভাবে একা বেরিয়ে পড়া যায়! ও পেশায় পেডিয়াট্রিক নার্স। সারা বছর কাজ করে, টাকা জমায়। তার পর এক বার সময় করে বেরিয়ে পড়ে এক একটা দেশ। চিন, পেরু, অস্ট্রিয়া হয়ে গেছে। কিরঘিজস্তান হলো। ভারতেও আসবে কোনও এক দিন। নম্বর দিয়ে এসেছি। ভারতে এলে আমায় সঙ্গে করে ঘুরতে বলেছি।

সং কুল আমরা যখন পৌঁছলাম, আচমকা মেঘ করে তুমুল ঠান্ডা নেমে এলো চার পাশে। এখানে মেঘ বড় অদ্ভুত। এমন ভাবে ঘনিয়ে আসে, দেখে মনে হয় এই বুঝি প্রলয় নেমে আসবে। এই বুঝি বড় কোনও ওলোট-পালোট হয়ে যাবে পাহাড় জুড়ে। কিন্তু কিছু পরেই সে মেঘের আড়াল সরিয়ে যখন সূর্য ওঠে, তখন মনে হয় মেঘ-শীত বলে কিছু ছিলোই না পৃথিবীতে…!

সং কুল

কালও তাই হলো। মেঘ আর হাওয়ার দাপটে অস্থির হয়ে, সং কুল পৌঁছেই কোনও রকমে হাতের সামনে একটা ইয়র্টে ঢুকে পড়লাম আমরা। তাড়াতাড়ি ফেদার চাপাতে হলো গায়ে। খিদে পেয়েছিলো খুব। খেতে চাইলাম, ‘বিশফেরমাক’ দিলো। নুডুলস আর মাংসর ঘ্যাঁট। তার খানিক পরেই ফের ঝকঝকে রোদ উঠে গেলো। আমরা তেপান্তরে ঘুরতে বেরোলাম দল বেঁধে। কিন্তু ওই যে বললাম, হেঁটে শেষ করা গেলো না সে বিশাল প্রান্তর। এই করেই আটটা বেজে গেল প্রায়, আর ঠিক তখন ‘সুর্য যখন অস্তে চলে ঢুলি, মেঘে মেঘে আকাশ কুসুম তুলি’…

অপূর্ব মায়াবি এক আলো উপহার পেলাম আমরা। সঙ্গে, পাহাড়ের ঢাল বেয়ে চুঁইয়ে পড়া এক চিলতে রামধনু। ফিরে এসে ডিনার। তখন সকলের খাওয়া হয়ে গেছে। আমরাই বাকি। সেরে নিলাম ঝটপট। জাঁকিয়ে ঠান্ডা পড়েছে, সূর্য ডোবার সঙ্গে সঙ্গে। কারেন্ট নেই, নেটওয়ার্কও নেই। আমাদের কোনও কাজও নেই। গুটিসুটি ঢুকে পড়লাম ইয়র্টের ভিতরে পেতে রাখা ম্যাট্রেস-রেজাইয়ের স্তূপের ভিতর।

তার পর… (চলবে)

ছবি: লেখক

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]