পৃথিবীর ছাদে

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

তিয়াষ মুখোপাধ্যায়

সাত.

সং কুলের মায়া কাটিয়ে বেরিয়ে পড়লাম সকালে। অসম্ভব ঠান্ডা। বাইকের সিটের ওপর স্নো জমে রয়েছে। অনেক বাবা-বাছা করে স্টার্ট করানো হল তাদের।

বিকেলে এক রকম বিস্ময় নিয়ে পৌঁছেছিলাম সং কুল। সকালের নরম আলোয় সে যেন আরও নেশাতুর। আবছা কুয়াশার সঙ্গে সূর্যের প্রথম রশ্মি মিশে সবুজ প্রান্তরে চরে বেড়ানো ঘোড়াদের পিঠ বেয়ে চুঁইয়ে পড়লে যে তা কতটা সুন্দর লাগে, তা ওই সকালেই জানলাম।

ওশ পৌঁছনোর আগে মুনের হোটেল…

মনের যে চোখ, সে চোখে যদি কোনও ভাবে যান্ত্রিক লেন্স বসিয়ে মুহূর্তগুলো ধরে রাখা যেত, তা হলে হয়তো কিছু বোঝানো যেতো।

রাস্তা এ দিন বেশ খারাপ। কখনও রুক্ষ পাহাড়ি পথ, কখনও আবার আচমকা সবুজের সঙ্গে মুখোমুখি ধাক্কা। আর এ সবের মধ্যে, অসংখ্য মাউন্টেন পাস। মানে এই উঠছি গাঁকগাঁক করে, আবার এই নামছি হুড়মুড়িয়ে। ছোট-বড় মিলিয়ে কত যে পাস ক্রস করতে হয়েছে, তার ইয়ত্তা নেই।

এ দিনের জার্নি শুরু করার ঘণ্টা খানেক পর থেকে নারিন নদী এসে চাকায় জড়িয়ে গেলো। প্রায় গোটা পথটাই নদী ঘেঁষে ঘেঁষে ছোটা। কখনও উঁচু, কখনও বা নিচু। জায়গাটাকে বলা হয় নারিন প্রভিন্স। পাহাড়ের কন্দর দিয়ে, একের পর এক পাস পেরিয়ে চলা।

দুপুরের দিকে এক সময়ে যেন একঘেয়ে লেগে গেলো। খানিক বিরক্তও। স্পিড উঠছে না মোটে। এভাবে চললে পৌঁছনোই দায়। একটা গ্রাম পড়লো ছোট। গ্রামে মণিহারি দোকান। দোকানদারি সামলাচ্ছেন মণিকা বৌদি। সসেজ, বিস্কুট, ফ্রুটজ্যুস কেনা হলো। বৌদি ভারী যত্ন করে প্যাক করে দিলেন। ততক্ষণে কালো-কালো জামা পরা চারটে বিদেশি লোক আসার খবর পেয়ে গ্রামের মানুষজন আসতে শুরু করে দিয়েছেন দুয়েক জন।

আমার ইচ্ছে করে, এ সব জায়গায় দু’দিন থেকে যেতে প্রাণ ভরে গল্প করতে, মানুষগুলোকে জানতে। এই জানতে চাওয়ার কারণটা কিন্তু কৌতূহল নয়। আমি তো জানিই। আমি জানি, এই মানুষগুলোর সুখ-দুঃখ-চাওয়া-পাওয়াগুলো আমার চেয়ে একটুও আলাদা নয়। হাসি-কান্না-ভালবাসার ছবিগুলো এক্কেবারে এক, এ কথা আমি জানি। আমি নিশ্চিত। আমার কেবল মেলাতে ইচ্ছে করে সেটা। মিলিয়ে নিতে ইচ্ছে করে, সীমান্ত কেবল কাগজের মানচিত্র ছাড়া আর কোথাও হয় না। এই মিলিয়ে নেওয়ার নেশাই হয়তো সারা জীবন তাড়িয়ে বেড়ায় ট্র্যাভেলরদের।

একচিলতে চড়ুইভাতি..

যদিও আমি ট্র্যাভেলরের ট-ও নই। এই এক্সপিডিশনে বেরিয়ে যে সব মানুষজনকে দেখছি পথে, তাদের পাশে আমাদের নিজেদের পাতি দীঘা-পুরি-দার্জিলিং বেড়ানো ট্যুরিস্ট মনে হচ্ছে জাস্ট।তারা কেউ এক বছর আগে ঘর থেকে বেরিয়েছে একটা সাইকেলে করে, কবে আবার ঘরে ফিরবে জানে না। কেউ বা মোটরবাইকেই সংসারপত্র বেঁধে নিয়েছে। আমরাই শুধু বছরে ২০ দিন ডানা মেলে ভাবছি আকাশটা কত বড়…!

দুপুর গড়িয়ে বিকেল, কাজারমান তখনও অনেক দূর। আর ভাল্লাগছে না, খুব ক্লান্ত। এমন সময় হঠাৎই পথের ধারে অদ্ভুত সুন্দর এক চিলতে সবুজ টুকরো পাওয়া গেল, ছায়ায় ঢাকা। পাশ দিয়ে কুলকুল করে বইছে শীর্ণতোয়া এক নদী। নদীর নীচে পাথর দেখা যায়। খানিক বসা হলো সেখানে। কফি বানিয়ে খাওয়া হবে বলে ঠিক করা হলো। নদীতে কাকস্নান সারা হলো। কফি বানাতে গিয়ে দেখি, লাইটার নেই। বাড়ি থেকে আনা যায়নি প্লেনে উঠতে দেবে না বলে, আর এসে কেনা হয়নি মনে ছিলো না বলে।

মনিকা বৌদির দোকান

পথচলতি অচেনা একটা গাড়ি থামিয়ে লাইটার চাইলাম। তিনি দিয়েই দিলেন লাইটারটা। আর ফেরত নিলেন না। আমরা কফি আর টুকটাক খাবার খেয়ে ফের চলতে লাগলাম। সন্ধ্যে হওয়ার মুখে ঢোকা গেলো কাজারমান। ছোট্ট এক পাহাড়ি শহর। অন্ধকার নামলেই শান্ত পাড়া।

সিবিটি (কমিউনিটি বেসড ট্যুরিজম) খুঁজে ওঠা হলো এক জনের বাড়িতে। খোলামেলা দিব্য এক জায়গা। তবে সং কুল থেকে নেমে এসে খুবই গরম লাগছিলো। পৌঁছে, স্নান করে, কাপড় কাচা হলো। একবার ওয়াশিং মেশিন ঘোরালে ১০০ সোম নেবে। তাই সই।

মৌবাগান…

রাতে খেয়ে দেয়ে ঘুম।

পরদিন কাজারমান থেকে ওশের রাস্তা। দীর্ঘ পথ। সবটা ভালো নয়। তবে অনেকটাই ভালো। শুরু করার কিছুক্ষণের মধ্যেই এক জায়গায় মৌমাছির চাষ চোখে পড়লো। সারি সারি রঙিন বাক্স বসানো। এই প্রথম নয় অবশ্য। কিরঘিজস্তানের পাহাড়ি এলাকায় আরও অনেক দেখেছি এই মৌ-চাষ। তবে এটা অনেক বড় ছিলো। নেমে আড্ডা জমানো হলো। সেই দুর্বোধ্য ভাষা। আমি তো আবার কিছু বুঝতে না পারলে বাংলায় চলে যাই…

চাকভাঙা মধু খেতে দিলো। ঘুরিয়ে দেখালো মৌমাছিদের সংসার। মধু কেমন করে বার করা হয় মৌচাক থেকে, সেটাও দেখালো। জানালো, মধু বার করে নেওয়ার পরে পড়ে থাকা প্যারাফিন এক এক কেজি ছ’ডলারে বিক্রি হয়। ইন্ডিয়া শুনেই খানিক ‘জিমি জিমি’ হলো আবার।

নারিন নদী…

এ দিনের রুটে অনেক সবুজ ছিলো। মাঝেমাঝে মনে হচ্ছিল, কাশ্মীর চলে এসেছি। ওশ পৌঁছনোর কিছুক্ষণ আগে লাঞ্চ সারা হলো রাস্তার ধারে। মেয়েটির নাম দেওয়া হল মুন। সে অনেক কাণ্ড করে অর্ডার নিয়ে চাট্টি খাবার হাজির করলো সামনে। আর এর পরে স্টার্ট দিতে গিয়েই দেখা গেলো, বাদলদার বাইকের ক্লাচের তারটি কেটে গিয়েছে প্রায়। সরু সুতোর মতো একটুখানি জুড়ে আছে, যে কোনও সময় যাবে।

কোনও রকমে ওশ পৌঁছে, সোজা গ্যারেজে। নেটে খুঁজে একটাই গ্যারেজ মিললো জোরো মোতো। ছোট্ট শহর ওশ। কোনও কিছুরই একাধিক অপশন নেই। কিন্তু সেই গ্যারেজ রোববার বন্ধ। এ দিকে বাইক আর চলছেই না। এই অবস্থায় গ্যারেজের আশপাশে থাকার জায়গা খুঁজতে গিয়ে নাজেহাল অবস্থা। শেষমেশ আড়াই কিলোমিটার দূরের একটা  ডরমেটরি মিললো। আর এই করতে করতে ফোন হারিয়ে ফেললো প্রদীপ’দা। পকেট থেকে পড়ে গেল। অসংখ্য ছবি, ডকুমেন্ট… সব গেলো। এ দিকে গাড়ির ওই অবস্থা। এই দিন যে কী টেনশন গিয়েছিলো আমাদের…!

কার্পেট…

রাতে যখন থিতু হওয়া গেলো, তখন সব খাবারের দোকান বন্ধ। একটা স্টোর থেকে পাঁউরুটি, বিস্কুট কেনা হলো টুকটাক। দেখি গুড় দিয়ে বানানো মুড়ির তক্তি বিক্রি হচ্ছে। বেজায় অবাক হয়ে কিনে ফেললাম। খেয়েও ফেললাম। শুয়েও পড়লাম।

তার পর…

(চলবে)

ছবি: লেখক

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]