পৃথিবীর ছাদে…

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

 

তিয়াষ মুখোপাধ্যায়

আট.

সকাল সকাল ঘুম ভাঙল এক রাশ দুশ্চিন্তা নিয়ে। বাইকটা কি ঠিক করতে পারা যাবে? গেলে কখন যাবে? আজকের দিনটাও কি নষ্ট হবে? ফোনটা কি আর পাওয়াই যাবে না?

এ সব কিছু মাথায় নিয়ে, কোনও রকমে রাতের বেঁচে যাওয়া টুকটাক খাবার দিয়ে ব্রেকফাস্ট সেরে বেরিয়ে পড়া হলো সবাই মিলে। রূপা‘দি গেলো থানায়। যদি কোনও ভাবে কিছু করা যায় ফোনটার। সঙ্গে গেলো বেকা, হোটেলের ছেলেটি। সকালে ডিউটি শেষ হলো ওর, নিজে থেকেই বললো সঙ্গে যাবে। ভালই হলো, ইংরেজি বোঝে।

আর আমরা বাকি তিন জন গেলাম গ্যারেজে। খারাপ বাইকটাকে দড়ি দিয়ে বেঁধে, এক রকম টেনে নিয়ে যাওয়া হলো পথে। সিগন্যালগুলোয় থামলেই সে এক কাণ্ড হচ্ছিলো। আর বাঁক নেওয়ার সময় প্রতিবার পড়তে পড়তে বাঁচা। কোনও রকমে গ্যারেজে ঢোকানো গেলো কাওয়াসাকি মহারাজকে।

মেকানিক ডেভিড খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে চেক করে একগাদা খুঁত বার করলো, ক্লাচের তার ছাড়াও। ঘণ্টা দুয়েক লাগবে বললো। ও দিকে রূপাদি জানালো, থানায় কমপ্লেন জমা নেবে কেবল রাশিয়ান বা কিরঘিজ ভাষায় লিখলেই। ইংরেজি চলবে না। বেকা ছিলো, লিখে দিতে পারতো, কিন্তু সেখানেও গেরো। কেউ যদি বকলমে লিখে দেয়, তবে তাকে সার্টিফায়েড অনুবাদক হতে হবে। ফলে, বেকা লিখলে চলবে না।

সার্টিফায়েড অনুবাদক আছেন ওশ ইউনিভার্সিটিতে। তিনি থানায় এসে এই কাজটি করেন প্রায়ই। কিন্তু ওশ ইউনিভার্সিটি গিয়ে জানা গেলো, আমাদের বিড়ম্বনা বাড়াতে তিনি ছুটিতে গিয়েছেন ঠিক এই সময়েই। এখন উপায় কিছুই নাই। বেকা ওর নিজের মতো কিছু চেষ্টা করবে বলে জানালো। ছোট শহর, ওর অনেক পরিচিত, যদি কোনও সুরাহা হয় আর কী।

শেষমেশ ফোনের আশা ত্যাগ দিলাম আমরা। প্রদীপ‘দা আবার আজ যা হারায়, কাল তা নিয়ে আফশোস করার পক্ষপাতী নয়। তা হলে নাকি কাল আরও যা কিছু পাওয়ার ছিল, তাতে কম পড়ে যেতে পারে।

সত্যিই তো, অতীত খুঁড়তে গিয়ে বা অতীতকে আঁকড়ে রাখতে গিয়ে বর্তমানকে অপচয় করার উদাহরণ কি আমরা কম দেখি আশপাশে?

হাতে তখনও ঘণ্টা দেড়েক সময় আমাদের। বাইক সারানো হতে ওরকমই লাগবে। আমরা ঠিক করলাম, একটু দেরি করে হলেও বেরিয়ে পড়বো আজই, যদ্দূর যাওয়া যায়। দিন নষ্ট করবো না আর। খুবই টাইট শিডিউল।

বাইক যতক্ষণে দেয়, তত ক্ষণে বেরিয়ে পড়লাম ওশ শহরের প্রান্তে বাবরের একটা স্মারক আছে, তাই দেখতে। বাবর এসে থেকেছিলেন ওশের একটা পাহাড়ের চুড়োয়। সেই নিয়েই স্মারক আর কী। এমনি কিছুই না, উঁচু থেকে শহরটা দেখা যায়। আর একটা মিউজিয়াম মতো আছে। সে দেখে আসা হলো সিঁড়ি ভেঙে ভেঙে।

নামার সময়ে প্রচণ্ড রোদে-গরমে ক্লান্ত। এদিকে এখানে তো সব জায়গায় জল পাওয়া যায় না। আগে বলিনি বোধ হয়, এখানে পানীয় জল পাওয়া মহা মুশকিল। এদের তেষ্টা মেটায় গরমে ফলের রস আর শীতে চা। ব্যস। জলটি এরা খায় না। কেউ যে খেতে পারে, তাও জানে না। জল চাইলে বড়জোর সোডা মেলে। জল আর মেলে না।

তো যাই হোক, পাহাড়ের একটা ছোট দোকানে জল বোঝাচ্ছি প্রাণপণ। তখনও আমার শেখা হয়নি, জল মানে সু। ওয়াটার বলে ইশারা করলে এক বার সোডা দেয়, এক বার কোল্ড ড্রিঙ্ক। প্রদীপদা রেগেমেগে বললো, গোমূত্র আছে?? ছেলেটি নির্বিকার মুখে লজেন্সের ডিব্বা খুললো। তার পর বলা হলো বাবরের মূত্র আছে?? তখন সে একটা স্থানীয় কোল্ড ড্রিঙ্ক বার করে দিলো। হার্বস দেওয়া আইস টি টাইপের কিছু একটা।

তাই সই। আর ধৈর্য্য নেই আমাদের। ওই দিয়েই তৃষ্ণা মেটানো হলো। আর তার পর থেকে গোটা প্রোগ্রামে যতো বার ওই পানীয় খাওয়া হলো, ততোবার সেটাকে ‘বাবর্স মূত্রা’ বলে ডাকা হলো। ইন ফ্যাক্ট এখনও হচ্ছে। রোজ রাস্তায় রোদ-গরমে হাঁপিয়ে গেলে আমাদের ভরসা ওই বাবর্স মূত্রা।

টম্ব থেকে নেমে এসে বাইক রেডি পাওয়া গেলো। সব কিছু সারিয়ে দিয়েছে ডেভিড, তুখোড় অটোমোবাইল এঞ্জিনিয়ার। মোটরবাইক ব্যাপারটা গুলে খাওয়া।

দেড়টায় বেরিয়ে পড়লাম। লাঞ্চ সারা হলো পথে।

এই দিন প্রথম পামির হাইওয়ে ধরলাম আমরা। এবং যাত্রাও শুরু করলাম, আসল পামিরের দিকে। রাস্তা অত্যন্ত সুন্দর। তেমনি চোখ ভরানো সৌন্দর্য। পাহাড়ের এত রকম বৈচিত্র্য, ভাবা যায় না। এমনিতে পামির মালভূমির কোর এরিয়া খুবই রুক্ষ। কিন্তু আশপাশটা অসম্ভব সবুজ। তীব্র কনট্রাস্টে বিস্ময় জাগে প্রায়ই।

বেরোতে অনেক দেরি হলেও, এক রকম শাপে বর হলো আমাদের। আগেই বলেছি, নাকি বলিনি, এখানে সূর্য অস্ত যায় রাত সাড়ে আটটা ন’টা। ফলে আমরা সারিমোগুল পৌঁছনোর আগে, পুরো বিকেলের আলোটা পেলাম। পাহাড়গুলোকে যেন সাজিয়ে দিলো সেই অনন্য আলোর রশ্মি, যে আলোয় শুধু কনে-কে নয়, সারা পৃথিবীকেই ‘কনে’র মতো সুন্দর দেখায়…

সারিমোগুল ঢোকার আগেই দেখা দিলো লেনিন পিক। পামিরের অন্যতম উচ্চ শৃঙ্গ। বিকেলের রাঙা আলোয় মোহময়ী রূপ তার। চোখের লেন্সে যা ধরা পড়লো, ক্যামেরার লেন্স তা ধরতে পারলো কই!

এখানে সুয্যিমামার আশ্চর্য এক চরিত্র। সারা দিন হাঁইহাঁই করে জ্বলেন তিনি। আর পাটে বসার সময়ে, আচমকা ঠান্ডা ঢেলে দেন পাহাড় চুড়োয়। সে ঠান্ডা গড়িয়ে গড়িয়ে নেমে, নিমেষে হাড় কাঁপিয়ে দেয় অন্ধকার হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে।

সারিমোগুলেও ব্যতিক্রম হলো না। আমরা পৌঁছলাম যখন, আটটা বাজে। মলিন আলো আর কড়া শীতের সমাহারে জমে উঠেছে মালভূমির সন্ধে। তিলেক গেস্ট হাউসে ঢুকে জবুথবু আশ্রয় ফেদারে। তার পর ডিনার, তার পর ঘুম। পরের দিন বর্ডার পেরিয়ে তাজিকিস্তান ঢোকা। মানে পামিরের কোরে প্রবেশ করা। এই উত্তেজনা নিয়েই যতটা ঘুম হয় আর কী…!

তার পর..

ছবি: লেখক

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]