পৃথিবীর ছাদে…

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

তিয়াষ মুখোপাধ্যায়

দশ.

এই দিন রাস্তা কম। কিন্তু সে রাস্তা খুবই খারাপ। ‘কত আর খারাপ হবে’, এই ভেবে বেরোতে একটু বেলাই হলো আমাদের। ক্লান্তিও ছিলো সকলেরই। কিন্তু তখনও জানতাম না, এই রাস্তা আদতেই কতটা খারাপ হতে পারে, যে ওইটুকু দূরত্ব পেরোতে আমাদের এতো ভুগতে হবে।

খুব গরম আর রোদ ছিলো সকাল থেকেই। ভীষণ টায়ারিং রাইড। অল্প চলেই থামতে হচ্ছিলো, জল/শরবত খাওয়ার জন্য। তার পর রাস্তায় দাঁড়ানো, কারও সঙ্গে কথা বলা– এ সব তো আছেই।

দুই বন্ধুর সঙ্গে দেখা। দু’জনে দু’টি মোপেড নিয়ে বেরিয়ে পড়েছে। আদ্যিকালের ৬ হর্সপাওয়ারের মোপেড। নেদারল্যান্ডস থেকে ওই নিয়ে বেরিয়ে, একগাদা দেশ ঘুরে ফেলেছে তারা গত ৩০-৪০ দিন ধরে। তাদের সঙ্গে একটু গল্প না করলে হয়?

তার পর বেলার দিকে একটা তুমুল সুন্দর জায়গা দেখা গেল। গাছ আর ঝর্না দিয়ে ঘেরা, খোলা আকাশের নীচে একটা খাওয়ার জায়গা। মিষ্টি মতো এক ছোট্ট ওয়েট্রেসের সঙ্গে ভাব জমলো সেখানে।

এই সব মিলিয়ে শুরুর দিকেই খানিক দেরি হয়ে গেলো।

তার পরে রাস্তা অসম্ভব খারাপ। ২০ থেকে বড় জোর ৩০, এর বেশি আর স্পিডই উঠছে না গাড়ির! খানিকটা অ্যাসফল্ট রাস্তা পেলেও, কয়েক মিটারেই শেষ।

এই দিনের গোটা পথটাই আফগানিস্তানের গা ঘেঁষে। মাঝে রয়েছে কেবল ‘আমু দরিয়া’ নদী। খোরোগ পর্যন্ত এই নদীর নামই গুন্ট নদী। খোরোগের পর থেকে নাম বদলেছে। পাঞ্জ। পামির নদীও বলা হয় একে। ‘আমু দরিয়া’ নামটা আফগান নাম।

নদীটা চওড়ায় কোথাও ১০ মিটার তো কোথাও ৫০ মিটার, আর স্রোতের বেগ তীব্র। জুলাই-অগাস্টেই এতো জল থাকে। শীতে কমে এবং জমে যায়। তো সেই নদীকে বাঁ হাতে রেখে আমাদের এ দিনের পথ চলা। নদীর ওপারেই চাষজমি, বাড়ি, রাস্তা, গাছ, মানুষ, ঘোড়া…. আফগানিস্তানের। ব্রিজও আছে নদীর ওপর। আর্মি বা চেকপোস্ট সে ভাবে চোখে পড়ে না।

বরং চোখে পড়ে, পামির হাইডেল প্রোজেক্টের বিদ্যুতের তার ওপারে পৌঁছে যাচ্ছে। এটা সম্ভবত ‘গর্ন বাদাখশান’-এর নিজস্ব চুক্তি।

এখনকার আফগানিস্তানের একটি প্রদেশ এবং তাজিকিস্তানের দক্ষিণ-পূর্ব অংশের প্রদেশগুলি নিয়ে এই গর্ন বাদাখশান নামের স্বায়ত্তশাসিত এলাকা গঠিত। এখানকার শাসন ও বিচার ব্যবস্থা এখনও বাকি রাষ্ট্রের কাঠামোর সঙ্গে খাপ খায় না। এটা বিচ্ছিন্ন এবং স্বতন্ত্র। আলাদা করে কখনও বাদাখশান এক্সপ্লোর করার সুযোগ পেলে, প্রচুর মণিমুক্তো মিলবে বলে বিশ্বাস আমার।

এক সময়ে, বিকেল বেলা, নদীর ওপারে কয়েকটা ছেলে-মেয়েকে ঘুরতে দেখে হাত-ফাত নাড়তে লাগলাম আমি বাইক থেকে নেমে। উত্তেজনায় ইচ্ছে করছিলো, ঝাঁপ দিয়ে সাঁতরে চলে যাই। আর এক সময়ে ওরাও দেখতে পেলো, এপার থেকে কালো জামা পরা কেউ একটা পাগলের মতো হাত নাড়ছে, তখন ওরাও হাত নাড়লো। সে কী আনন্দ আমার…! একটা মেয়ে আবার ইশারায় বলছে, সাঁতার কেটে চলে এসো…!!

কে ভেবেছিলো, তাজিকিস্তানের সীমান্তে দাঁড়িয়ে একটি ভারতীয় মেয়ে হাত নেড়ে কথা বলবে কোনও এক আফগান কন্যের সঙ্গে…!!

এই সব করে ফের চলা। তখনও বাকি আছে পথ। রাস্তা বেশ খারাপ। মানে খুবই খারাপ। সন্ধ্যে হলেও আলো আছে অবশ্য আকাশে। কিন্তু সে আর বেশিক্ষণ থাকলো না। ঝুপ করে নেমে এল অন্ধকার। নদীর ওপারে, আফগান ঘরবাড়িগুলোয় আলো জ্বলে উঠল একে একে। এ দিকে, এপারে আমরা তখনও চলছি। লোকালয়ে পৌঁছইনি। অন্ধকার, সুনসান, বন্ধুর, পাহাড়ি পথ।

এমন সময় আরও এক জটিল জিনিস আবিষ্কার করা গেলো। আমাদের বাইকগুলোর হেডলাইট হ্যান্ডেলে নয়, বডির সঙ্গে ফিট করা। ফলে পাহাড়ি বাঁকে হ্যান্ডেল ঘোরালেও, আলোটা ঘুরছে না সেই সঙ্গে। কী জ্বালা! এই অবস্থায় চালানো মানেই যেচে ঝুঁকি বাড়ানো।

আর খানিকটা চলার পরে, প্রায় রাত ন’টা হবে, আচমকাই একটা সাইনবোর্ড চোখে পড়লো। হোমস্টে আছে। রাস্তা থেকে বাঁ দিকে নেমে গেছে উঠোনের মতো। গাড়ির আলো দেখে, শব্দ শুনে একটি ছেলেও এগিয়ে এলো, রুম ঠিক করা হলো সঙ্গে সঙ্গে। কলাইখুম জনপদে পৌঁছনোর পাঁচ কিলোমিটার আগেই থেকে গেলাম।

আমাদের দেহাতি বাড়ির মতো একটা ব্যাপার। এক প্রান্তে খান কয়েক ঘর, ঘরের বাইরে টয়লেট। অনেকটা হেঁটে এসে বিশাল এক খোলা দাওয়া, তাতে খাট পাতা বড় বড়। সেখানেই খাওয়ার ব্যবস্থা। খাটগুলো তিন দিক ঘেরা এক-দেড় ফুট উঁচু করে। সেখানে তাকিয়া রাখা। মাথার ওপর ঝুপুড় হয়ে রয়েছে আপেল গাছ। হাত বাড়ালেই পেড়ে খাওয়া যায়।

খাব কী, তার আগেই চোখ জুড়িয়ে আসে ক্লান্তিতে, আরামে, হাওয়ায়। আফগান হাওয়া আমু দরিয়া পার করে এসে ছুঁয়ে দিচ্ছে আমাদের। বারবার। জলের-হাওয়ার পাসপোর্ট লাগে না এখনও, কী আশ্চর্য!

রাতে ঘুম হলো না। কী একটা অদৃশ্য পোকা অত্যাচার করতে লাগলো, এবং কোনও এক অজ্ঞাত কারণে আচমকাই পরিবেশ খুব গুমোট হয়ে গেলো। হাওয়া নেই। ঠান্ডাও নেই। আর পোকার কামড়। খুবই চাপ আর কী।

প্রায় জেগে জেগেই ভোর হয়ে গেলো। তার পর…(চলবে)

ছবি: লেখক

 

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]