পৃথিবীর ছাদে…

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

তিয়াষ মুখোপাধ্যয়

এক.

পৃথিবীর ছাদ কেমন হয়? কেমন করে হয়? ছাদ তো আমার বাড়ির মাথায় আছে, সিঁড়ি দিয়ে উঠতে হয়। পৃথিবীর ছাদে কোন সিঁড়ি দিয়ে ওঠে? কেমন করে পৃথিবীর মাথায় ছেয়ে থাকে সেই ছাদ? আমি তো পৃথিবীতে থাকি, মাথার ওপর আকাশ দেখতে পাই, ছাদ তো কই দেখতে পাই না…!

পৃথিবীর ছাদ পামির

আর কে কে এমন ভাবত আমি জানি না, আমি তো ভাবতাম। আমার কাছে ‘পৃথিবীর ছাদ’ শব্দবন্ধটা ঘিরে এতটাই কৌতূহল ছিলো। ছোটবেলার ভূগোল বইয়ের পাতায় জন্ম নেওয়া সেই কৌতূহল নিরসনও হয়েছিলো পরে। সব চেয়ে বড়, অনেকটা উঁচু পাহাড়, যার মাথাটা টেবিলের মতো চাঁচা, সমান, যাকে বলে মালভূমি…. সেইটাই হলো গিয়ে পামির।

ভারতের পরে পাকিস্তান, তার পর আফগানিস্তান, তার পর তাজাকিস্তান, তারও পর কিরঘিস্তান, তার পর কাজাকাস্তান। এই কাজাকাস্তান গিয়ে, ফের কিরঘিজস্তান থেকে শুরু এই ছাদ। কিরঘিজস্তানের সীমানা ছাড়িয়ে তাজিকিস্তানেও এর বিস্তৃতি। এ দিকে উজবেকিস্তানেও খানিকটা ছুঁয়ে আছে ছাদের কোণা…।

কৌতূহল আর অনুসন্ধানের শেষে হয়তো জন্ম নেয় স্বপ্ন। যে স্বপ্নকে তাড়া করাই আসলে জীবন। সত্যি বলতে, এ ছাদ ছোঁয়ার স্বপ্ন আমি কোনও দিনও তাড়া করিনি। স্বপ্ন দেখেছি, ভেবেছি, চেয়েছি… এই পর্যন্ত। পামির ছোঁয়ার স্বপ্ন তাড়া করিনি কখনও।

কিন্তু কে না জানে, রোজ বেঁচে নেওয়া অভ্যেস করতে জানলে, জীবনের এক একটা বাঁক আসলে সারপ্রাইজ ছাড়া আর কিছুই নয়। এই গোল পৃথিবীতে যেমন হারিয়ে ফেলা প্রিয় মানুষটাকে কোনও না কোনও এক দিন খুঁজে পেয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা অনন্ত, তেমনই কোনও সৎ, তীব্র ইচ্ছের পূরণ হওয়ার সম্ভাবনাও কখনও শেষ হয় না। কোনও এক অজ্ঞাত কারণে, আমার জীবনের ইচ্ছেরা তাদের পূরণের পথ বরাবরই খুঁজে পেয়েছে। কখনও সহজে, কখনও বা কঠিনে।

তাই এই ইচ্ছেটার পূরণের পথও খুলে গেল, খানিক চিচিং ফাঁকের মতো। পামিরের স্বপ্ন তাড়া করা একটা মানুষের সঙ্গে জুড়ে যাওয়ার সৌভাগ্য হলো। জুড়ে যাওয়ার পরেই ঝুলে পড়া… আর শেষমেশ অনেকটা দীর্ঘ ও কঠিন পথ পেরিয়ে আজ উড়ে যাওয়া।…প্রদীপ’দা এক জন মাউন্টেনিয়ার, এক জন এক্সপ্লোরার। এক জন ড্রিমারও বটে। প্রদীপ’দাও আরও অনেকের মতো স্বপ্ন তাড়া করে। প্রদীপ’দার স্বপ্ন, ছোটবেলায় পড়া সেই কবিতা, ‘দেখব এবার জগৎটাকে’।

লেক এবং ফুল

সেই জগতেরই প্রথম ধাপ পামির। সেই পামিরেরই সঙ্গী আমরা। আমি, রূপা’দি, বাদল’দা। আমরা চার জনেই এই প্রথম দেশের বাইরে চলেছি, একেবারে অচেনা, অজানা এক অভিযানে। ‘আনটাচড পামির অন হুইলস’। এই রুটে আর কোনও ভারতীয় বাইক এক্সপিডিশন করেছেন কি না, জানা নেই। সে না থাক। এটা জানা আছে, যে আমাদের সকলের ছোটবেলার ফ্যাসিনেটিং স্বপ্নেরা সত্যি হতে শুরু করছে এই অভিযানের হাত ধরে।

পামির শব্দের অর্থ, ‘সূর্যের পা’।
এই সূর্যের পা ছুঁতে যাওয়ার এক অপূর্ব মুহূর্তের মুখে দাঁড়িয়ে, ফ্লাইটে বসে বড় করে শ্বাসটা ছাড়ার আগে এক বার ঘুরে দেখছি শেষ এর কয়েকটা মাস। আজ এই অভিযান দেখতে যতটা গ্ল্যামারাস, যতটা গর্জিয়াস, এর পেছনের পথটা ততোটাই ক্ষতবিক্ষত। শুধু আমরা ক’জনই জানি, ঠিক কত কত বাঁধা এসেছে, আর তাদের কত কত রকম ভাবে লড়তে হয়েছে প্রতিটা মুহূর্তে। কত টেনশন, কত ভয়, কত হতাশা, কত প্রতীক্ষার শেষে আজকের দিনটা এসেছে। যদিও এই ঝড়ের বেশিটাই সামাল দিয়েছে প্রদীপ’দাই, তবু, আমরা সকলেই যেন দাঁতে দাঁত চেপে, দম বন্ধ করে অপেক্ষা করছিলাম।

আজ মুক্ত করলাম সমস্ত টেনশনটুকু। এই ফ্লাইট দিল্লি থেকে আমাদের নিয়ে যাচ্ছে আলমাতি, কাজাকাস্তানের রাজধানী। সেখান থেকে আবার ভোরের ফ্লাইটে পৌঁছবো কিরঘিজস্তানের রাজধানী বিশকেক। সেখান থেকে বাইক হাতে পাব, অভিযান শুরু হবে পামিরের পায়ে পায়ে…।

আগামী কুড়ি দিন মতো ফোনে পাওয়া যাবে না আমাদের। তবে নেট কানেকশন থাকবে, খুব দরকারে যোগাযোগ করা হয়তো অসম্ভব হবে না। তা ছাড়া টেলিপ্যাথি তো আছেই।

ভাল থাকবেন সকলে, শুভেচ্ছা রাখবেন আমাদের জন্য। আর অবশ্যই স্বপ্ন দেখবেন। ডানা ঠিক খুলবে…(চলবে)

ছবি: গুগল ও লেখকের ফেইসবুক থেকে

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]