পৃথিবীর ছাদ

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

তিয়াষ মুখোপাধ্যায়

নয়.

হাড়কাঁপানো ঠান্ডা। লেপের তলায় ঘুমভাঙা আহ্লাদে ঝপাং করে শীতের ঝাপটা লাগল ঘর থেকে বেরোতেই। উঠেই প্রতিদিনের মতো রেডি হওয়া, যেটা সব চেয়ে অসহ্য কাজ।

আগের রাতেই অতি কষ্টে বুঝিয়ে রেখেছিলাম, সকালে ডিম-পাঁউরুটি-সসেজ কিছুতেই খাব না, স্যুপ খাব। অতি কষ্টে মানে, সত্যিই অতি কষ্টে। যদিও আমাদের কষ্ট সফল করার জন্য পাড়া থেকে একটি ইংরেজি বুঝতে পারা কিশোরী খুঁজে আনা হয়েছিলো।

মুরঘেব খুব ছোট্ট শহর। মানে শহর বলে আর কী, আমাদের শহরের সংজ্ঞার তুলনায় এ নিতান্তই ক’টি বাড়িঘর ছাড়া কিছু নয়। এই মুরঘেবই আসল ‘পামির নট’। কিন্তু ওই যে, আগেই বললাম, সবটাই এত বিশাল যে পড়া ও জানা জিনিসগুলো চোখের সামনে ছবির মতো দেখা যায় না মোটেই।

আগের দিন মুরঘেব ঢুকতে অন্ধকার হয়ে গিয়েছিলো। ভাল করে কিছু বোঝা যায়নি। সকালে দু’চোখ ভরে দেখলাম, চতুর্দিকে পাহাড়ে ঘেরা এক টুকরো গালিচার মতো উজ্জ্বল এক ‘শহর’।

যাই হোক, ব্রেকফাস্টে স্যুপ এলো। কিন্তু তাতে এত বাঁধাকপি, যে একটু জিরে-আদা বেটে দিলেই দিব্যি বাঁধাকপির তরকারি হয়ে যেত। খেয়েদেয়ে বেরোনো হলো। তেল ভরা হলো। মেশিন নেই, ড্রাম থেকে প্লাস্টিকের বোতলে করে তুলে ট্যাঙ্কে ভরা।

 শনশন হাওয়া আর কনকন ঠান্ডায় চললাম এগিয়ে। রাস্তা খুব খারাপ নয়। আর ঠান্ডায় এমনি একটু জবুথবু লাগলেও, রাইডিংয়ের জন্য তা রোদের থেকে বেটার অপশন। ক্লান্তি অনেক কম হয়।

পথের দু’পাশে ধূ ধূ প্রান্তর পেরিয়ে পাহাড়ের প্রহরা। মাঝে মাঝে ছোট ছোট অ্যালপাইন লেকে এসে জমেছে পৃথিবীর সমস্ত নীল রং। কখনও কখনও বেঁটে বেঁটে সাদা বাড়ি। ঝকঝকে আকাশে ফ্যাটফ্যাট করে ভাসছে ক্যান্ডিফ্লস মেঘ। এ সবের মধ্যে দিয়ে নিজের মতো বয়ে গেছে পামির হাইওয়ে। পামিরস্কায়া। স্কায়া মানে সড়ক।

সেই স্বপ্নের সড়কে ছুটছি আমরা। এ পথ আসলে ছুটে পেরোনোর নয়। এ পথ হেঁটে, গড়িয়ে, থেমে পার করার পথ। এমন এক দিকে তাকিয়ে অন্য দিকের সৌন্দর্য মিস করে ফেলার মতো দুর্ভাগ্য আর কী হয়! কিন্তু টাকা, সময় আর স্বপ্নের মেলবন্ধন ঘটাতে গেলে, এ ছাড়া আর উপায় কই!

খানিক পরে এক জায়গায় থামা হলো। নদীর পাশে, সবুজ মাঠ। পথের ধারে অনেক লরি দাঁড়িয়ে সেখানে। পাশেই একটা বেঁটে বাড়িতে চায়ের দোকান। বোঝা গেলো, লরিচালকেরা সেখানেই ব্রেক নেন। ঢুকে পড়লাম আমরাও। ছোট ছোট টেবিল ঘিরে মাটিতে বসে সকলে, আর পাতে রাখা… মাছভাজা…!!

এতদিন ধরে শুধু পাঁউরুটি-ডিম-সসেজ-মিট খাওয়া মুখের সামনে গরম গরম এবং কুড়কুড়ে ট্রাউট মাছ ভাজা! এর পরে কী হলো, সেটা বলাই বাহুল্য। সেই সঙ্গে দুর্বোধ্য ভাষায় আড্ডাও হলো লরিচালকদের সঙ্গে। তাঁরা খুবই উত্তেজিত হয়ে নানা প্রশ্ন করছেন, আমি নির্বিকার বাংলায় উত্তর দিয়ে যাচ্ছি। এই করে একটা নেমন্তন্নও জুটিয়ে ফেললাম দুশনবে-তে, মানে তাজিকিস্তানের রাজধানীতে। আর দু’দিন পরে সেখানে পৌঁছনোর কথা আমাদের। কিন্তু সে নেমন্তন্ন অবশ্য রক্ষা করা যায়নি, বিশেষ এবং বাজে একটা কারণে।

আড্ডা-খাওয়া সেরে ফের চলা, ফের থামা। একগাদা কচিকাঁচা খেলছে গ্রামের ধারে, রাস্তায়। এখানে তো থামতেই হয়। অবাক বিস্ময়ে আমাদের দেখে-টেখে কে এক জন ছুটে গিয়ে খবর দিলো পাশেরই একটা বাড়িতে। দু’-চার জন বেরিয়ে এসে ডাকাডাকি করতে লাগলেন আমাদের। চা খাওয়ার ডাক।

বাড়িভর্তি লোকজন, গোটা একটা যৌথ পরিবারের বাস। চৌকিতে বসিয়ে, দস্তরিখানা (যে কাপড় পেতে তার ওপর খেতে দেওয়া হয়) পেতে চা, কফি, পাঁউরুটি, দই, মাখন, লজেন্স… এ সব চলে এলো…। আমরা এ সব খাওয়ার আগে একটু জল খেতে চাই, সে আর বোঝাতে পারি না।

একটি মেয়ে বেরিয়ে এলো, সে কলেজে পড়ছে দুশনবে-তে। ইংরেজি বোঝে। জল এনে দিলো। সে পড়াশোনা শেষ করে, পুলিশ হতে চায়। তার চেহারায় ও হাবেভাবে ভবিষ্যতের পুলিশের স্পষ্ট ছাপ থাকলেও, অমন ভুবনভোলানো হাসি নিয়ে যে সে কী করবে, তা আমি ভেবে পাচ্ছি না।

মনে মনে প্রাণভরা শুভেচ্ছা জানিয়ে এলাম রুগিয়া-কে। প্রত্যন্ত পামিরের, এক চিলতে গ্রামের, রক্ষণশীল মুসলিম পরিবারের মেয়ে হয়ে যে দেশের প্রশাসন সামলানোর স্বপ্ন পোষে, তাকে আর কী-ই বা দেওয়ার আছে, আমাদের মতো এক দিনের অতিথিদের!

আমরা আধ ঘণ্টা মতো বসে, তার পর বেরিয়ে এলাম। কী মায়া…! রুগেয়ার কাকিমাকে জড়িয়ে ধরল রূপা‘দি। তাই দেখে ফ্যাঁচফ্যাঁচ করে একটু কেঁদে নিলো আমাদের এক হিরো।

যাই হোক, আমাদের গোটা প্রোগ্রামে ওই আধ ঘণ্টা হয়তো শুধুই একটা অংশ, একটা স্মৃতির টুকরো, কিন্তু আমি নিশ্চিত, রুগেয়াদের বাড়িতে আরও বহু দিন ধরে আলোচিত হবো আমরা। রুগেয়া হয়তো কলেজে গিয়ে গল্প করবে, ‘জানিস! ইন্ডিয়া থেকে চার জন এসেছিলো আমাদের বাড়ি!’ রুগেয়ার মা হয়তো হেসে হেসে পড়শিদের বলবেন, ‘কেমন কালো কালো সব জামা পরা, খালি জল খেতে চায়!’ রুগিয়ার ছোট ভাই হয়তো বহু দিন জমিয়ে রাখবে ইন্ডিয়ান চকলেটের মোড়ক…
আরও হয়তো কত কী…

পথ পথের মতো এগিয়ে যায়। মুহূর্তরা মুহূর্তের মতো বয়ে যায়। তার মাঝেই আমরা একটু একটু করে জমাই এ সব নুড়ি-বালি। স্বচ্ছ নুড়ি চোখের তারায় তুলে ধরে দেখি দুনিয়ার অন্য প্রান্ত। হাসি-কান্না-কষ্ট-প্রেম… সব যেন একটা আয়নার সামনে দাঁড়ায়। আমার মতোই সব। একই। অবিকল। অবিচল।

খোরোগ পৌঁছনোর আগের পথটুকু বড্ড সুন্দর। সবুজ। একটা নদীও পড়ে শহর ঢোকার আগে। বিকেলের মুখে মুখে খোরোগ পৌঁছলাম। বড্ড গরম। পৌঁছে কিছুতেই আর হোটেলের খোঁজ পাই না… শেষে এক ইংরেজি জানা মহিলা এসে উদ্ধার করলেন। পথ দেখালেন। তবে ওঁর বলে দেওয়া হোটেলে পৌঁছনোর আগেই চোখে পড়লো অন্য একটা হোটেল, যার নাম ‘দিল্লি দরবার’!

দিল্লির বড় হোটেল দিল্লি দরবার, তাদেরই চেন রয়েছে খোরোগে! ম্যানেজার লখনৌয়ের মানুষ। তাঁকে পটিয়েপাটিয়ে একটু সস্তায় ব্যবস্থা করে ঢুকে পড়া গেলো। তার পরে আর এক অভিযান, খাবারের সন্ধান। কারণ দিল্লি দরবারের খাবারের বেশ দাম, আর ওই দিন ওদের একটা পার্টি-জনিত ব্যস্ততাও ছিলো।

বাইরের ছোট্ট একটা রেস্তোরাঁয় টুকটাক তাজিক খাবার খেয়ে এসে, শুয়ে পড়া হলো। তখনও বাইরে আলো মরেনি। কিন্তু ক্লান্তিতে আমরা মৃতপ্রায়।

তার পর..

ছবি: লেখক

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]