পৃথিবীর পথে হাঁটতে বেরিয়েছিলাম সেই দিন আমি

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

শিল্পী কনকনকচাঁপা কচাঁপা এবার গানের পাশাপাশি প্রাণের বাংলার পাতায় নিয়মিত লিখছেন তার জীবনের কথা। কাটাঘুড়ির মতো কিছুটা আনমনা সেসব কথা, হয়তো কিছুটা অভিমানিও। কিছুটা রৌদ্রের মতো, খানিকটা উজ্জ্বল হাসির মতো।

এর আগে বিদেশ যাত্রা বলতে কোলকাতা গিয়েছি গান রেকর্ড করতে আর লন্ডন গেছি নিজেরা টিকিট কেটে।গান রেকর্ড করতে যাওয়া এক রকম আত্মতুষ্টি। ভালো মানের গান সঞ্চয় হওয়া একজন

ছেলে মাশুকের সঙ্গে

শিল্পীর জন্য খুবই আনন্দের ব্যাপার। কিন্তু লন্ডন গেলাম নিজের আয় করা পয়সা দিয়ে টিকিট কেটে। অনেকগুলো টাকার টিকিট কেটে গিয়েছি।থাকার জায়গা ঠিক করা ছিলো কিন্তু কোন অনুষ্ঠান হবে কিনা আগে থেকে কোন নিশ্চয়তা ছিলো না, বরঞ্চ ছিলো সব মিলিয়ে দারুণ এক উৎকন্ঠা। পুরো ট্যুর শেষে তারপর নিশ্চিন্ত হতে পেরেছি। কিন্তু এবার কোনরকম যোগাযোগ, অংক কষা ছাড়াই আমাকে গাইতে ডেকেছেন আমেরিকার লস এঞ্জেলস এর বাংলাদেশ এসোসিয়েশন এর বাংলাদেশের প্রবাসী ভাইয়েরা। তাও আবার আমার গার্জিয়ান সহ।অভিশাপের বর আমাদের কাঁধ থেকে নেমে উত্তরায়ণ এর পথে ধায়,আমি আর আমার জীবনসঙ্গী চেয়ে চেয়ে দেখি।সে যে কি আত্মতৃপ্তির ব্যাপার বলে বোঝাতে পারবো না।

মেয়ে ফারিয়ার সঙ্গে

খুব সাবধানে সব কাগজ পত্র গুছিয়ে নিয়ে ভালো কাপড় পড়ে রওনা হলাম আমেরিকান দূতাবাসের উদ্দেশ্যে।বুক দুরুদুরু, সুরা পড়ছি তো পড়ছিই।অপেক্ষমাণ অ্যাপ্লিকেন্টরা কেউ ভিসার ইন্টারভিউ এর বুথ থেকে হেসে বের হচ্ছে তাদের দেখে মনে হচ্ছে পৃথিবীর সব সুখ আমেরিকান ভিসা পাওয়াতে।আর যে মুখ বেজার করে বেরুচ্ছে তার জন্য দুঃখ হতেই নিজের কথা মনে হয়ে দম আটকে আসছিলো। সবার অবস্থা দেখে মনে হচ্ছিল এ যেন হাশরের ময়দান! যাইহোক, খুব সহজেই ইন্টারভিউ দিলাম। জানলাম অমুক তারিখে পাসপোর্ট কালেক্ট করতে হবে মানে ভিসা দিচ্ছে। এটা সত্যি যে নিজেকে এতো ভাগ্যবান খুব কমই মনে হয়েছে।

 টিকিট এসে গেলো। দুইচারটা শাড়ি জামা কিনলাম। স্যুটকেস ও সংসার গোছালাম। দু’টো বাচ্চা, তারা আর শিশু নেই।তারা বোঝে বাবা-মায়ের অনুপস্থিতি। আমেরিকা যাওয়ার আনন্দ, পেশাদার ভাবে বিদেশে কাজ করতে যাওয়ার আনন্দ, আবার সন্তানদের রেখে যাওয়ার কষ্ট সব মিলিয়ে বিচিত্র রকম অনুভব আমার প্রকাশ করার ভাষা নেই।

কত দিনের এন্ট্রি পাবো তাও যেমন জানিনা তেমনই প্রধান অনুষ্ঠান ছাড়া আরও কতগুলো অনুষ্ঠান করতে হবে তাও জানিনা।সব মিলিয়ে কেমন যেন পুরো পৃথিবীই দুলে উঠছিলো।ফারিয়া তার কি কি বায়না সেগুলো লিখতে  লিষ্ট করতে করতেই ব্যাস্ত কিন্তু মাশুক? মাশুকের কোনো অভিযোগ কোনো মন খারাপ কিছুই বোঝা যায়না। সেখানেই আমার যত কষ্ট। যখনি বুঝাই আব্বু, কাজে যাই, কাজ শেষেই চলে আসবো, এ একটুও মন খারাপ করেনা।তাতেই আমার বেশী কান্না পায়।বাবা মা শ্বশুর শ্বাশুড়ি দেবর, বিশ্বস্ত কাজের লোক সবাই আছেন কিন্তু কি যে ভয়ংকর কষ্ট এইসব বাচ্চাকাচ্চা ছেড়ে দূরে যাওয়া! আর সবাই এমন করছেন বিশেষ করে আব্বা, যেন আমরা জাহাজে করে তিনমাসের যাত্রা করছি! একটা কাগজে যাত্রা কালীন পড়ার জন্য বিশেষ সুরা লিখে দিলেন আব্বা। আমি সবাইকে বললাম আমাকে সবাই চিঠি লিখে আমার হাতে দাও, বিমানে পড়বো।

আম্মা কদবেল ভর্তা জলপাই ভর্তা করে ছোট বাটিতে হাতব্যাগে দিয়ে দিলেন। আব্বার হুকুমে অজু করে দু’রাকাত নামাজ পড়ে যাত্রা শুরু করবো হঠাৎ দেখি মাশুক নাই।সবাই বিদায় জানাচ্ছে ছেলেটা গেলো কই? খুঁজে খুঁজে শেষে দেখি বাথরুমে কাঁদছে! আমার দেবশিশু! আমার ধৈর্যবান ছেলে এমন করে কাঁদছে! যাকে কিনা চড় মারলেও কখনো কাঁদে না (এই কাজ আমি কখনও করিনি বা চড় মারতে চাইলেও তা কখনও পরিপূর্ণ চড়ের মতো হয়ে ওঠেনি। চড়-থাপ্পড় যা মারার তা তাদের বাবাই মেরেছেন) সেই বাচ্চাটা আমার এমন অঝোরে কাঁদছে! আমার পুরো দুনিয়া দুলতে লাগলো। আল্লাহ, তুমি আমাকে কি পরীক্ষায় ফেললে আল্লাহ! এই সন্তানকে ফেলে আমি কি করে যাই!

ছবি: লেখকের ফেইসবুক থেকে

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]