পৃথিবী জেগে আছে

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

সালাহ্ উদ্দিন শৈবাল

(কানাডা থেকে): বাংলাদেশে এই সময় রাতের আকাশ থাকে পরিষ্কার। খোলা মাঠে ঘাসের উপর শুয়ে পড়া যায়। মাথার নিচে হাত দিয়ে মাথাটা একটু উঁচু করে বিশাল আকাশ দেখা যায়। আকাশে নক্ষত্র থাকে। একটা-দুটা না। শত শত। হাজার হাজার। টিপ টিপ করে জ্বলে। এই সব তারাদের নাম আছে। বাংলা নামগুলো অদ্ভুত সুন্দর।

কিছু মানুষ তারা দেখে। সৌন্দর্য দেখে। কিন্তু কিছু মানুষ অসীম কৌতুহল নিয়ে ভাবতে থাকে। কি আছে…কি আছে ঐ দূরে দূরে…আরো দূরে…তারা ছাড়িয়ে…ছায়াপথ ছাড়িয়ে। আরো গ্রহ কি আছে…লোকালয় আছে…প্রান আছে? জীবন আছে?

১৯৭৭ সালে ভয়েজার যখন মহাকাশে রওনা দিলো…সেই রকেটে..অনেক কিছুর সঙ্গে দুইটা ফোনোগ্রাফ রেকর্ড দিয়ে দেওয়া হয়েছিলো। তার নাম দেয়া হয়েছিলো “Sounds of Earth”। সোনার তৈরী সেই ডিস্ক। তাতে রেকর্ড করে দেয়া হয়েছিলো পৃথিবী সেরা সব গান। বাতাস, বৃষ্টি, ঝড়ের শব্দ। পাখির আওয়াজ। ট্রেনের শব্দ। অংক, বিজ্ঞানের সুত্র। মানুষের অনেকগুলো ছবি। আর সঙ্গে ছিলো পৃথিবীর ৫৫ টি ভাষায় বলা শুভেচ্ছা বার্তা!

কোন কিছু ঠিক করে দেয়া হয়নি। প্রত্যেক ভাষার মানুষকে শুধু বলা হয়েছিলো দশ সেকেন্ডে এলিয়েনদের উদ্দেশে পৃথিবীর মানুষ হিসাবে কিছু বলতে। লক্ষ্য একটাই যদি অন্য জগতের অন্য কোন বুদ্ধিমান প্রানী এটা খুঁজে পায় যেন জানতে পারে…আমরা আছি। পৃথিবী আছে। আমরা তাদের শুভেচ্ছা জানাচ্ছি।

ভাবছেন বাংলা ছিলো কিনা? হ্যাঁ ছিলো। কোন এক বাঙালী ভাইয়ের কন্ঠে বাংলায় বলা ইতিহাসে প্রথম শুভেচ্ছা বার্তা অন্য গ্রহের প্রানীদের জন্য..”নমস্কার, বিশ্বে শান্তি হোক।“

সেই বার্তা কেউ পেয়েছিলো কিনা আমরা জানি না।
কিন্তু সাহসী মানুষেরা কোন কালেই সেই আশায় ঘরে বসে থাকেনি।

পৃথিবী এগিয়েছে এই সব মানুষদের হাত ধরেই। প্রথম মানুষ যে পায়ে হেঁটে নিজের গ্রাম ছেড়ে বেরিয়ে গেলো। দুনিয়া দেখতে। প্রথম মানুষ যে নৌকা বানিয়ে পাড়ি দিলো নদী…সাগর। প্রথম মানুষ যে অচেনা…অজানা…ভয়ংকর মহাকাশে রওনা দিলো। ফিরতে পারবে কিনা তা না ভেবেই।

পৃথিবী এগিয়েছে এইসব মানুষদের হাত ধরেই।

কতোজন মানুষ আর মহাকাশ ভ্রমন করতে পেরেছে? সেই ১৯৬১ সাল থেকে ৫০০ থেকে ৬০০ জন হবে। এরা সবাই দেখেছে কি করে তার চির চেনা পৃথিবী পেছনে আস্তে আস্তে ছোটো হয়ে যাচ্ছে। দূরে চলে যাচ্ছে। যেখানে তার জন্ম। পরিবার..বন্ধু..ভালোবাসা। ফেরা কি আর হবে?

মাত্র জনা পচিশেক এতো দূরে চলে গেছে যে পৃথিবীকে এক সময় হাত ঘড়ির সমান মনে হয়েছে। আর…

মাত্র জনা ছয়েক এতো দূরে…এতো দূরে চলে গেছে…পৃথিবী থেকে..চাঁদ থেকে এতো দূরে যে পৃথিবী বা চাঁদ আর দেখাই যায় নি। পুরাপুরি একা..বিশাল গভীর তারায় তারায় ভরা অসীম মহাশূন্যে।

( বিল এন্ডার্সের তোলা ছবি ‘Earthrise’।)

১৯৬৪ সালের ডিসেম্বর মাসে নাসা বিজ্ঞানী বিল এন্ডার্স চাঁদের চারিদিকে ঘুরতে ঘুরতে তুলে ফেলেন পৃথিবী শিহরন জাগানো ছবি Earthrise। বিশাল অন্ধকার গহ্বরে মায়াবী নীল পৃথিবী ঝুলে আছে!

পাহাড়-পর্বত…নদী-সাগর…দালান-প্রাচীর-পিরামিড সব…সব মিলিয়ে এক আর অবিচ্ছিন্ন এক গোলক। সব কিছু কতো বেশি এক সংগে…সব কিছু কতো বেশি একাকার। বিল বলেছিলেন…তার মনে হয়েছিলো…যেন বাড়ীতে সাজানো ক্রিসমাস গাছে ঝুলে আছে একটা ছোট্ট নীল রংয়ের ভঙ্গুর বল। ঝুলে আছে…যেন যে কোন সময় খুলে পড়তে পারে। ভেঙ্গে যেতে পারে।

আরেক এ্যাস্ট্রোনট মাইক ম্যাসিমিনো বলেছেন, “I thought at one point, if you could be up in heaven, this is how you would see the planet. And then I dwelled on that and said, no, it’s more beautiful than that. This is what heaven must look like. I think of our planet as a paradise. We are very lucky to be here.”

যাদের সৌভাগ্য হয়েছে পৃথিবীর এই রূপ দেখার..তারা সবাই এক বাক্যে স্বীকার করেছেন….কতো সুন্দর..কিন্তু কতো নশ্বর আমাদের এই পৃথিবী! আর তারচেয়েও বেশি…কতো ক্ষুদ্র আর যৎকিঞ্চিৎ আমাদের উপস্থিতি!

তাদের মনে হয়েছে আমাদের এ্‌ই পৃথিবীতে…সব কিছু মিলে-মিশে একাকার হয়ে আছে। যদি টিকে থাকতে হয় তবে সবাই মিলে এক সঙ্গেই টিকে থাকতে হবে। আমেরিকান এ্যাস্ট্রোনট ক্যারেন দূর মহাকাশ থেকে পৃথিবী দেখে এসে তার অনুভুতির কথা বলেছেন, “If I could get every Earthling to do one circle of the Earth, I think things would run a little differently.” (আমি যদি পৃথিবীর প্রতিটি মানুষকে এই পৃথিবীর চারিদিকে একবার ঘুরে দেখাতে পারতাম, তবে পৃথিবীটা হয়তো একটু ভিন্নভাবে চলতো।)

বাকিদের কি হয় আমি জানি না। আমার এইসব ইতিহাস পড়তে পড়তে…মানুষের এইসব বীরত্ব গাঁথা জানতে জানতে মনে হয়….কতো কিঞ্চিৎ লাভ-লোকসান নিয়েই না আমার দিন কাটে। কতো নগন্য হিংসা নিয়ে…রাগ নিয়ে…ক্ষোভ নিয়েই না আমার জীবন ঘুরতে থাকে।

মনে হয় চেষ্টা করলে আরেকটু জীবনটাকে সাঁজানো যায়। ক্ষুদ্রতা ফেলে…নগন্য ফেলে…এমন কিছু…যা কিছু নতুন..যা কিছু কল্যানকর…যা কিছু একটু হলেও এগিয়ে দেবে আমাদের এই বেঁচে থাকা।

……..আমাদের এই ভালো থাকা।

ছবি: আনসার উদ্দিন খান পাঠান

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]