পৃথিবী বিখ্যাত পোস্টার যত

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

দেয়ালের আশ্চর্য ভাষা পোস্টার। যুদ্ধের করুণ ভাষা, বিপ্লবের আগুন, রাজনীতির ঝড়, যৌনতার জ্বর, বিপণনের সাত সতেরো-কতকিছু প্রকাশিত এই পোস্টারে! দেযালে, দরজায় সেঁটে দেয়া একখন্ড কাগজ গভীর অর্থ বহন করে; করে আসছে বহুকাল ধরে। পোস্টার আত্মপ্রকাশের পুরনো ভাষা। ইতিহাস নিয়ে যাদের কারবার তারা বলছেন, পোস্টার প্রায় দু‘শো বছর ধরে মানুষের নানা ভাবনা, প্রয়োজন আর আহ্বানকে জানান দিতে প্রকাশিত হচ্ছে।

পৃথিবী বিখ্যাত হয়েছে বহু পোস্টার। কখনো একটি যুগ, মানুষের চেতনা, হুজুগ, বাসনাকে প্রকাশিত করে আলোড়ন তুলেছে সেই পোস্টারগুলো।কখনো কখনো জনসাধারণের রুচিও উঠে এসেছে পোস্টারের ভেতর দিয়ে।নিউইয়র্কে এ বছরের জুন মাসে নানান সময়ে বিশিষ্ট হয়ে ওঠা পোস্টারগুলো প্রদর্শনীর জন্য দরজা খোলা হলো পোস্টার মিউজিয়ামের। পৃথিবী বিখ্যাত সব পোস্টার সেখানে প্রদর্শিত হবে। প্রায় ১৫০০ বর্গফুট মাপের এই জাদুঘরটিতে প্রদর্শিত হবে ৭০০০ হাজার ঐতিহাসিক পোস্টার।

এবার প্রাণের বাংলার প্রচ্ছদ আয়োজনে রইলো পুরনো পোস্টার নিয়ে ‘দেয়ালের ভাষা’।

বাংলাদেশে একটা সময়ে জনপ্রিয়তা পেয়েছিলো সিনেমার পোস্টার।দেশের অনেক খ্যাত এবং অখ্যাত শিল্পী শিল্প নির্দেশনা দিয়ে সেই পোস্টারগুলোকে আলোচনায় নিয়ে এসেছিলেন।সময়টা ছিলো সত্তর এবং আশির দশক। কিন্তু এরও বহু আগে ১৮৯১ সালে ফ্রান্সের অমর চিত্রশিল্পী ত্যুলুস লোত্রেক তখনকার বিখ্যাত ক্যান-ক্যান নাচের আসর বসা মলি দ্য রু-এর পোস্টার এঁকে পোস্টার আঁকার বিষয়টাকে ভিন্ন মাত্রায় নিয়ে গিয়েছিলেন। সে সময়ে ফ্রান্সে পোস্টার নিয়ে রীতিমত হৈ চৈ পড়ে গিয়েছিলো। বিভিন্ন শিল্পীরা তখন পোস্টারের শিল্প নির্দেশনা দিতে বসে যান তুলি হাতে। প্রচুর পোস্টারের প্রদর্শনীও তখন নিয়মিত অনুষ্ঠিত হতো। একজন পোস্টার সংগ্রাহক সেই সময়ে ২২০০ পোস্টারের তালিকা করেছিলেন। লোত্রেকের সেই বিখ্যাত পোস্টার আঁকার মাত্র তিন বছর পরে ফ্রান্সে বসে চেক নাগরিক আলফান্সো মুচা পোস্টার অঙ্কনে একেবারে ভিন্ন ধারার সূচনা করেন। পোস্টারকে তিনি নিয়ে আসেন শিল্পের পর্যায়ে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরু হওয়ার আগ পর্যন্ত মুচার এই ঘারানা গোটা পৃথিবীতে ছিলো আলোচিত। নিউইয়র্কের পোস্টার জাদুঘরের একটা অংশ সাজানো হয়েছে মুচার আঁকা পোস্টার দিয়ে।

লে চার্ট নইয়ার ছিলেন প্রথম আধুনিক ক্যাবারে নাচের শিল্পী। ফরাসী দেশের এই কন্যার নাচের অনুষ্ঠানের পোস্টার আঁকেন শিল্পী থিওফেলি সেটিনেল। বলা হয়ে থাকে পোস্টারের ইতিহাসে নইয়ারের নাচের সেই পোস্টারটি এখনো আলোচনার শিরোনাম হয়েই আছে।

যুদ্ধ আর বিপ্লবের ঝড় বয়ে গেছে পৃথিবীর বুকে বহুবার, বহু সময় ধরে। সেই উন্মাতাল সময়ে প্রিকাশিত অনেক পোস্টার আজো পৃথিবীতে অমর হয়ে আছে। এমনি একটি পোস্টার চে গুয়েভারার মুখশ্রী সম্বলিত। গাঢ় লাল রঙের পটভূমিতে আঁকা চে গুয়েভারার মুখ আঁকা কোলো রঙে। ষাটের দশকে পোস্টারটি এঁকেছিলেন আয়ার‌ল্যান্ডের শিল্পী জিম ফিজপ্যাট্রিক। বলা হয় পৃথিবীর সবচাইবে বেশি সংখ্যায় বিক্রি হওয়া পোস্টারের তালিকায় চে’র প্রতিকৃতিটি এখনো শীর্ষে। মজার বিষয় হচ্ছে, ছবিটি আঁকার সময় শিল্পী খুব কৌশলে চে গুয়েভারার কাঁধের কাছে আলতো ব্রাশের টানে নিজের ফিজপ্যাট্রিক নামের অদ্যক্ষর এফ শব্দটি বসিয়ে দিয়েছিলেন। খুব ভালো করে লক্ষ্য করলে তার কৌশলী কর্মটি বোঝা যায়।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের একেবারে সূচনা প্রহরে রুশ শিল্পী লার্লকি তোয়েৎজি স্ত্রীকে মডেল বানিয়ে এঁকে ফেলেছিলেন সেই বিখ্যাত পোস্টার যেখানে লাল পোশাক পরা একজন নারীকে দেখা যায় হাত তুলে শপথ নিতে। পেছনে দৃশ্যমান অসংখ্য বেওনেট আর বন্দুকের নল। হিটলারের জার্মানীর রাশিয়া দখল অভিযানের প্রথম দিনেই তোয়েৎজি নিজের স্টুডিওতে বসে এঁকেছিলেন পোস্টারটি। সামনে বসেছিলেন তার স্ত্রী। এই পোস্টার গোটা বিশ্বযুদ্ধের সময়ে অনুপ্রেরণা যুগিয়েছিলো রাশিয়ার সংগ্রামী মানুষদের।

প্রথম এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় আমেরিকায় এমনিই আরেকটি পোস্টার আলোচিত হয়েছিলো। যুদ্ধে মার্কিন সেনাবাহিনীতে ভর্তি হওয়ার জন্য আহ্বান জানানো হয়েছিলো সেই পোস্টারের মাধ্যমে। অজ্ঞাত সেই শিল্পী নিজের মুখ ব্যবহার করেছিলেন আংকেল স্যামের প্রতিকৃতি হিসেবে।

ষাটের দশকে ‘সেভ দিজ লাইভস’ শ্লোগান লেখা পোস্টারটি মৃত্যুদণ্ডের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিলো প্রতিবাদের হাতিয়ার হয়ে। দক্ষিণ আফ্রিকায় বর্ণবাদ বিরোধী লড়াইয়ের কিংবদন্তিতুল্য নেতা নেলসন ম্যান্ডেলা তখন কারাগারে বন্দী। সেখানকার বর্ণবাদী সরকার তাঁর মাথার উপর ঝুলিয়ে দিয়েছে মৃত্যুদণ্ড। ম্যান্ডেলার সঙ্গী আরেক নেতা ওয়াল্টার সিসেলু। তাাঁদের জীবন বাঁচাতে পৃথিবীর প্রগতিশীল মানুষরা প্রতিবাদ করেছিলেন একযোগে। ফাঁসির দড়ি আর ম্যান্ডেলার ছবিসহ সেই পোস্টার তখন বাজিয়েছিলো বিদ্রোহের সুর।

সাদা কালোয় আঁকা শান্তির প্রতীক। পিস নামেই পোস্টারের জনপ্রিয়তা। প্রতীকটিও এখন পর্যন্ত শান্তি বোঝাতেই ব্যবহৃত হয়। কে এঁকেছিলেন এই প্রতীকটি? স্বয়ং পাবলো পিকাসো। পঞ্চাশের দশকে পিকাসো এই প্রতীকটির জন্ম দেন ক্যানভাসে। তারপর আরেক শিল্পী জেরাল্ড হলটম ইংল্যান্ডে পারমাণবিক বোমা তৈরির বিরুদ্ধে প্রচারণা আন্দোলনের সূচনায় এই প্রতীকটিকে পোস্টারে রূপ দেন।

‘ব্রেকফাস্ট অ্যাট টিফেনিস’ সিনেমার কথা চলচ্চিত্রপ্রেমীদের প্রায় সবারই জানা। অভিনয় করেছিলেন অসাধারণ অড্রে হেপবার্ন। কিন্তু সেই সিনেমার চাইতে বোধ হয় বেশি আলোড়ন তুলেছিলো সিনেমার পোস্টারটি। এই পোস্টারে ঠাঁই পেয়ে হেপবার্ন হয়ে উঠেছিলেন ফ্যাশন আইকন। আজ পর্যন্ত পৃথিবীতে অড্রে হেপবার্নের পরিচিতির সঙ্গে এই পোস্টার জড়িয়ে আছে। পোস্টারটি তৈরি করেছিলেন আমেরিকান শিল্পী রবার্ট ম্যাকগিনেস।

বিংশ শতাব্দীতে সিনেমা অথবা গানের দুনিয়ায় এই পোস্টারচিত্র হয়ে তুমুল আলোচিত হয়েছেন কয়েকজন নারী তারকা। তাদের তালিকায় আনে মেরিলিন মনরো, ফারাহ ফসেট, ম্যাডোনা, বারবারা স্ট্রেইস্যান্ড প্রমূখ। কিন্তু চোখ বন্ধ করে বলে দেয়া যায় এই তালিকার প্রথম স্থানটি মেরিলিন মনরোর জন্য বরাদ্দ করা।

১৯৫৪ সালে নিউইয়র্কে স্কার্ট উড়ে যাওয়া সেই আবেদনময় দৃশ্যের ছবি ক্যামেরাবন্দী করে ঝড় তুলেছিলেন মেরিলিন মনরো। ক্যামেরার শাটার টিপেছিলেন ফটোগ্রাফার স্যাম শ। তিনি ছিলেন মেরিলিনের বিশেষ বন্ধু। ‘সেভেন ইয়ার্স ইচ’ নামে মনরোর আলোচিত সিনেমার শুটিংয়ের সময় শ এই বিখ্যাত ছবিটি তোলেন। পরে গোটা দুনিয়ায় পোস্টার হয়ে ছবিটি ঝড় তোলে। সবচেয়ে বেশি বিক্রি হওয়া পোস্টারের তালিকাতেও এই পোস্টার প্রথম পাঁচটির মধ্যে একটি।

সিনেমার দুনিয়ায় আলোচিত পোস্টারের মধ্যে একটি হচ্ছে ‘গড ফাদার’ ছবির পোস্টার। আধুনিক যুগে করা এই পোস্টারের গ্রাফিক ডিজাইনার ছিলেন এস.নিল ফুজিটা। তবে আলফ্রেড হিচককের ছবির পোস্টারগুলোও অমরত্বের দৌড়ে অনেককেই পেছনে ফেলে দিয়েছে। তবে সবাইকে দৌ্ড়ে পেছনে ফেলে দিয়েছে ১৯২৭ সালে নির্মিত নির্বাক সাইন্স ফিকশন ছবি ‘মেট্রোপলিস’। পৃথিবীতে এখন এই ছবির তিনটি পোস্টার টিকে আছে যার একটি রয়েছে আমেরিকার মর্ডান আর্ট মিউজিয়ামে। ২০০৫ সালে অষ্ট্রেলীয়ার ন্যাশনাল লাইব্রেরীতে রক্ষিত এই পোস্টারটির আরেকটি কপি নিলামে উঠলে একজন ব্যক্তিগত সংগ্রাহক তা কিনে নেন ৩ লক্ষ ডলার।

সিনেমার পোস্টারের তালিকায় ‘রোমান হলিডে’ আর ‘কাসাব্লাংকা’র নামও ঝুলে আছে সগৌরবে বহুদিন ধরে।

বিজ্ঞাপনের সঙ্গে গভীর সম্পর্ক পোস্টারের। সফল পোস্টার পণ্যকে চোখের পলকে জনপ্রিয় করে তোলে। তেমনি একটি পোস্টার ছিলো কোকাকোলা কোম্পানীর। তখন টেলিভিশনের যুগ নয়। কিন্তু কোকাকোলা কোম্পানী তাদের পোস্টারে আকর্ষণীয় নারীদের ছবি ছাপতে শুরু করে। আর তাতেই বাজার মারকাটারি। একই ভাবে তারা একদা সান্তাক্লজের ছবি দিয়ে পোস্টার বানিয়েও বিখ্যাত হয়েছিলো।

পণ্য নিয়ে বিপদে পড়লে পোস্টার সহায়তার হাত বাড়িয়ে দেয়। জার্মানীতে তৈরি ফক্সওয়াগন গাড়ি নিয়েও বিপদে পড়েছিলো কোম্পানীওয়ালারা। কারণ হিটলারের দেশে তৈরি গাড়ির ব্যাপারে ক্রেতাদের ভালোরকম আপত্তি ছিলো। শেষে সেই পোস্টারের হাত ধরতে হলো তাদের। আর পোস্টারের গুনে বিক্রি হতে শুরু করলো ফক্সওয়াগন গাড়ি।

ষাটের দশকে এসে বদলে যেতে থাকে পোস্টারের ভাষা। পোস্টারের ডিজাইনে আসে অনেক বদল। সরাসরি কথা বলার চাইতে একটু ভিন্ন আঙ্গিকের ব্যবহার শুরু হয়। ষাটের দশকে সঙ্গীতশিল্পী বব ডিলানের একটি রেকর্ডের প্রচ্ছদে এ ধরণের চিন্তার প্রথম প্রতিফলন দেখা যায়। অনেকে এই নতুন ধারার নাম দেন পরাবাস্তব পথ। নেশার সাম্রাজ্যের বিস্তার আর রাজনীতির প্রতি বিচ্ছিন্নতাবোধ থেকেও তৈরি হয় নতুন ধরণের পোস্টার। আমেরিকায় এই ধারার নাম হয় সাইকোডেলিক ধারা।

পোস্টারের ভাবনা পাল্টে দিয়েছে ইন্টারনেট। চিন্তার ক্ষেত্রে ঘটেছে বিপ্লব। গ্রাফিক ডিজাইনের মাধ্যমে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার করে পোস্টার এই সময়ে নতুন স্তরে উঠে গেছে।

প্রাণের বাংলা ডেস্ক

তথ্যসূত্র ও ছবিঃ ইন্টারনেট

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]