পৃথিবী যতই বদলে যাক আমি এমনই থাকতে চাই!

ফেইসবুক এর গরম আড্ডা চালাতে পারেন প্রাণের বাংলার পাতায়। আমারা তো চাই আপনারা সকাল সন্ধ্যা তুমুল তর্কে ভরিয়ে তুলুন আমাদের ফেইসবুক বিভাগ । আমারা এই বিভাগে ফেইসবুক এ প্রকাশিত বিভিন্ন আলোচিত পোস্ট শেয়ার করবো । আপানারাও সরাসরি লিখতে পারেন এই বিভাগে । প্রকাশ করতে পারেন আপনাদের তীব্র প্রতিক্রিয়া।

রুমানা মোর্শেদ কনকচাঁপা

রুমানা মোর্শেদ কনকচাঁপা

আমার বাসার রান্নাঘরের বারান্দা। অনেক রকম টবে কিছু কিছু গাছ। সবজি, পুদিনা পাতা ও ধনে পাতা। সেখানে দুষ্ট চড়ুই পাখি শুধু জ্বালাতন করে। জ্বালাতন মানে সত্যি সত্যিই। মরিচ গুঁজে দিয়েছি টবে চারা বানাব- তারা দল বেঁধে কচি অঙ্কুরগুলো সালাদ ভেবে খেয়ে নিল। আমার মরিচ গাছের স্বপ্ন অঙ্কুরেই মিশে গেল। পুদিনার সবুজ-সবুজ টব একদিন সকালে দেখি সব খেয়ে বিনষ্ট। আসমা তো বকেটকে অস্থির। আমি ওকে থামাই আর প্রশ্রয়ের হাসি হাসি। প্রচ্ছন্ন প্রশ্রয়। আহা! খাক, খেয়ে বেঁচে থাকুক। ইদানীং তো কাজ ছাড়া মেহমানও আসে না। সবাই ব্যস্ত। এসব আধুনিক অ্যাপার্টমেন্টে চিরায়ত ভিক্ষুকরাও আসে না- ডাকে না মাগো! তো কিছু কাক কিছু চড়ুই ওরাই তো আমার বিশেষ মেহমান। আমি সুন্দর পাত্রে চাল-সরিষা রেখে দিই। ওরা খাবে। আসমা হাসে, খালাম্মা আপনি না! একদিন দেখি বারান্দায় দুটো চড়ুইয়ের খুব আনাগোনা। মতলবটা কী? দেখি আমার কুকার হুডের ভ্যান্টিলেটর লাইনের ফোকরে ফুড়ুৎ ফুড়ুৎ যায়-আসে। বাসা বানাবে। না, বানিয়ে ফেলেছে ইতিমধ্যেই! আমি ভয়ে পেয়ে যাই। ওখানে বাসা। আমি কুকার হুড চালাব না! ওরা পেয়েছে কী? রাগতে গিয়েও দমে যাই। ওই হুড ছাড়াও আমার আর একটা অ্যাডজাস্ট ফ্যান আছে। সেটাই প্রয়োজনে চালাব। বাসার সবাইকে নিষেধ করে দিই হুডটা কেউ যেন না চালায়। এ ধরনের কাজে আমার বাড়ির সবাই অভ্যস্ত এবং পশুপাখি এমনকি আরশোলা, পিঁপড়ার প্রতিও তাদের ভালোবাসা। তাই কুকার হুড বন্ধ। হঠাৎ একদিন দেখি ওই অ্যাডজাস্ট চ্যানেলের নিচে একটা কী পড়ে আছে। চোখ গুঁজে দিয়ে দেখি একটা পাখির ছানা মৃত। কী করে হলো? চমকে উঠি। একদম এক দিনের ছানা। মৃত দেখে মা পাখি কি ওখানে ফেলেছে? কেমন করে মরে গেল? আমার কাজকর্ম সব মাথায় উঠল? পৃথিবী নাকি ধ্বংস হয়ে যাবে এই বারোতেই, চাল-ডালের দাম আগুনকেও হার মানাচ্ছে- সরকার ও বিরোধী দল ঝগড়ায় ব্যস্ত, সেখানে আমি যদি একটা মৃত চড়ুই পাখি নিয়ে দুশ্চিন্তা করি, তবে আমাকে কি সবাই পাগল ভাববে? ভাবুক- আমার ভাবনা আমারই মতো। ছোট, কিন্তু ফেলনা নয়। ভাবতে ভাবতে বেলা যায়। ওই ফোকর থেকে কেমন মৃত গন্ধ আসছে। ছোট ভাই তানভীরকে রাজি করাই পাখির বাসাটাকে বের করে আনতে। আমার কত রকম যন্ত্রণাই যে ওরা মেনে নেয়। বাসাটা টেনে বের করে। ওমা! কত বড় বাসা, কত খড়কুটো, পালক, কয়দিনে ওরা এই বাসা বানাল? ওমা! দুটো জ্যান্ত বাচ্চা। কেঁচোর মতো জড়াজড়ি করে নড়ছে। প্রাণস্পন্দন দেখা যাচ্ছে। এখন? ও তানভীর, বাসাটা আবার ঢুকিয়ে দাও ভাইয়া। যেমন ছিল তেমন। তানভীর রাগ করে না। সে তার এই পাগল বোনকে চেনে। যেমন ছিল তেমনি আলগোছে রাখার বৃথা চেষ্টা করল। আমি এখন চিন্তায় আছি যে পাখিগুলোর মা-বাবা কোথায়। বাচ্চা দুটোর তো ক্ষুধা লেগেছে! কতক্ষণ পর দেখি দুটো চড়ুই পাখি (দম্পতি) ছটফট করছে, কিন্তু বাসায় ঢুকছে না- ওরা কী ভাবছে! বাসাটা যে বের করা হয়েছে তা টের পেয়েছে। এখন? কতক্ষণ পর দেখি বড় বড় ছয়-সাতটা চড়ুই গ্রিলে বসছে বোধ হয় দরবার করতে এসেছে। তারা উড়ে যাচ্ছে আবার আসছে। অস্থির অস্থির অবস্থা তাদের সবার, কিন্তু অসহায় পরিস্থিতি। আমিও বেকুব- কেন এই ভুল করলাম, কেন ওদের বাসায় হাত দিলাম। আড়ালে দাঁড়িয়ে দেখছি, মা তো আর বাসায় ঢুকছে না। আমি কী করলাম, আমি কী করলাম! জীবনে এমন ভুল আমি করিনি আর করবও না- এমন প্রতিজ্ঞা করতে করতে চোখের পানি ফেলতে ফেলতেই সাঁঝ নেমে এলো। পাখি দুটিকে আর দেখলাম না। ওরা কি বাসায় ঢুকল? না অন্য কোথাও উড়ে গেল। বাচ্চা দুটি কি বেঁচে আছে এতক্ষণ? ওরা কি আমাকে দোষী বলেই ভাবছে? আমি যে ওদের কোনো ক্ষতি করতে চাইনি, তা কি ওরা কখনো বুঝতে পারবে? কত ধরনের প্রশ্ন আমায় বিব্রত করে অপরাধীর কাঠগড়ায় দাঁড় করাচ্ছে, তা আমি জানি। এ পৃথিবীতে মানুষ মানুষকে খুন করে, দেশ দেশকে ধ্বংস করে দেয় আর আমি? একটা চড়ুই পাখির বাসা একটু নাড়া দিয়ে এমন অস্থির হয়ে গেলাম কেন? কারণ বোধ হয় বিবেকটা আমার যতটুকু দিয়েছেন সৃষ্টিকর্তা, পুরোটাই এখনো আস্ত আছে। এ শহরের ইটকাঠের মাঝে বন্দি থেকেও তা এতটুকু ম্লান হয়নি। এখনো আমি সোমালিয়া-বসনিয়ার হাড্ডিসার শিশুদের দেখে চমকে উঠি। এখনো পথের বাঁশিওয়ালার সুরে কাঁদি, এখনো বৃদ্ধ ভিক্ষুককে দেখে নিজের গরিব আত্মীয়র কথা মনে করি এই আমি, এমন আমি চাই না বদলে যেতে। আমার আমি, আমার ভুবন, আমার জীবন, আমার শিল্প, এমনই থাকুক। আমি এমনই থাকতে চাই, পৃথিবী যতই বদলে যাক।

ছবি: লেখক