পেশা যখন ভ্রমন

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

শওকত আহসান ফারুক

শওকত আহসান ফারুক। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে রসায়নের ছাত্র ছিলেন।কিাজ করেছেন বহুজাতিক ওষুধ কোম্পানীতে। কাজের সঙ্গে লেখালেখিও চলেছে তুমুল।পেশাগত কারণে ঘুরে বেড়িয়েছেন বাংলাদেশের নানান জায়গায়। সেই কেজো ভ্রমণের গল্প হয়ে উঠেছে জীবন দেখার ছবি। প্রাণের বাংলায় তার সেই ভ্রমণগল্প ‘পেশা যখন ভ্রমণ’ ধারাবাহিক ভাবে ছাপা শুরু হলো।

এক.

একদিন জুলাই মাসের তপ্ত দুপুরে মতিঝিলে সঙ্গে জাকির ভাই। আমিন কোর্টে পেরুতেই, মনে পড়ল হাবিবের কথা, ‘স্কুইব অব (বাংলাদেশ)’এ কিছু মেডিকেল রিপ্রেজেন্টেটিভ নেওয়া হবে। সিনোরিটা শাহবাগের আড্ডায় বন্ধু হাবিব বলেছিলো, তুমি একদিন আমিন কোট অফিসে দেখা করো, আমাদের এখানে লোক নিবে, সেও হয়েছে মাসাধিক। তেমন কিছু না ভেবেই লিফটের বোতাম টিপে উঠে গেলাম ফিফথ ফ্লোর, মাথায় তখন ঝাকড়া লম্বা চুল সেই সময়ের ফ্যাশন। ঢাকার অফিস পাড়ার আমিন কোট অভিজাত, বেশ পরিপাটি সেন্ট্রাল এসি। ঢুকেই ইনফরমেশন, সেলস ম্যানেজার রফিকুল ইসলাম সাহেবের সঙ্গে দেখা করার অভিপ্রায় জ্ঞাপন করলাম।
জেনে এসে, আমাকে নিয়ে গেলেন, কাঁচ ঘেরা কেবিনে।

-আমি শওকত, চাকরিপ্রার্থী, এমএসসি পরীক্ষা দিয়েছি, বিষয় কেমিস্ট্রি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, এখনো ফল প্রকাশ হয়নি।
-আপনার দেশের বাড়ি কোথায়?
-কুমিল্লা।
কুমিল্লা বলাতে একটু সচকিত হলেন।
-অ্যাপ্লিকেশন এনেছেন?
-না স্যার।
-একটা এপ্লিকেশন করে দিবেন।
-স্যার, আজই কি করতে হবে।
-সম্ভব হলে করে দিন, অফিস ৫ টা পর্যন্ত খোলা আছে।

জাকির ভাই নিচে অপেক্ষা করছিলেন সব শুনে বললেন, শওকত, আজই অ্যাপ্লাই করে দাও। চলো, সামনে গ্লোব চেম্বার সেখানে একটি সওদাগরী অফিসে লর্ড ভাই চাকুরি করেন। লর্ড মুকুলের বড় ভাই হলেই থাকেন। আমরা হিটলার ভাই বলে ডাকি চুল ও গোঁফ সেই ধাঁচে কাটা। জাকির ভাই একটা অ্যাপ্লিকেশন টাইপ করে দিতে বল্লেন। রেমিংটন টাইপ রাইটারে কাগজ এবং কার্বন দিয়ে ঘন্টাখানেক পরিশ্রম করে মোটামুটি নির্ভুল একটি চাকরির দরখাস্ত টাইপ করে পুনরায় আমিন কোর্টে এলাম। সঙ্গে কোন ছবি ছিল না বিধায় ছবি ছাড়াই অ্যাপ্লিকেশন দিয়ে বললাম সঙ্গে ছবি নেই। অ্যাপ্লিকেশনে নেড়েচেড়ে দেখে এবং পড়ে, রফিক সাহেব বললেন নিচে নাম ঠিকানা ফোন নাম্বার আছে, আমরা যোগাযোগ করবো, একটি ছবি দিয়ে যাবেন।

সেদিনই শাহবাগ বিপনি বিতান স্টুডিও ত্রিভোলিতে একটি ছবি তুললাম পাসপোর্ট সাইজের। দু’দিন পরে ডেলিভারি। স্ট্রাইপ শার্ট পরে ছবিটা তুলেছিলাম বেশ মনে আছে। সেইসময় সাইন্স ফেকাল্টি থেকে অনার্স কিংবা মাস্টার্স পরীক্ষা যারা দিয়েছে তারাই মেডিকেল রিপ্রেজেন্টেটিভ এর জন্য অ্যাপ্লাই করছে। আমার সহপাঠী ও ব্যাচ ম্যাট অনেকেই মেডিকেল রিপ্রেজেনটেটিভের জব করছে। ইসমাইল অনার্স শেষ করেই স্কয়ার কোম্পানিতে যোগ দেয়, হলে থেকেই চাকরি ও পড়াশোনা করছে। ইসমাইল আমাদের উৎসাহিত করেছে এই প্রফেশনে যোগদানের জন্য, কিছু গাইড লাইন ও সাম্ভাব্য বিষয়ে অবহিত করে দিলো, যেমন বিপণন, ডাইজেস্টিভ সিস্টেম অ্যানাটমি, ফিজিওলজি এইসব। বায়োলজি আমার বিষয় ছিলো না তবে অরণির বায়োলজি খাতা এঁকে দেবার সুবাদে রেসপিরেটরি ট্রেক, ডাইজেস্টিভ সিস্টেম এইসবের সঙ্গে কিছুটা পরিচয় আছে।

কাউসার, তোফায়েল, কাজল, মামুন, রফিক, বাবলা, ফারুক, নজরুল অনেকেই জব করছে। ডজন খানেক মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানি বাংলাদেশে, ঢা

কা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাস করে মোটামুটি সবাই মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিতে জব পেয়ে যায়। আমারও চিঠি এলো, ১৯৮০ সালের জুলাই মাসে।

যথারীতি শার্ট ইন করে একটু ফিটফাট হয়ে ফজলুল হক রুম নাম্বার ১৪৬ থেকে আমিন কোটে ইন্টারভিউতে দিতে যাই তখন সকাল দশটা।
ঢোকার পরেই রফিক সাহেব কফির কথা বল্লেন, টেবিলে রাখা হলুদ প্যাকেট স্টেট এক্সপ্রেস 555 এগিয়ে দিলেন, একটু ইতস্তত করছিলাম দেখে লাইটার জ্বালিয়ে এগিয়ে দিলে বল্লেন নিন। গল্প হলো দেশ রাজনীতি এসব নিয়ে। গ্রামের বাড়ির কথা জিজ্ঞেস করলেন। ইলিয়টগঞ্জ শুনে আগ্রহ প্রকাশ করলেন।
-ইলিয়টগঞ্জের করিম মাস্টার কে চিনেন?
– জী চিনি, উনি আমার বাবার কলিগ আমার বাবাও ইলিয়টগঞ্জ স্কুলে একসময় শিক্ষকতা করতেন সেই ১৯৪৮ থেকে ‘৫৬ পর্যন্ত করিম মাস্টারের সঙ্গে আমার আমাদের পরিবারের অত্যন্ত গভীর সম্পর্ক, আত্মীয়তা আছে। একাত্তরে আত্মসমর্পণ প্রাক্কালে পাক সেনারা উনাকে মেরে ফেলে।
বিস্মৃতির অতলে হারিয়ে গেলেন রফিক সাহেব।(পরে জেনেছি করিম মাস্টার রফিক সাহেবের খালাতো ভাই) আরো একটা সিগারেট কফি, গল্প হলো প্রায় মিনিট চল্লিশ।

বারো তারিখ তিনটা দশে একবার অফিসে আসবেন। (চলবে)

ছবিঃ গুগল

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]