পেয়ে হারানো পরশপাথর

কনকচাঁপা বিশিষ্ট শিল্পী কনকচাঁপা এবার গানের পাশাপাশি প্রাণের বাংলার পাতায় নিয়মিত লিখবেন তার জীবনের কথা।কাটাঘুড়ির মতোকিছুটাআনমনা সেসব কথা, হয়তো কিছুটা অভিমানিও। কিছুটা রৌদ্রের মতো, খানিকটাউজ্জ্বল হাসির মতো। পড়ুন কাটাঘুড়ি বিভাগে।

সারাটাজীবন বাবা কে হারানোর ভয় আমাকে কুঁড়ে কুঁড়ে খায়।মা কে হারাবো বা মা একদিন থাকবেন না এটা আমি আয়োজন করে ভাবিই না।কিন্তু বাবাকে আমি চোক্ষে হারাই।আমাদের সময়ে মধ্যবিত্ত পরিবারে রেশন এর দোকান এর তেজারতি খুবই প্রয়োজনীয় ছিল।আব্বা আম্মা দুজনই সাপ্তাহিক রেশন তুলতে যেতেন।কখনো আম্মা কখনো আব্বা।আম্মার সঙ্গে যেতাম না,কারন আম্মার সঙ্গে আম্মার গরম চোখ সদা জাগ্রত থাকতো। আব্বার সঙ্গে গেলে আব্বা কত কিছু শিখাতেন! সেই সময়টা আমার বড়ই আনন্দে কাটতো।একদিন আব্বা কোন কারনে আমাকে না নিয়েই চলে গিয়েছেন।আমি আব্বাকে কোথাও খুঁজে পাইনা, পাইনা, পাই না।ভেতরে ভেতরে কান্নায় ফেটে পড়ছি।হঠাৎ সাহস করে রেশন শপের দিকে রওনা দিলাম শান্তিবাগ থেকে মালিবাগ এর কোনার দিকে রেশন শপ।যেতে যেতে কত রকম ভয় পেতে থাকলাম! রেশন শপ এ গিয়ে আব্বাকে পেলাম না। বাড়ি না ফিরে চলে গেলাম রেললাইনের দিকে।শুধু মনে হচ্ছিল আব্বা এই রেললাইনে করে কোথায় চলে গিয়েছেন! আমি কেঁদে কেঁদে একজায়গায় দাঁড়িয়ে রইলাম। এর পর কেউ হয়তো বাসায় দিয়ে গিয়েছে! স্কুলের ছুটিতে যখন গ্রামে যেতাম আম্মা আমাদের নিয়ে আগে যেতেন।আব্বা একদম শেষে দুইদিনের ছুটিতে যেতেন।এই কদিন আব্বাকে ছেড়ে থাকা আমার জন্য ভয়ানক ছিল।যেদিন বাড়ি যেতাম সেদিন সকাল থেকে হারানোর ভয় আমাকে জড়িয়ে থাকতো।রাতে ট্রেনে চড়লে যে কান্না শুরু হত সেই কান্না ট্রেনের গতির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়তো।আম্মা বলতেন কোথা থেকে যে এই মেয়েটা সিনেমাটিক হল! এতো ঢং করতে পারে! এতে আমার কান্না আরো বাড়তো। রাস্তায় কোন এক্সিডেন্ট দেখলে মনে হত ওই জটলার মধ্যমনি আব্বা নয়তো? আব্বা যখন আয়োজন করে আল্লাহর গল্প বলতে বসতেন তখন গল্প শুনতে শুনতেই আল্লাহ কে বলতাম আল্লাkhaghuri_dce_in2হ গো! তোমার গল্প বলা এই মানুষ টাকে আমার কাছ থেকে কেড়ে নিওনা আল্লাহ! জীবন জীবনের প্রয়োজনে এগোতে থাকে।বড় হয়ে একজন শিল্পী হয়ে উঠতে সারাজীবন আমাকে ব্যস্ত থাকতে হয়েছে।তখন আব্বাই আমার পাশে বিপদে আপদে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে থেকেছেন।সব্যসাচী বাবা আমার,আমার সংসারের কত খুঁটিনাটি জিনিস তিনি করে দিয়েছে।আমার গানের খাতা,আমার কোরানের রেহাল,আমার বইয়ের বাধায়,আমার ঘর সাজানো, আমার দেয়ালের ছবি আঁকা,আমার গ্যসের চুলা সারানো,আমার ঘরের দরোজায় আয়াতুল কুরসি লিখে দেয়া,আমার ছেলেমেয়েদের জামা সেলাই করে দেয়া,তাদের ইস্কুলের পড়া? আশেপাশের সবাই হিংসান্বিত ছিল আমার আর আব্বার এই সকল একাত্বতায়।কিভাবে কখন যে বেলা পার হয়ে গেল! ডাঃ রা এতো থুয়ে আমাকেই ডাকলেন।বললেন শক্ত কিছু কথা আছে,কঠিন হয়ে শুনতে হবে।আমি কঠিন হয়ে দাঁড়িয়ে বললাম, বলেন।ডঃ বললেন আপনার বাবার লাংক্স পুরা পানিতে ডোবানো! এই পানির ড্রেনেজ কঠিন। আমি সব বুঝে গেলাম।আমি বুঝতে পারছিলাম আব্বা আর ফিরবেন না।কিন্তু কত কথা শোনা বাকী।জীবনের প্রয়োজনে কত ব্যস্তই না থেকেছি।আমার যাদুকরের কত কিছুই না আমার বাকী রয়ে গেল!তার বাবা হারানোর গল্প,তার হতদরিদ্র হয়ে এ বাড়ি ও বাড়ি জায়গীর থেকে পড়াশোনার গল্প।ভাবনা এগুতেই থাকে এভাবে।বাবার লাংক্স পানিতে ডোবানো,আমি সাথে সাথে জলহস্তী হয়ে পানিতে ঘুরে বেড়াই।দেখি পানির নীচেও একটি আধ্যাত্মিক জগত।সেখানে কত ভাবনা খেলা করে।হঠাৎ দেখি বাবা আমার দিকে আসছেন।বাবা আংগুল উঁচিয়ে ডাকেন—কনা মা, আমার গানের পাখি! আমি আব্বার উত্থিত তর্জনী ধরে পানিতে হাঁটি।বাবা এবার স্বচ্ছ পানির ফাঁকে বিচ্ছুরিত হওয়া আলোতে রঙের খেলা ও প্রয়োগ শেখান।এভাবে নীল আর হলুদ মেলাবে।সবুজ হবে।লাল আর নীল হবে বেগুনী। মেলাতে হবে মা।কিন্তু একবার মেলাবে যখন তখন আর মৌল তে ফেরা হবেনা।জীবনের মতই।রওনা দিলেই পথ ফুরাবে—শুরুর দিকে আর যেতেই পারবেনা।বাবা— তুমি না!শুধু অন্য কথায় যাও,আমার রঙের প্রয়োগ শেখা কত বাকী রয়ে গেল আব্বা? আব্বা কই তুমি? কোথায়? আমি যে ভয় পাই! রংহীন, সুরহীন, বাবাহীন আমি যে শুন্য তা অন্য কেউ না জানুক তুমি তো জানো! আমায় ফেলে যেওনা বাবা। বাবাআয়ায়ায়ায়ায়াগোওওওওওও।

কাভার ছবি: টুটুল নেসার