পৌঁছে গেলাম অক্ষরধাম মন্দিরের ফটকে

স্মৃতি সাহা

জৈষ্ঠ্যের তপ্ত দিনের হলকা হাওয়ায় শহর যখন উষ্ণতম, দৈনন্দিন কর্মের একঘেয়েমি যখন ক্লান্তি আনে তখন মন চায় পরিবর্তন, চায় প্রশান্তি। তাই কর্মব্যস্ত সপ্তাহের সমাপ্তি ঘটিয়ে সপ্তাহান্ত আসতেই মন হয়ে ওঠে বাউণ্ডুলে। অন্তঃপুর ছাড়ার ডাক যেন প্রতিধ্বনিত হতে থাকে বারবার। আর বাউণ্ডুলে মন সে ডাকে সাড়া দেবে তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। তবে এবারের গন্তব্য তৎক্ষণাৎ নেওয়া সিদ্ধান্ত নয়। বেশ আগে থেকেই পরিকল্পনা করে রাখা ছিল এবারের সপ্তাহান্তের গন্তব্য। বেশ কিছুদিন আগেই শুনেছিলাম আমার নিবাসের খুব কাছেই এক ইতিহাস রচনা হয়েছে। ঐতিহ্য আর নান্দনিকতার মেলবন্ধনে তৈরী হয়েছে এক বিশাল উপাসনালয় বা মন্দির। আর এই বিশালতার কারণেই সারা পৃথিবীতে আদৃত হতে শুরু করেছে এই মন্দিরটি; “পৃথিবীর সর্ববৃহৎ মন্দিরের” তকমা পেয়ে। তাই এই মন্দিরের বিশালতা চোখ দিয়ে মাপতে আর মনে ধারণ করতে আমাদের এবারের সপ্তাহান্তটি লিখে দিয়েছিলাম “অক্ষরধাম” মন্দিরটির নামে। মন্দিরের ঠিকানা নিউজার্সির রবিন্সহিলে।  নিউইয়র্কের পাশের এই স্টেটটির দূরত্ব প্রায় ৭৯ মাইল। আড়াই ঘন্টার বিরতিহীন ড্রাইভ করতে হবে আমাদের। এজন্য সেদিন সূর্যোদয়ের প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই আমরা ঘর ছাড়ি সেই মন্দিরের উদ্দেশ্যে। ছুটির দিনে নিউ ইয়র্কের নাগরিক সকাল তখনো বেশ আড়ষ্ট। ট্রাফিক বিহীন পথে খুব অল্প সময়েই আমরা নিউইয়র্কের কুইন্স থেকে ম্যানহাটনের সিক্সথ এভিনিউ তে পৌছে গেলাম। আমেরিকার খুব পরিচিত কফি আর স্ন্যাক্স শপ “ডানকিন ডোনান্ট” থেকে চিজ এগ স্যান্ডুইচ আর কাপুচিনো দিয়ে সকালের জলখাবার শেষে শুরু হলো আমাদের বিরতিহীন যাত্রা।

হাডসন নদীর উপর দিয়ে টোলযুক্ত ব্রিজ পেরিয়ে আমরা ছুটে চলছি নিউজার্সির দিকে নিউইয়র্ককে পিছনে ফেলে। এক্সপ্রেস ওয়ে’র দু’পাশে  বিরান সবুজ মাঠ আর মাঝে মাঝে ছোট ছোট কিছু লেক। লেকের জলে সাদা বকের জলকেলি আর বিরান মাঠের সবুজ ক্যানভাস দেখতে দেখতে পৌঁছে গেলাম “অক্ষরধাম” মন্দিরের ফটকে। প্রধান ফটক থেকে মূল মন্দিরের দুরত্ব প্রায় বেশ অনেকটা। তবে এই দূরত্বটুকু উপভোগ্য করে তোলে পান্না সবুজ ওক আর পাইন গাছ। এর সঙ্গে মাঝে মাঝে সবুজ টিলা আর তাদের গা জুড়ে নানারকম ঘাসফুলেদের জমজমাট আসর। এদেরকে পাশ কাটিয়ে আমরা পৌছে গেলাম পৃথিবীর বৃহত্তম মন্দিরের পাদদেশে। আমার জন্য বিস্ময়ের এক ভান্ডার নিয়ে যেন অপেক্ষায় ছিল এই মন্দিরটি। সবুজ লন আর স্বচ্ছ জলের নিরবিচ্ছিন্ন ফোয়ারার সামনে দাঁড়িয়ে লাল রঙের দৃষ্টিনন্দন এই মন্দির। ইটালিয়ান কারারা স্টোন, টার্কিশ লাইম স্টোন আর ইন্ডিয়ান পিংক স্টোন দিয়ে তৈরী এই বিশাল স্থাপনাটি। আর এসব পাথরে হাতে খোদাই করে বর্ণিত হয়েছে “বেদ” এর কথা আর ভারতীয় ঐতিহ্য।

ভারত থেকে খাঁজ কাটিয়ে আনা হয়েছে পাথরগুলোর। পাথরের সেই খাঁজে খাঁজে ছিল হিন্দু ধর্মের সৃষ্টি, ক্রমবিকাশ আর বৈদিক রীতিনীতির এক পরিপূর্ণ প্রকাশ। কাঁচের স্বচ্ছ মেঝেতে সেই সব পাথরের গল্পের প্রতিচ্ছবি যেন আরোও রঙিন হয়ে বাঙ্ময় হয়ে উঠছিলো। মনের অজান্তেই আমি যেন পৌঁছে গিয়েছিলাম কোন পুরাকালে। যে সময় সাধারণ সবকিছু শুধু সরলতার নিক্তিতে মাপা যেত! ভক্তি আর ভালবাসা ছিল শুধু সেই সময়ের একমাত্র উপাস্য! পাথরে দৃষ্টি রাখলেই সময় তো আর সময় পাথর হয়ে যায় না। খুব অল্প সময়ের জন্য এই মন্দিরটি খুলে দেওয়া হয় পর্যটকদের জন্য। তাই চোখের পলকেই সেই সময়টুকু শেষ হয়ে গেলো। বারবেলার পড়ন্ত সূর্যের আলো আমাদের পথ দেখিয়ে দিলো ঘরে ফেরার। আমরা যখন ফিরছি তখন মনের দেয়ালে খচিত হয়ে গেছে পুরাকালের সেই ভক্তি আর সৌন্দর্যের অনবদ্য এক গাঁথা।

ছবিঃ লেখক