প্রকৃতপক্ষে আমরাই সবচেয়ে অক্ষম …

শাহানা হুদা

ফেইসবুক।সবার কাছেই জনপ্রিয় এই শব্দটি। তাই প্রাণের বাংলায় আমরা সংযুক্ত করলাম ফেইসবুক কথা বিভাগটি।এখানে ফেইসবুকের আলোচিত এবং জনপ্রিয় লেখাগুলোই  আমরা পোস্ট করবো।আপনার ফেইসবুকে তেমনি কোন লেখা আপনার চোখে পড়লে আপনিও পাঠিয়ে দিতে পারেন আমাদের ই-মেইলে।

আমাদের বিল্ডিং-এ ৬ তলায় একটি বয়স্ক শিশু থাকতো তার মায়ের সঙ্গে। আসা যাওয়ার সময় হঠাৎ হঠাৎ দেখা হয়ে যেত পথে। বাচ্চাটিকে নিয়ে ওর মা যখন চলাফেরা করতেন, তখন তাকে দেখলেই বোঝা যেত দারুণ একটা কষ্ট বুকে চেপে আছেন। উনি খুব সন্তর্পণে, মুখ চোখ আড়াল করে বাচ্চাটিকে নিয়ে ঘরে ঢুকে যেতেন। তাও মাঝেমাঝে তাদের শেষরক্ষা হতো না। বাচ্চাটি লিফটের ভেতরেই পায়খানা, পেশাব করে ফেলতো। তা নিয়ে এই আমরাই বিরক্ত হতাম, খেদ প্রকাশ করতাম।

তাই হয়তো লজ্জায় ১৭ বছরের ঐ ছেলেটির মা মুখ লুকিয়ে চলতেন। প্রতিবন্ধী এই শিশুটির মা ছিলেন অসহায়, কারণ ডাক্তার বলেছিল প্রতিদিন বাচ্চাটিকে বাইরে হাটঁতে নিয়ে যেতে, নতুবা ও আরো অসুস্থ হয়ে পড়বে। তাই এই বিরাট সংসারে শিশুটির মা-ই এই অপ্রিয় কাজটি করতে বাধ্য হতেন।

আমাদের বিল্ডিং এর সেই অবুঝ শিশুটি তার মায়ের সকল যন্ত্রণার অবসান ঘটিয়ে পরপারে চলে গেছে বছরখানেক আগে। ওর মা কাঁদতে কাঁদতে একনাগাড়ে পাগলের মতো বলে চলেছেন, ‘ওর জন্য আমি ঘুমাতে পারতাম না। শুধু মনে হতো আমি ওকে রেখে মারা গেলে, কে দেখবে ওকে? আজকে ও আমার হাতেই মাথা রেখে চলে গেল, আজকে রাতে কি তাহলে আমি ঘুমাবো?’ এই প্রশ্নের কোন জবাব হয়না ।

বেশ কয়েক বছর আগে ’ রেইন ম্যান ’ নামে একটি সিনেমা দেখেছিলাম, যে সিনেমা আমাকে নতুন করে ভাবতে শিখিয়েছিলো ভিন্নভাবে সক্ষম মানুষদের নিয়ে । এরপরই দেখেছি ’ এ বিউটিফুল মাইন্ড ’ ও ’ মাই লেফট ফুট ’ ম্যুভিটি । সিনেমা তিনটি যেমন ছিলো চমৎকার, জীবন ঘনিষ্ঠ, তথ্য সমৃদ্ধ, তেমনি ছিলো হৃদয় ছোঁয়া । আমি দেখেছি, আর ঝরঝর করে কেঁদেছি । দেখার পর আমার মনটা এত বেশি বিষন্ন হয়ে পড়েছিলো যে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম আর কখনও এরকম বিষয়ে ম্যুভি দেখবোনা । কিন্তু সিজোফ্রেনিয়া, সেলিব্রাল পালসি, সেভান্ট সিন্ড্রম ইত্যাদি বিষয়গুলো সম্পর্কে আমার যে ধারণা হলো, তা আমাকে অন্য মানুষে পরিণত করলো, আমার চোখ খুলে দিলো, আমার অনেক ভুল ধারণা ভেঙে দিলো ।

বুঝতে পারলাম সেভান্ট সিন্ড্রমে আক্রান্ত একজন মানুষ, যাকে আমরা খানিকটা অস্বাভাবিক বলে মনেকরি, কিন্তু সেই মানুষটাই কতটা বেশি জ্ঞান তার মাথায় ধারণ করতে ও সাততাড়াতাড়ি সেই তথ্যগুলো স্মরণ করতে পারে, জেনে অবাক হয়ে গেছি । দেখতে পেলাম শিশুকাল থেকে যে মানুষটি শুধু তার বাম পায়ের উপর নিয়ন্ত্রণ রাখতে পারলেও একসময় সে বিশ্বের সেরা একজন লেখক ও আঁকিয়ে হয়ে উঠেছিলো । কীভাবে সিজোফ্রেনিয়ায় আক্রান্ত একজন মানুষও হতে পারে দারুণ গণিতবিদ, যার হাতে তৈরি হয় গাণিতিক থিওরি ।

আমরা যখন ছোট ছিলাম, তখন শুধু আমরা শারীরিক প্রতিবন্ধী মানুষ সম্পর্কেই জানতাম । বাসায় ও পৌরনীতি বইতে শেখানো হয়েছিল, ‘ খোঁড়াকে খোঁড়া বলিও না,’ ‘কানাকে কানা বলিও না’, ‘ বোবাকে বোবা বলিও না’ , বলিলে উহারা কষ্ট পায় ’ ব্যস এই পর্যন্তই। মানসিক প্রতিবন্ধিতা বলে যে কিছু আছে, তা জানতেও পারিনি ।

একইভাবে আমাদের কোনদিনই শেখানো হয়নি ভিন্নভাবে সক্ষম এই মানুষগুলো, অন্য জগতের কেউ নয়, ভিনগ্রহের প্রাণী নয় । এরা আমাদের পাশে থাকা মানুষ, যাদের মধ্যে রয়েছে অপরিমিত শক্তি । যারা আচার-আচরণে খানিকটা বা অনেকটাই অন্যরকম হলেও, এদের ভেতর লুকিয়ে রয়েছে মেধা । এদের ভালবাসতে হবে, যত্ন নিতে হবে, উৎসাহ দিতে হবে । সবচেয়ে বড় কথা সন্তান ভেবে তাকে বুকে টেনে নিতে হবে ।

আমরা সবাই সবসময় এদের এড়িয়ে চলেছি, এড়িয়ে চলি । ধরেই নেই এরা মানসিক রোগী বা বিকৃতভাবে বলি ’ পাগল ’ । কোন প্রতিবন্ধী বা ভিন্নভাবে সক্ষম মানুষকে আমরা আমাদের মত করে ভাবতে পারিনা । তাদের কষ্ট, চাওয়া-পাওয়াকে গুরুত্ব দেইনা । তাদের প্রান্তিক করে রাখি, লুকিয়ে রাখি, বঞ্চিত করি সব অধিকার থেকে । আমরা যারা নিজেদের ‘ সক্ষম ’ বলে মনেকরি, প্রকৃতপক্ষে আমরাই সবচেয়ে ‘ অক্ষম ’ এবং এটা প্রমাণিত ।

ছবি: গুগল