প্রতিশোধ নয় মৃত্যু নয় আমি যেন মানুষের পক্ষে থাকি

সালাহ্ উদ্দিন শৈবাল

নিউজিল্যান্ডের ছোট্ট শহর মরিন্সভিল। মাত্র হাজার সাতেক মানুষের বসবাস। আর দশটা ফার্ম শহরের মতোই কিছু দুগ্ধ খামার, কয়েকটা রাস্তা, দোকান-পাট…একটা সাদা-কালো ছোপ ছোপ বিরাট গাভীর মূর্তি..ব্যস শহর শেষ। একটা মজার ডকুমেন্টারী দেখছিলাম। এই শহরের লোকজনকে প্রশ্ন করা হচ্ছে.. ‘শহরে দেখার মতো কি আছে?’ স্থানীয় অধিবাসীরা থমকে যাচ্ছে। উত্তর দিতে পারছে না। ভাবছে..কি বলবে। উপস্থাপক মজা করে বলছে, ‘একটা লন্ড্রী আছে!!…যাদের ওয়াশিং মেশিন নেই তারা এখানে যেতে পারেন।’

আসলেই দেখার মতো কিছু ছিলো না এই গ্রামের মতো ছোট্ট টাউনশীপে। না..ভুল বললাম। এই শহর থেকে দেখা যায় ২২ কিলোমিটার দূরের পাহাড়….মাউন্ট টি আরোহা। সাড়ে নয়শো মিটার উঁচু। পায়ে হাঁটা ট্র্যাক আছে। ঘন্টাখানেকে পাহাড়ের চুড়ায় পৌঁছে যাওয়া যায়। গল্পে আছে এই অঞ্চলের আদিবাসীদের কিংবদন্তী চরিত্র রাহিরি এই পাহাড়ে উঠেছিলেন। চুড়ায় পৌঁছে রাহিরি যখন সামনের আদিগন্ত বিস্তৃত নিজের জন্মভুমি অবলোকন করেছিলেন…প্রগাঢ় ভালোবাসায় আপ্লুত হয়েছিলেন। সেই থেকে এই পাহাড়ের নাম টি আরোহা। আদিবাসীদের ভাষায় Aroha মানে ‘ভালাবাসা’..সেই থেকে এই পাহাড় place of love।

জেসিন্ডা বড় হয়েছেন মরিন্সভিলে। মাউন্ট টি আরোহায় তিনি কি উঠেছিলেন? হয়তো। জানিনা। কিন্তু এই গত বছর জুন মাসে যখন তিনি মা হলেন তার মেয়ের নাম রাখলেন Neve Te Aroha।

খুব সামাজিক বা পার্টি-টার্টি করা মেয়ে তিনি ছিলেন না। দীর্ঘদিন চার্চের সক্রিয় সদস্য ছিলেন। তারপর ছেড়ে দিয়েছেন। বাবা পুলিশ আর মা স্কুলে কাজ করতেন। মাত্র ৩৭ বছর বয়সে হয়ে গেলেন নিউজিল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী! দুম করে হননি। ধাপে ধাপে রাজনীতি করেই দেশের সবচেয়ে ক্ষমতাশালী এই পদ তিনি অর্জন করেছেন।

এক সময় ব্রিটেনে টনি ব্লেয়ারের পলিসি এ্যাডভাইজার হয়ে কাজ করেছেন। ইরাক আক্রমন নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট হওয়ার পরদিনই ২০১৭ সালের উইমেন মার্চে অংশগ্রহণ করেছেন।

ক্রাইস্টচার্চের ভয়াবহ ঘটনায় ভয় আর আতংকের স্রোত ছড়িয়ে গেলো নিউজিল্যান্ড থেকে দূর-দূরান্তে। সেই সময় মরিন্সভিলের জেসিন্ডা দাড়িয়ে গেলেন মাউন্ট টি আরোহার চুড়ায়। দৃঢ় আর শক্ত গলায় বিশ্বকে জানিয়ে দিলেন…”

“To the people who did this: you may have chosen us, but we UTTERLY reject and condemn you.”

পরিষ্কার গলায় সাদা শ্রেষ্ঠত্বের অভিশাপের কথা বললেন। সন্ত্রাসকে প্রত্যাখান করলেন।

আমরা জানি পৃথিবী ভালো নেই। কখনো হতাশ হয়ে যাই। ঘৃণা, বিভাজন আর প্রতিশোধের বিষ বাস্প দেখতে ভালো লাগে না…দেশে -বিদেশে…সমাজে পরিবারে। সেই সময় কিছু মানুষকে দাড়িয়ে যেতে দেখি। দেখি কেউ একজন প্ল্যাকার্ড হাতে মসজিদের সামনে দাড়িয়ে আছে..তাতে লেখা, ‘আমি খ্রীস্টান। তোমরা প্রার্থনা করো। আমি তোমাদের পাহারা দেব।’ শোক বিহ্বল ক্রাইস্টচার্চের সকল জিউস সিনাগগে প্রার্থনা বন্ধ ঘোষনা করা হয়। সহমর্মী হয়। এক সাদা মহিলার কথা শুনি। সে তার নিজের গাড়ীতে করে আহত মানুষদের হাসপাতালে নিয়ে গেছে। ক্রাইস্টচার্চের মসজিদের সামনে ফুলে ফুলে ভরে গেছে। প্ল্যাকার্ডে প্ল্যাকার্ডে ভরে গেছে। তাতে লেখা ‘You are US’….।

ডুবতে বসা এই পৃথিবীতে আমি এই সব মানুষদের শ্রদ্ধা জানাই। জেসিন্ডা আর্ডার্নকে শ্রদ্ধা জানাই। মনে মনে প্রতিজ্ঞা করি কখনো যদি আমাকে এই সব মানুষদের পাশে দাড়াতে হয় তখন আমি যেন অন্ধকারে হারিয়ে না যাই। আমি যেন এই ভালোবাসার প্রতিদান দিতে পারি। প্রতিশোধ নয়…মৃত্যু নয়…আমি যেন জীবনের পক্ষে থাকি। মানুষের পক্ষে থাকি।