প্রথমবারের মত ব্রাইটন ও ব্রিকলেন যাওয়া

ঊর্মি রহমান

লেখক, সাংবাদিক উর্মি রহমান প্রাণের বাংলার জন্য লিখছেন দূরের হাওয়া বিভাগে জীবনস্মৃতি; ‘মনে পড়ে’। তার শৈশব, কৈশোর জীবনের বয়ে চলা পথের গল্পগুলো এই ধারাবাহিক জুড়ে থাকবে। উর্মি রহমান দীর্ঘ সময় বাংলাদেশে সাংবাদিকতা করেছেন। কাজ করেছেন বিবিসি বাংলা বিভাগেও। এখন বসবাস করেন কলকাতায়।

লন্ডনে গুছিয়ে বসার পর বিনুকে চিঠি লিখলাম। বিনু মানে সীমিন মাহমুদ, আমার সম্পর্কীয় বোন এবং তার চেয়ে বড় কথা, আমার খুব কাছের বন্ধু। ছোটবেলা থেকে বলতে গেলে একসঙ্গে বড়

আমি বিনু আর আমাদের পুত্ররা

হয়েছি, আমরা সমবয়সীও বটে। ওর স্বামী প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ ড. ওয়াহিদউদ্দন মাহমুদ সাসেক্স বিশ্ববিদ্যালেয়ে ছিলেন তখন। ওরা ব্রাইটনে থাকতো। সঙ্গে সঙ্গে ওর জবাব এলো। লিখলো, ‘উইকেন্ডে তুই রূপককে নিয়ে চলে আয়।’ আমি শুক্রবার কাজ সেরে ট্রেনে চাপলাম। ওরা দু’জন স্টেশনে এসেছিলো। সঙ্গে ওদের বড় ছেলে বাররো আর পুশ চেয়ারে ছোট ছেলে নাভুকে নিয়ে।

সমুদ্রের ধারের এই চমৎকার শহরটির রাস্তাঘাট উঁচুনীচু। আমরা হেঁটে টিলার গায়ে ওদের বাসস্থানে গেলাম। রূপকের সঙ্গে বাররো আর নাভুর জমতে সময় লাগলো না। বিকালে সমুদ্রের ধারে বেড়াতে গেলাম। দু’টো দিন খুব ভাল কাটলো। আবার ট্রেন ধরে লন্ডনে ফিরে এলাম। তারপরও অনেকবার গিয়েছি। যখন ওয়াহিদভাইর ওখানকার মেয়াদ শেষ হলো, তখন ওরা আমার সঙ্গে বেশ কিছুদিন কাটিয়েছিলো। আমি ততদিনে কাদের ভাইর বাড়ি ছেড়ে কাছেই একটি বাড়ি ভাড়া নিয়েছিলাম। আমার সঙ্গে থাকতো বিবিসির বুলগেরিয়ান সেকশনের একজন সহকমীর্, রোজা হেইজ। বিনু, ওয়াহিদ ভাই আর বাররো-নাভু এসে ছিলো। ওরা মাঝে ইউরোপ বেড়াতে গেলো। আমার ক’দিন সময় খুব ভালো কেটেছিলো। পরে ওরা দেশে ফিরে গেলো। তারপরেও বিনু আর ওয়াহিদ ভাই নানা কনফারেন্স বা সভায় যোগ দেবার জন্য বিলেত এসে আমার কাছেই উঠতেন।

বিনুর একবার ইতালীতে দু’টি কনফারেন্স ছিলো, মিলান আর রোমে। মাঝখানে কয়েক দিনের ব্যবধান ছিলো। ও উদ্যোক্তাদের বলেছিলো, ‘আমাকে মাঝে লন্ডন যাবার টিকেট দিলে আমি আসবো।’ রূপক কাকে যেন একদিন গল্প করছিলো, ‘মায়ের এক বোন আছে, সেই বিনু খালা এলে মা আর খালা খুব বেড়ায় আর আইসক্রিম খায়।’ বিনু বলতো, ‘তুই লন্ডনে আছিস্, সেটা আমার জন্য এখানে আসার একটা বড় ইনসেনটিভ।’ ওয়াহিদভাইও অনেকবার এসেছেন। তিনি এলেও গল্পে-আড্ডায় সময় খুব ভাল কাটতো। তাঁর রসবোধ আমাদের আনন্দ দিতো। বিনু আজ আর আমাদের মধ্যে নেই, কিন্তু ওয়াহিদভাইর সঙ্গ এখনো উপভোগ করি আমরা। বিনুকে খুব মিস্ করি। ও শুধু আমার বোন ছিলো না, বন্ধুও ছিলো। আমরা দু’জন মনের সমস্ত কথা পরস্পরকে বলতে পারতাম।আজ তাই ওর অভাব খুব অনুভব করি।

এদিকে কাজ চলছে। আমাদের সঙ্গে অনুষ্ঠান করতে আসতেন দুই বাংলা থেকে আসা অনেকে, হয়ত পোস্ট-ডক্টরাল করতে আসা অনেকে এসেছেন বা অন্য কোন কারণে। লন্ডন প্রবাসী বিখ্যাত ব্যক্তিরাও আসতেন, যেমন আব্দুল গাফফার চৌধুরী কিংবা ফেরদৌস কোরেশী। সেই সময় শ্যামলদা ও গাফফার ভাইর মস্তিষ্কপ্রসূত একটি অনুষ্ঠানমালার কথা ভাবা হলো, সেটা হচ্ছে বিলেত প্রবাসী বাঙালিদের জীবন ও জীবিকা নিয়ে। আমাকে আর দীপায়নকে দায়িত্ব দেওয়া হলো। সম্ভবত: সেটা ছিলো বিবিসি বাংলা বিভাগের প্রথম সিরিজ অনুষ্ঠান। সেই সময় আরো একজন বিখ্যাত এবং অত্যন্ত চমৎকার মানুষের সঙ্গে আলাপ হলো – তিনি হচ্ছেন তোসাদ্দুক আহমেদ।

একটা শপে দীপায়নের সঙ্গে আমি

বাম ভাবধারায় দীক্ষিত তোসাদ্দুক ভাই আমাদের খুব সাহায্য করেছিলেন। আমরা প্রতি সপ্তাহে ব্রিকলেন যেতাম। এবার ব্রিকলেন সম্পর্কে একটু বলা দরকার। ব্রিকলেন নামের রাস্তার ওপর অনেক বাঙালি তথা বাংলাদেশীর বসবাস এবং ব্যবসা-বাণিজ্য ইত্যাদি। সেখানে গেলে আপনারা দেখতে পাবেন রাস্তার নামের ফলকে ইংরেজির পাশাপাশি বাংলা লেখা। আমি সেখানে প্রথম পা রাখার বেশ কিছু সময় পরে ঐ এলাকার বারা কাউন্সিল টাওয়ার হ্যামলেটস্ এই এলাকার নাম ‘বাংলা টাউন’ ঘোষণা করে, যেমন আছে চায়না টাউন। এখানে প্রতি বছর বৈশাখী মেলা হয়, তবে সেটা বৈশাখ মাস বা এপ্রিলে নয়, মে মাসের দিকে, যখন আবহাওয়া একটু ভাল হয়, ঠা-া কমে যায়। এই মেলার কথায় পরে আসা যাবে। আমি আর দীপায়ন এই অঞ্চলে ঘুরে তথ্য সংগ্রহ করে, সাক্ষাৎকার নিয়ে সাজিয়েছিলাম আমাদের বারো পর্বের অনুষ্ঠান, যার নাম ছিলো ‘ব্রিকলেন’। পরে এই স্ক্রিপ্টের ভিত্তিতে আমার একটি বই বের হয়, যার নাম ‘ব্রিকলেন: বিলেতের বাঙালিটোলা’। নামটি দিয়েছিলেন আমার সিনিয়র সহকর্মী নিমাই চট্টোপাধ্যায়। বইটির শেষ অধ্যায়ে আছে আমার ও নিমাইদার কথোপকথন, ব্রিকলেনকে নিয়ে। একদিন ব্রিকলেন রাস্তাটির এ মাথা থেকে ও মাথা হেঁটে আমরা সেটি তৈরী করি। অত্যন্ত প-িত এই মানুষটির কথা পরে আরো বলছি, যিনি আজ আর আমাদের মধ্যে নেই।

ছবি: লেখক


প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না, তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]


https://www.facebook.com/aquagadget
Facebook Comments Box