প্রথম ব্ল্যাক হোলের ছবি

সাইফ তনয় (টেক ব্লগার)

গত ৫০ বছর ধরে জ্যোতি বিজ্ঞানীরা ব্ল্যাক হোলের ছবি তোলার চেষ্টা চালিয়ে আসছেন। ডার্ক এনার্জি ও ডার্ক ম্যাটার এবং ব্ল্যাক হোলসহ মহাবিশ্বের সব শক্তির উৎস মানুষের চোখে দেখা ও জানা সম্ভব হয়নি। ব্ল্যাক হোল সরাসরি দেখার প্রাণান্তকর চেষ্টায় শেষ পর্যন্ত এর ছবি ধারণ সম্ভব হয়েছে। প্রথমবারের মতো ব্ল্যাক হোলের ছবি প্রকাশিত হয়েছে। এএইচটি এই প্রথম সরাসরি ব্ল্যাক হোলের ছবি ধারণ করেছে। গত বুধবার (১০ এপ্রিল) ইভেন্ট হরাইজোন টেলিস্কোপ এস্ট্রোনোমার্স এই ছবি প্রকাশ করে। তারাই এ ছবিটি তুলেছে। এর ফলে বিশ্ববাসী প্রথমবারের মতো ব্ল্যাক হোলের প্রকৃত ছবি দেখতে পেলো। এ যাবৎ যেসব ছবি প্রকাশ করা হয়েছে- সেগুলোতে শিল্পীর কল্পনা এবং কম্পিউটারের ব্যবহার করা হয়েছে।

কেটি বউম্যান

৫০ লক্ষ কোটি আলোকবর্ষ দূরে M87 গ্যালাক্সির কেন্দ্রে রয়েছে এই বিশাল ব্ল্যাক হোল। যার ব্যাস ৪,০০০ কোটি কিলোমিটার। ব্ল্যাকহোলের ছবি ধারণ করার জন্য কোনো একক টেলিস্কোপ যথেষ্ট শক্তিশালী নয়, তাই ইন্টারফেরোমেট্রি নামক একটি কৌশল ব্যবহার করে আটটি টেলিস্কোপের একটি নেটওয়ার্ক তৈরি করা হয়। টেলিস্কোপের থেকে পাওয়া তথ্য যুক্তরাষ্ট্র এবং জার্মানির সেন্ট্রাল প্রসেসিং সেন্টারের শত শত হার্ড ড্রাইভে রাখা হয়। টেলিস্কোপের এসব তথ্য থেকেই প্রকাশের উপযোগী ছবি তৈরি করা হয় ড. বউম্যানের অ্যালগরিদমের মাধ্যমে। অর্থাৎ, টেলিস্কোপের তথ্যকে ছবিতে রূপান্তর করা হয় অ্যালগরিদমের সহায়তায়। অ্যালগরিগমের ফলাফলগুলোর সত্যতা নিশ্চিতে বিজ্ঞানীদের চারটি পৃথক দল তা বিশ্লেষণ করে। ২০১৭ সালের এপ্রিলে এই তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছিল। আমাদের নিকটম ব্ল্যাকহোল পৃথিবী গতে ২৮,০০০ আলোক বর্ষ দূরে। ১ আলোক বর্ষ = এক বছরে আলো যেটুকু দূরত্বে যায়। অর্থাৎ ৫,৮৮০,০০,০০,০০০ মাইল (পাঁচ হাজার আটশ’ আশি কোটি মাইল) বা ৯,৫০০,০০,০০,০০০ কিলোমিটার (নয় হাজার পাঁচশ’ কোটি কিলোমিটার)। এই হিসেবের সাথে গুণ করুন ২৮,০০০ আলোক বর্ষ!

ডা. বউম্যান বলেন, ‘ফলাফল বিশ্লেষণে আমাদের জ্যোতির্বিজ্ঞানী, পদার্থবিজ্ঞানী, গণিতবিদ এবং প্রকৌশলীদের একটি দল এতোদিন যা অসম্ভব মনে করা হতো সেটি অর্জন করতে পেরেছে।’

ইউরোপিয়ান স্পেস এজেন্সি এবং ব্ল্যাক হোল সনাক্তকরণে এলআইএসএ’র (লেসার ইন্টারফেরোমিটার স্পেস এন্টেনা) প্রজেক্ট সায়েন্টিস্ট পল ম্যাকনামারা বলেছেন, ‘বহু বছর ধরে আমরা পরোক্ষভাবে বস্তুসমূহের পুঞ্জিভূত অবস্থার প্রমাণ পেয়েছি’ এলআইএসএ মিশন এখন মহাকাশের ম্যাসিভ ব্ল্যাক হোল সনাক্ত করবে।  ২০১৫ খ্রিষ্টাব্দের সেপ্টেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রের লিগো (এলআইজিও, লেসার ইন্টারফেরোমিটার গ্রাভিটেশনাল- ওয়েভ অবজারভেটরি) গভীর মহাকাশে দুইটি ব্ল্যাক হোলের সংঘর্ষ ও একীভূত হওয়ার ঘটনা পর্যবেক্ষণ করে।

ম্যাকনামারা বলেন, সরাসরি দেখতে না পেলেও একসঙ্গে রেডিও ওয়েব, লাইট এবং গ্রাভিটেশনাল ওয়েব ব্ল্যাক হোলের অস্তিত্ব নিশ্চিত করে, যদিও আমরা তা কখনোই সরাসরি দেখতে পাইনি।’  এই প্রথম আমাদের মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সির কেন্দ্রে প্রচণ্ড উজ্জ্বল ও ঘনীভূত এলাকায় সরাসরি ব্ল্যাক হোল প্রত্যক্ষ করা সম্ভব হয়েছে।

ব্ল্যাক হোলের চারদিকে ঘূর্ণায়মান বস্তুপুঞ্জের ভর আমাদের সূর্যের চেয়ে চল্লিশ লাখ গুণ বেশি এবং এই বস্তুপুঞ্জ ২৪ মিলিয়ন কিলোমিটার জুড়ে ছড়িয়ে আছে। গ্যালাক্সির ওই কেন্দ্র থেকে পৃথিবীর দূরত্ব ২৬ হাজার আলোকবর্ষ (২৪৫ ট্রিলিয়ন কিলোমিটার)। পৃথিবীর টেলিস্কোপ থেকে গ্যালাক্সির কেন্দ্রে ঘনীভূত বস্তুপুঞ্জের মাঝে ব্ল্যাক হোল ছবিতে হবে চাঁদের ওপর একটি গলফ বল।

ম্যাকনামারা বলেন, ব্ল্যাক হোলের সরাসরি ছবি তোলার মাধ্যমে আলবার্ট আইনস্টাইনের সাধারণ আপেক্ষিক তত্ত্বের ধারণা প্রমাণিত হলো। বিশ্বব্যাপী প্রশংসায় ভাসছেন ২৯ বছর বয়সি এক বিজ্ঞানী, তার অ্যালগরিদমের কারণেই মহাবিশ্ব গবেষণার ইতিহাসে প্রথমবারের মতো কৃষ্ণগহ্বরের (ব্ল্যাক হোল) ছবি প্রকাশ সম্ভব হয়েছে। কেটি বউম্যান নামের এই বিজ্ঞানী একটি অ্যালগরিদম (কম্পিউটার প্রোগ্রামিং) তৈরিতে নেতৃত্বে দেন, যা ব্ল্যাক হোলের ছবি প্রকাশের বিষয়টিকে সম্ভব করেছে।

এই অ্যালগরিদম তৈরির কাজ কেটি বউম্যান শুরু করেছিলেন তিন বছর আগে, তখন তিনি ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজিতে (এমআইটি) গ্র্যাজুয়েট শিক্ষার্থী ছিলেন। সেখানে প্রকল্পটি তিনি পরিচালনা করেন এমআইটি কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স ল্যাবরেটরি, হার্ভার্ড-স্মিথসোনিয়ান সেন্টার ফর অস্ট্রোফিজিকস এবং এমআইটি হায়স্টাক অবজারভেটরির একটি দলের সহায়তায়। ২৩ বছর বয়সে তিনি গবেষণা দলটির সঙ্গে যুক্ত হোন এবং ২৬ বছর বয়সে নেতৃত্ব দেন।

ব্ল্যাক হোলের প্রথম ছবি নিয়ে অনুভূতি প্রকাশ করে বিবিসি রেডিও ফাইভকে ড. বউম্যান বলেন, ‘আমরা এটি প্রথমবার দেখেছি, আমরা সবাই অবিশ্বাসে ছিলাম। এটি বেশ দর্শনীয় ছিলো।’ তিনি আরো উল্লেখ করেন, ‘আমরা সত্যিই ভাগ্যবান যে সহায়ক আবহাওয়া পেয়েছি… আমরা আরো নানা দিক থেকেই ভাগ্যের সহায়তা পেয়েছিলাম।’ ব্ল্যাক হোলের প্রথম ছবি প্রকাশের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই সামাজিকযোগাযোগ মাধ্যমে এই বিজ্ঞানীর নাম ও কাজ ভাইরাল হয়। রাতারাতি আন্তর্জাতিক তারকা বনে যান তিনি। সামাজিকযোগাযোগ মাধ্যমে ভূয়সী প্রশংসা পেয়েছেন ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি এবং হার্ভার্ড-স্মিথসোনিয়ান সেন্টার ফর অস্ট্রোফিজিকস থেকে।

এমআইটি’র কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স ল্যাব লিখেছে, ‘৩ বছর আগে এমআইটি’র গ্র্যাজুয়েট শিক্ষার্থী কেটি বউম্যান ব্ল্যাক হোলের প্রথম ছবি প্রক্রিয়াকরণের জন্য একটি নতুন অ্যালগরিদম তৈরির নেতৃত্ব দেন। আজ, সেই ছবিটি মুক্তি পেয়েছে।’

তথ্য ও ছবি: গুগল