প্রশান্ত মহাসাগর পাড়ি

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

পোস্টবক্স। ফেইসবুকের একটি জনপ্রিয় গ্রুপ। এবার প্রাণের বাংলার সঙ্গে তারা গাঁটছড়া বাঁধলেন। প্রাণের বাংলার নিয়মিত বিভাগের সঙ্গে এখন থাকছে  পোস্টবক্স-এর রকমারী বিভাগ। আপনারা লেখা পাঠান পোস্টবক্স-এ। ওখান থেকেই বাছাইকৃত লেখা নিয়েই হচ্ছে আমাদের এই আয়োজন। আপনারা আমাদের সঙ্গে আছেন। থাকুন পোস্টবক্স-এর সঙ্গেও।

সুজল আহমেদ তালুকদার

 ড্রাগ, মার্ডার আর ভিন্ন ভিন্ন মাত্রার অপরাধ বললেই বুঝে নিবেন কলম্বিয়া। আমরা যখন বুয়েনাভেনচুরা পোর্টে ঢুকবো তখন বেশ ভয়ে ভয়ে ছিলাম, বাইরে কি যাবো নাকি যাবো না। লাতিন আমেরিকা মানেই আমাদের কাছে ফুটবল মনে হলেও না দেখা ব্যাপারগুলি অনেক জটিল আর ভয়ংকর। দ্যা ম্যাজেশিয়ান বলে একজন মানুষ ছিলেন এ কলম্বিয়ার। যার পুরো নাম পাবলো এমিলো এসকোবার গাভিরিয়া। কোকেন কিং বলে যার পরিচিতি বলে দিতে হয় না। একসময় এ তল্লাটে রাষ্ট্রপ্রধান থেকে বিচারক সবাইকে মৃত্যুভয় দাবরে বেড়াতো, যার পিছনে ছিলেন এই কোকেন কিং।

পোর্টে ঢোকার আগেই কোস্টলাইন ধরে আমরা যখন এগিয়ে চলছি, দূরে পুরোটা কোস্টজুড়ে সারিসারি পাহাড়। খুব বেশী উচু নয়, আবার একেবার সিলেটের টিলার মতোও নয়। এ পাহাড়গুলি ধীরে ধীরে মূল ভুখন্ডের দিকে গিয়ে উচু হয়েছে। সব পাহাড়ই বেশ সবুজ। একসময় এই সবুজের মানে ছিলো ভিন্ন। এই পাহাড়গুলিতে চাষ হতো কোকা। ইতিহাস বলে কোকা পাতা দিয়ে একরকম চা হতো, আর সেই জাদুকরী চা পাহাড়ের উচুতে ওঠার ক্লান্তি দূর করে দিতো। একধরনের পাহাড়ী শক্তি চলে আসতো কোকা চায়ে। আর সেই পাতা থেকেই একসময় আবিষ্কার হয়ে গেলো কোকেন। পৃথিবীর দিকে দিকে ছড়িয়ে পড়লো এক অতি ভয়ানক মাদক কোকেন। সারা পৃথিবীতে প্রতিদিন পনেরো টন কোকেনের চালান দিতে হতো কিং এসকোবারকে।

আন্দিজ পর্বতের কোলে মেডিলিন শহর কাঁপিয়ে দাপিয়ে এসকোবার কোকেন পাঠাতো আমেরিকায়। মেক্সিকোতেই ছিলো তার প্রায় একশত ডিলার ডিস্ট্রিবিউটর। প্রতিদিন বিমানে করে সবুজ নোট, মিলিয়ন ডলার ফিরতি পথে আসতো মেডিলিনে। এমনও সময় গেছে মিলিয়ন মিলিয়ন ডলার মাটির নিচে পুতে রাখতে হতো এ কলম্বিয়ায়। একবার তো কোন এক শীতের রাতে এসকোবার যখন পালিয়ে পাহাড়ে আশ্রয় নিলেন,
সে রাতে মেয়েকে শীতের হাত থেকে বাঁচাতে দু‘মিলিয়ন ডলার পুড়িয়ে আগুনের আঁচ দিয়ে একটু কমফোর্ট দিলেন মেয়েকে। নিজের মানুষগুলিকে খুব বেশী ভালোবাসতেন, কিন্তু সেটা পৃথিবী ধ্বংস করে।

আমরা যে পাহাড়গুলি দেখছি এটাই আন্দিজ, আন্দিজের শুরুটা কলম্বিয়ায়, ইকুয়েডরে। শেষ হয়েছে গিয়ে পাতাগোনিয়ায়। কি নেই এই পাহাড়ে! পৃথিবীকে অনেককিছু দিয়েছে এ পাহাড়। শুধু কোকেনই নয় আলু আর টমেটোর উৎসস্হলও এই আন্দিজ পর্বতমালা। ৭৫০০ কিলোমিটার দীর্ঘ এ পর্বতমালা। কলম্বিয়া, ইকুয়েডরে যার শুরু। পেরু, চিলি আর বলিভিয়া হয়ে আর্জেন্টিনার শেষ মাথায় গিয়ে পাতাগোনিয়ায় তার যবনিকা।

ইকুয়েডরের মানতায় গিয়ে কয়েকবছর আগের কথা মনে পরলো। আমরা সে সময় নিয়মিত যেতাম গয়াকিল বন্দরে। নদীপথে জাহাজ নিয়ে অনেকটা পথ পেরিয়ে গয়াকিল বন্দর। জাপানিজ এন ওয়াই কে’ র জাহাজ, ফ্রুটসেলার জায়ান্ট ডোল কম্পানি চার্টার করে চালাতো। গয়াকিল থেকে লোড হতো হাজার হাজার টন কলা। এ বিশাল কলার চালান চলে যেতো ইউরোপে। খুব সাদা চোখে দেখলে এতে কোন জটিলতা নেই।

কিন্তু এ বন্দরে এলেই টপফোর ছাড়া আর কাউকে বাইরে যেতে দেয়া হতোনা। এটা কোম্পানির অলিখিত কিন্তু অবশ্যপালনীয় নির্দেশ। আমি আর কাপ্তানসাহেব একসঙ্গে বাইরে যেতাম। তবে খুব একটা কমফোর্টেবল শোরলিভ হতো না এ ইকুয়েডরে। কেমন একটা ভয় ভয় ব্যাপার ছিলো মনে। কখন কোন ড্রাগডিলারের নজরে পরে যাই তার কোন ঠিক নেই।

ভয়ের কারনটা তাহলে বলেই ফেলি। একবার আমাকে জিব্রাল্টার থেকে সাউদার্ন হারভেস্ট নামে এক জাহাজে জয়েন করতে হলো। সেবার প্রায় চারদিন অপেক্ষা করতে হয় জিব্রাল্টারে। আমার জয়েনিং সব ঠিকঠাকই ছিলো, কিন্তু গোল বাধালো স্পেন পুলিশ। জাহাজ জিব্রাল্টারে আসার আগের দিন স্পেনে এরেস্ট হলো।

স্পেন পুলিশের কাছে বিশেষ খবর জাহাজে কোন এক বা দুইজন ক্রু প্রায় ৬০ কেজির কোকেন চালান নিয়ে এসেছে। রাতেই বন্দরে পৌছলে শীপের সবাইকে শীপএরেস্ট করা হয়। তারপর চলে শীপের আনাচে কানাচে তল্লাশি। অবাক করার মতোই পাওয়া যায় ৬০ কেজি কোকেন।
পরেরদিন আরও ব্যাপক তল্লাশির বার্তা দিয়ে পুলিশ পাহারা বসায় শীপে।

আসলে চালান নিয়ে এসেছিলো শীপের ফিলিপিনো বোসন, তার সঙ্গে ছিলো পুচকে এক ছেলে, ডেক ক্যাডেট। ও বলে রাখি জাহাজের বোসন মানেই সারেং, সারেং বউয়ের সারেং । টাকা দেখে ফেলায় এই ক্যাডেটকে সঙ্গে নিতে হয় বোসানের। কিন্তু পুলিশের অভিযানে বেশ ভয় পেয়ে যায় ক্যাডেট। শেষমেশ জেল আর শাস্তির ভয়ে কেবিনের পোর্টহোল খুলে লাইফবোটের প্রপেলারে ফাঁস লাগায় ফিলিপিনো ক্যাডেট।

ঘটনা আরো জটিল হয়ে পরায় চারদিন পরে শীপ ছাড়া পেয়ে আসে জিব্রাল্টারে, তারপরে আমি উঠি সেই জাহাজে। আমার কেবিনের পোর্টহোল দিয়ে দেখা যায় লাইফবোট, ভয়ে ঘুম আসে না আমার। এভাবেই কেটে যায় কয়েকটা দিন। ঐ জাহাজেই শুনেছি কোকেনের বড় বড় চালান পাচার হতো এসব রিফার শীপে, ক্রুদের অজান্তেই।

আরেকবারতো আমার শীপ থেকেই কলা ডিসচার্জ হওয়ার পরে আমরা যখন আটলান্টিকে, তখন খবর এলো সেই কলার চালানে দু‘শো কেজি কোকেন ছিলো। কোম্পানি আরও কঠোর হলো। কেউ যেনো সরে না যায় তার কঠিন নির্দেশ এলো। এরপর ইকুয়েডরে আমাদের বাইরে যাওয়াই পুরো বন্ধ হলো।

সেই ইকুয়েডরে যখন এবার গেলাম তখন মনে পরে গেলো পুরোনো স্মৃতি। সেই ইকুয়েডর যেখানে ড্রাগ আর মার্ডার খুব সহজ কাজ। নারীরা যেখানে খুব নির্মমভাবে ব্যবহৃত হয়। হত্যা আর রেপ যেখানে নিত্যঘটনা। শুধু ইকুয়েডর নয় কলম্বিয়ায় এমন কতো কতো ভয়ংকর কাহিনী আছে বলে শেষ করা যাবে না। তারপরেও এখানকার সাধারন মানুষদের বেশ ভালো মনে হয় আমার কাছে। ওরা আমুদে, জীবনটাকে উপভোগ করে হৃদয় খুলে। শ্রেণীবৈষম্যের দেয়াল ওদের চারপাশে। একদল মাফিয়া, একদল রাজনীতিবিদ ঠিকই কলম্বিয়াকে ব্যবহার করে, আর সাধারন মানুষেরা ব্যবহৃত হয়।
আন্দিজের মানুষগুলি যুগযুগ ধরে টিকে আছে সংগ্রাম করে। কোকা পাতার চা ওদের ঐতিহ্য, কোকেন নয়, এটা ওরাই বলে। কফিবিন ওদের প্রাইড, ড্রাগ নয়। ফুটবলটাও বেশ ভালোই খেলে, হারজিত তো মামুলি ব্যাপার। কোকেন কিং এসকোবারের জীবন আর কোকেনের সাম্রাজ্য নিয়ে একটি টিভি সিরিয়াল আছে, খুব জনপ্রিয়। দেখলে আঁচ করতে পারবেন কলম্বিয়া কি জিনিস, এসকোবার কে ছিলেন, সিরিয়ালটির নাম – নারকোস “Narcos” যদি হাতে সময় থাকে ইউ ক্যান ওয়াচ এন্ড লার্ন কলম্বিয়া।

কিছু সিক্রেট তবে বলেই ফেলি, রিফার শীপগুলি প্রতিবার ফিরতি পথে পুর্তোরিকোর সানজুয়ান পোর্টে কিছু কন্টেইনার ডিসচার্জ করতো। আবারো বলি সাদা চোখে দেখলে কোনকিছুই না। কিন্তু এ কন্টেইনারগুলির ডেস্টিনেশন ছিলো এমেরিকা, ফ্লোরিডা নয়তো হিউস্টন। হয়তো হবে নয়তো না, কে জানে কন্টেইনারের ভিতরের খবর!!! এখন যেমন আমরা জানতেই পারিনা ইয়াবা কেমনে আসে আমাদের ঢাকায়। সে কি বদি নাকি নদীর হাত ধরে!!

ছবি: লেখক

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]