প্রশান্ত মহাসাগর পাড়ি

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

পোস্টবক্স। ফেইসবুকের একটি জনপ্রিয় গ্রুপ। এবার প্রাণের বাংলার সঙ্গে তারা গাঁটছড়া বাঁধলেন। প্রাণের বাংলার নিয়মিত বিভাগের সঙ্গে এখন থাকছে  পোস্টবক্স-এর রকমারী বিভাগ। আপনারা লেখা পাঠান পোস্টবক্স-এ। ওখান থেকেই বাছাইকৃত লেখা নিয়েই হচ্ছে আমাদের এই আয়োজন। আপনারা আমাদের সঙ্গে আছেন। থাকুন পোস্টবক্স-এর সঙ্গেও।

সুজল আহমেদ তালুকদার

দুই.

এই যে ওয়াটার সারফেসে ভেসে বেড়ানো, একবার ভাবুন তো এটা কতোটা গভীর হতে পারে। আমিও একটু ভাবতে বসে গেলাম।
আচ্ছা এখন আছি কোথায়, ব্রীজে গিয়ে একটু দেখে আসলে কেমন হয়।
জাহাজের ব্রীজ হলো সমুদ্রপথে চলাচল করার আধুনিক সব যন্ত্রপাতি ঠাসা,
আর সবসময় অফিসার অন ওয়াচ একজন থাকবেই, সঙ্গে থাকবে একজন এবি, কোয়ার্টার মাস্টার বললে খুব খুশী হয় এরা।
নিজেকে জাহাজ কাপ্তানের চারের একভাগ মনে করেই যেনো এদের সব শান্তি।

ব্রীজে গিয়ে ইলেকট্রনিক চার্ট সিস্টেম একডিসে দেখে নিলাম আমি ও আমরা কোথায়।
আজকাল এই একডিস চলে আসায় খুব সহজ হয়ে গেছে জীবনটা।
এখন আছি যে জায়গাটায় তা সাখাতুন আইল্যান্ড থেকে প্রায় শ’তিনেক নটিক্যাল মাইল দূরে হবে, উত্তর প্রশান্ত মহাসাগরীয় বেসিনের এ জায়গাটা কুরিল কামচাটকা ট্রেঞ্চ বলে পরিচিত।

গভীরতা মাউন্ট এভারেস্টের থেকে সাত’শ মিটারের কিছু বেশী অর্থাৎ সাড়ে ন’হাজার মিটারের একটু বেশী।
কয়েকটি ধাপে ধাপে সমুদ্রটি গভীর হয়েছে, পাঁচ, ছয়, সাত, আট তারপর নয় হাজার মিটারে গিয়ে পৌছে।
প্রশান্ত মহাসাগরের কোথাও কোথাও গভীরতা দশ হাজারের মিটারেরও বেশী।

আচ্ছা, আর্কিমিডিস যে প্লাবনতা সূত্র আবিষ্কার করেছে তার আগে কি মানুষ ভাসতো না!
আমার ধারণা পৃথিবী সৃষ্টির পর মানবজাতির আগমনের পরে পরেই মানুষ ভাসতে শিখেছে।
আমরা হলাম ভাসুইন্যা এলিয়েন।
মাঝেমাঝে মনে হয় আমাদের কোন এক পূর্বপুরুষ হয়তো জলেই বসবাস করতো।
কোন এক দূরের নীহারিকায় জলে ভেসে ভেসেই হয়তো পৃথিবীতে এসেছিলো ভিনগ্রহের মানুষেরা।

প্রশান্ত মহাসাগরের ফিলিপিন্সের কাছাকাছি মারিয়ানা ট্রেঞ্চও আমি কয়েকবার পাড়ি দিয়েছি, অস্ট্রেলিয়ার পূর্ব উপকূলে গেলে এ পথে যেতে হয়।
এ গভীর জায়গাগুলি তেমন ভিন্ন কোন প্রভাব ফেলে না আমাদের সারফেস ফ্লোটিং, জলে ভাসা জীবনে। আমাদের কাছে ৯ থেকে ৯০০০ সবই সমান মনে হয়।

কাল সন্ধ্যায় যখন সুগারু কাইকিও চ্যানেল ক্রস করলাম এর সঙ্গে সঙ্গেই জাহাজটাকে পুরু কুয়াশা ঘিরে ফেললো।
আর শুরু হলো তীব্র ঠান্ডা হাওয়ার প্রবাহ।
ডেকের কোনকিছুই পরিষ্কার দেখা যাচ্ছিলোনা, তারপরে তো সাগর।
ব্রীজে গিয়ে একটু পরখ করার চেষ্টা করলাম নেভিগেশন।
সবকিছু অটোমেটেড, জাহাজ চলছে তার আপন গতিতে।
মনে পড়লো বরিশালের লঞ্চের কথা, শীতের কুয়াশাভরা রাতে এরা সামনে বাঁশ ডুবিয়ে গভীরতার একটা আন্দাজা নিয়ে সামনে আগায় ধীরগতিতে।
আর আমরা চলছি কোন চিন্তা ছাড়াই,
শুধু ক্ষণে ক্ষণে শীপের হর্ণটা বাজাচ্ছে ডিউটি অফিসার এই যা,
যদি ছোট কোন ফিশিং বোট সামনে এসে পড়ে এই ভয়ে।

আজও সারাদিন ঘন কুয়াশার সঙ্গে সূর্যিমামার একটা দফারফা হয়েই গেলো,
ওয়াটার টেম্পারেচার ড্রপস ডাউন টু ফাইভ, আর এয়ার টেম্পারেচার ৬/৮ এ ঘোরাঘুরি করলো।
কুহু কুহু ঠান্ডা যাকে বলে।

কাল সন্ধ্যায় যখন জ্যাকেট পরলাম বৌ বললো দেখছো আমার জ্যাকেটটা কতো কাজে দিলো।
এবার শীপে আসার সময় বললাম জ্যাকেট লাগবে না, এখন তো সামার, আর যাচ্ছি তো নর্দান হেমিস্ফিয়ারেই।

বৌ বললো রাখো তোমার নর্থ সাউথ, প্রতিবার জাহাজে গিয়ে কাইকুই শুরু করো, এটা কিনে দাও না ওটা কিনে দাও না, খালি করো অভিযোগ।
এই নাও জ্যাকেট, বৌয়ের নীল জ্যাকেট।

কে জানতো জুনের প্রথম সপ্তাহেও উত্তর প্রশান্ত আমাকে শীতে কাবু করবে।
ভারী কুয়াশা তুষারপাতের মতো ওয়াটার ড্রপলেট হয়ে ভিজিয়ে দিচ্ছে সবকিছু।
বাইরে কাজ করা মুশকিল এই ওয়েদারে।

এই ওয়েদারটা সবচেয়ে কমফোর্টেবল ইনজিন রুমে।
সেখানে মেশিনপাতি চলতে থাকে বলে তাপমাত্রা  মোটামুটি বিশের আশপাশে থাকে, যদিও পারস্য উপসাগরে গেলে পঞ্চাশ ছুঁইছুঁই করে।
তখন ইঞ্জিন রুম হয়ে যায় জ্বলন্ত উনুন।

জাহাজে আজকাল আর তেমন জমে না,
ইন্টারনেট আসার পর থেকে লোকজন কেমন ঘরকুণো হয়ে গেছে।
সবাই স্মার্ট স্ক্রিনে বসে বসেই সময় পার করে দেয়,
এটাই যেনো এখন পৃথিবীর মানুষের একমাত্র বিনোদন।
মনে পড়ে একসময় স্মোকরুমে জায়গা পাওয়া মুশকিল হয়ে যেতো।
কাপ্তান আর চীফ ইনজিনিয়াররা তাদের বাহিনী নিয়ে বসে যেতো তিনপাত্তি আর মুভির আসরে।

গান বাজতো ধূমতারাক্কা,
আর আমরা বসতাম গোল হয়ে তিনপাত্তি নিয়ে, সবার হাতে বাংলাদেশী দোয়েল পাখি আর শহীদ মিনারওয়ালা দুই টাকার বান্ডিল।
নতুন দুই টাকার নোট সাপ্লাই দিতো আমার বৌ।
যেই আসবে বাংলাদেশ থেকে আসবে তার হাতেই দিয়ে দিবে দু চারটা দু’টাকার বান্ডিল।
সবার কাছে মোটামুটি বাংলা টাকার গোডাউন।
সন্ধ্যা হতেই হুলুস্হুল সব কান্ডকারখানা,
একদল গতকালের খোয়া যাওয়া টাকা উদ্ধারে নব উদ্যোমে ঝাপিয়ে পরে তো আরেকদল আরেকটু দুই টাকার ধনী হওয়ার ধান্দা।
আসলে সবই মজা, দুই টাকার নোটে সারাদিন খেললেও ২০০ টাকা জমা হতো না।
তারপর আবার সাইন অফ হলে টাকা দিয়ে বাড়ী যেতে হতো।

সবচেয়ে মজা ছিলো কেউ ফতুর হয়ে গেলে, ভেড়ার ডাক তারে দেওয়া লাগতোই।
তারপর পাঁচ ডলার এক্সচেঞ্জ করে আবার খেলতে বসো। এক্সচেঞ্জ রেটও সেই, বাংলা রেট যদি থাকতো ৫০ তো দিতাম ৪০, এক্সচেঞ্জ দেই যে এইই বেশী।

তখন তিনপাত্তিতে এতোই মজা পেতাম যে, কাপ্তান স্যারের সঙ্গে ভ্যাঙ্কুভার ক্যাসিনোতে গিয়ে চিপস কিনলাম ১০০ ডলারের।
ভাবটা এমন যে দুনিয়ার সেরা জুয়ারু আসছে আজকে তোমাগো ক্যাসিনোর বারো বাজাতে।
শেষমেষ পকেটের চারশ ডলারের জমা চালান হারিয়ে শপথ নিলাম আর এমুখো হবো না।
স্যার কিন্তু ঠিকই সাতশ ডলার জিতে আমাদের জম্পেশ এক খানাপিনা দিয়েছিলো।

দৌড়ানির গল্প কিন্তু ফুরোবে না, এই ভ্যাঙ্কুভারেই আমরা তিনজন, লোকাল এক মস্তানের ধাওয়া খেয়ে সে কি দৌড়।
স্যার বলে, এই তোমরা আমাকে ফেলে যাও কোই।
আমরা তখন ইয়ং মানুষ, জীবন বাঁচানোর দৌড়ানি একটু জোরেশোরেই দিয়েছিলাম।
স্যার পিছনে পিছনে দৌড়ায় আর চিল্লায়, আরে তোমরা আমার ফালায়ে যাও কই।
আমরা বলি স্যার আইলে আইলে, স্যার ভাবলো তারে মনে হয় ধরেই ফেললো।

আবার ফিরি প্রশান্ত মহাসাগরে,
জাহাজ চলছে ঘন কুয়াশার চাদর ঠেলে ঠেলে,
উত্তর গোলার্ধে গ্রীষ্মের এ সময়টায় এমন শীত শীত একটা ভাব পাওয়া সত্যি ভাগ্যের ব্যাপার।
তার ওপর এমন শীতল, নেই কোনো ঢেউ, নেই কোনো রোলিং পিচিং।
এমন রহস্যময় সাগরে চলতে ভালোই লাগছে, কেমন একটা ভূত ভূতং জাহাজ চলছে প্রশান্তের বুকে।
মাটির পৃথিবীতে বসে আমরা এমন জল সাগরকে অনুভব কি কখনও করতে পারি!
মনে হবে দূরের কোন ছোট্ট গ্যালাক্সিতে ভেসে চলছি অজানা গন্তব্যের দিকে কয়েকজন নভোচারী।  (চলবে)

ছবি: লেখক

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]