প্রশান্ত মহাসাগর পাড়ি 

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

পোস্টবক্স। ফেইসবুকের একটি জনপ্রিয় গ্রুপ। এবার প্রাণের বাংলার সঙ্গে তারা গাঁটছড়া বাঁধলেন। প্রাণের বাংলার নিয়মিত বিভাগের সঙ্গে এখন থাকছে  পোস্টবক্স-এর রকমারী বিভাগ। আপনারা লেখা পাঠান পোস্টবক্স-এ। ওখান থেকেই বাছাইকৃত লেখা নিয়েই হচ্ছে আমাদের এই আয়োজন। আপনারা আমাদের সঙ্গে আছেন। থাকুন পোস্টবক্স-এর সঙ্গেও।

সুজল আহমেদ তালুকদার

তিন.
 দিনরেখার কাছাকাছি বাসায় ফোন দিলে আমার ছোট্ট মেয়ে সুজানা বেশ আগ্রহভরে প্রথমেই জিগ্যেস করবে, বাবা তোমার এখন কয়টা বাজে? আমি মোটামুটি প্রস্তুতি নিয়েই থাকি এ প্রশ্নের উত্তর দেয়ার জন্যে, তারপরেও একটু সময় নিয়েই সঠিক সময়টা বলি। সঙ্গে সঙ্গেই সে আমাকে বলবে আমাদের কিন্তু এখন এতোটা বাজে। ওর কাছে এই দু’টা ঘড়ি আর সময়ের পার্থক্য অনেক বিস্ময়ের একটা ব্যাপার। তারপরে শুরু হবে, তাহলে তো তোমার এখন ঘুমের সময়, তুমি তো ঘুম থেকেও আগে ওঠো, সূর্যোদয়ও তো আগে হয়। আরো কতো জ্ঞানী জ্ঞানী কথা। ওর এই ঘড়ি নিয়ে আমিও চিন্তিত, আজকে সত্যিই ঘড়ির বারোটা বেজে যাবে আমার।

আজ রাতে একঘন্টা এগিয়ে হয়ে যাবে জিএমটি + ১২। তারমানে এটাই পূর্বদিকের শেষ টাইমজোন। এখান থেকেই সূর্যোদয় এবং দিনের শুরুটা কাউন্ট হয়। এই মুহূর্তে আমরা আছি ১৭০ ডিগ্রী পূর্বের একটু পিছনে, আগামীকাল রাতে ১৮০ ডিগ্রী বরাবর আন্তর্জাতিক দিনরেখা পার হবো মোটামুটি ধরে নেয়া যায়। তারমানে আগামীকাল রাতে ঘড়ি বাদ, দিনই যাবে একটা পিছনে। তারমানে ৭ জুন হবে দুইটা এই শীপের ক্যালেন্ডারে।
এইটা আমি কিভাবে বুঝাবো মেয়েকে সেটাই ভাবছি ।

তিনদিন ধরেই ভারী সী-মিষ্ট আর ফগে ঢেকে আছে সমুদ্র, আকাশ সমুদ্র কিছুই দেখা যায় না। কিছুটা রহস্যময় আর বিস্ময় রয়েছে এইবারের সমুদ্রচলায়। আমি একটু পরপর নেভিগেশন ব্রীজে গিয়ে দেখি কি হচ্ছে। নেভিগেটিং অফিসাররা অবশ্য বিন্দাস, ওরা এসব খুব একটা পাত্তা টাত্তা দেয় না। রাডার আর একডিসে দেখলাম তিনটি জাহাজ আমাদের কাছাকাছি মোটামুটি একই স্পীডে একই রুটে চলছে। তবে নামগুলি আমার কাছে খুব পছন্দ হয়েছে। একটা আপন আপন ভাব আছে নামে। সবচেয়ে কাছের জাহাজের নাম মার্সক কোলকাতা, দেখেই কেমন বাংলাদেশে আছি বাংলাদেশে আছি মনে হচ্ছে। স্টারবোর্ডে মানে আমাদের ডানে আছে মার্সক সিউল, পিছনে পিছনে দুবাই অ্যাট্রাকশন। তারমানে পুরাই কোলকাতা, সিউল আর দুবাই নিয়ে আমরা যাইতেছি পূবদিকে। আমাদের নামটা মর্নিং মারগারেটা, মারগারেটা খুব বড়সড় শিপিং বিজনেসওম্যান। ওনাকে পটান্তি দিতেই এই শিপের এই নাম আমার ধারণা।

একটু আগে দেখলাম আমাদের কাপ্তান সাহেবের মন খারাপ। বললো মেক্সিকো দিয়া সে বাড়ী যাবে। আমি বলি এটা তো বহুত আনন্দের সংবাদ।
সে তখন বলে আনন্দ তো ঠিক আছে, কিন্তু দিন রিটার্ডে বেতন তো একদিনের কম পাবো। এতক্ষণে বুঝলাম কি হেতু। আমি একটু তাল দিলাম, অফিসে মেসেজ পাঠিয়ে দেন। কাজ হলেও হতে পারে। এইরকম আব্দার কেউ কখনও করেনি, করে দেখেন হয়েও যেতে পারে। উনি কিন্তু পজিটিভলিই নিয়ে মেসেজ পাঠাবে বলে মনস্হির করছে। ভাগ্য ভালো তাল দেয়ার ব্যাপারটা চীফ ইঞ্জিনিয়ারের এটা কেউ জানলো না।

সেদিন ছিলাম গভীর ট্রেঞ্চের উপর ভাসমান, আজকে আছি কোথায়, এটাও কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ। সাগরের এই জায়গাটার তলদেশের নাম এম্পেরোর সিমন্ট, এম্পেরোর সমুদ্রপাহাড়। নয় হাজার মিটার গভীরতা থেকে আস্তে আস্তে এখন সাগর দেড় হাজার মিটারে চলে এসেছে। তারমানে সমুদ্র গভীরতা কমে কমে সমুদ্রের নিচে পাহাড়ের মতো হয়ে আছে এখানটায়।

তিন তিনটা পাহাড় সাগরের এই অংশে কাছাকাছি।  সমুদ্রের নিচের দৃশ্যটা একবার কল্পনা করলে আরেকটা হিমালয় পর্বতশ্রেণী মনে হবে। পাহাড়গুলির চারপাশে গড় গভীরতা ছ’হাজার মিটারেরও বেশী। তবে আমরা যতোই আমেরিকার দিকে যাবো গভীরতা ততোই কমতে থাকবে।
ওশান হাইড্রোগ্রাফী তো পুরোদুস্তর একটা সাবজেক্টই আছে এসব নিয়ে। সমুদ্রের নিচে পাহাড় পর্বত, সমভূমি, মালভূমি সবই আছে, খালি নাই মানুষ।

আমরা এখন এগিয়ে চলছি উত্তর পূর্ব কোনাকোনি। এলিউশিয়ানটা শেষ হলেই সোজা দক্ষিণে নামা শুরু করবো। আমাদের গন্তব্য তো সাধের আমেরিকা না, বাউন্ডুলে মেক্সিকো। দুষ্টু  ড্রাগ ডিলারদের দেশে, ওয়েস্টার্ন সিনেমার দেশে। পোর্টের নামও শানদার, লাজারো কার্দিনাস।
পোর্টের নাম হয়েছে একজন আর্মি জেনারেলের নামে, বুঝে নিন এটাই মেক্সিকো।

এমএস ১৩ নামে বিপজ্জনক একটা গ্যাং আছে এই মেক্সিকো, গুয়েতেমালা আর সালভাদরে। ড্রাগ আর হিউম্যান ট্রাফিকিং এর জন্যে এরা বেশ কুখ্যাত। আমেরিকা এদের পিছে লেগেছে বেশ কিছুদিন হলো, ক্রসফায়ার অ্যাপ্লাই শুরু করেছে সেন্ট্রাল  আমেরিকায়। মেরে সাফা করে দিচ্ছে এই গ্যাংকে।

থাক এসব মারামারি বাদ, সমুদ্রে আছি, প্যাসিফিকেই থাকি। সবচেয়ে পূর্বের দেশ ধরে কোনটাকে নিয়ে বেশ আগ্রহ এখন পেয়েছি, দেশটির নাম কিরিবাতি টাইমজোন জিএমটি +১৪। ব্যাপারটা কিন্তু জটিল। ২৪ ঘন্টার দুনিয়ায় এরা ঘড়ির বারো ক্রস করে আরো দুইঘন্টা বেশী। দিনসূর্য এরা সবার আগে দেখবে এটাই তাহলে নিয়ত।

ধাঁধাঁ হলো,
কিরিবাতির নাম কেন বললাম?!
কিরিবাতি নাকি মিশরের রাজা তুতেনখামেন জয় করেছিলো।
কোথায় মিশর কোথায় কিরিবাতি, কোথায় লোহিতসাগর  আর কোথায় প্রশান্তমহাসাগর।
রানী তিয়ার হাতে রাজ্যপাট দিয়ে তুতেনখামেন তার নাবিকসামন্ত আর জাহাজ নিয়ে পূর্বদিকে রওয়ানা দেন।
প্রথম জয় করেন কর্দমাক্ত সূর্যের দেশ মালদ্বীপ, তারপরে ধীরে ধীরে চীন, কিরিবাতি আর শেষমেশ সেন্ট্রাল আমেরিকা আর পেরু, ইকুয়েডর।
ব্যাপারটা তাহলে এই দাঁড়ায়, মিশরের নাবিক রাজা তুতেনখামেন পিরামিড আর মমির টেকনিক এভাবেই আজটেক আর মায়া সভ্যতার কাছে হ্যান্ডওভার করেছিলো, কিরবিতি হয়ে। চীনেও কিন্তু পিরামিড আছে। কী মনে হয়? আমি নিজেও জানি না। সবই শোনাকথা।(চলবে)

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]