প্রশান্ত মহাসাগর পাড়ি

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

পোস্টবক্স। ফেইসবুকের একটি জনপ্রিয় গ্রুপ। এবার প্রাণের বাংলার সঙ্গে তারা গাঁটছড়া বাঁধলেন। প্রাণের বাংলার নিয়মিত বিভাগের সঙ্গে এখন থাকছে  পোস্টবক্স-এর রকমারী বিভাগ। আপনারা লেখা পাঠান পোস্টবক্স-এ। ওখান থেকেই বাছাইকৃত লেখা নিয়েই হচ্ছে আমাদের এই আয়োজন। আপনারা আমাদের সঙ্গে আছেন। থাকুন পোস্টবক্স-এর সঙ্গেও।

সুজল আহমেদ তালুকদার

চার.
এটা যদি পালতোলা জাহাজ হতো আর আমি হতাম পালতোলা জাহাজের নাবিক!!! তাহলে এখন ছাই রঙের সীগাল দেখে চিৎকার দিয়ে উঠতাম, উই আর নিয়ার বাই দা ল্যান্ড, ল্যান্ড দেখছি, ল্যান্ড দেখছি, এদিকে আয়। হয়তো চোখে দূরবীন দিয়ে খুঁজতাম কোন দ্বীপ নাহয় জেলে নৌকা। না, এরকম হয়না এখন, যান্ত্রিক জাহাজে আজকাল সিন্দাবাদরা একটু নরম শরম আর ভোলাভালা টাইপেরই হয়। তারা বাড়ী থেকে বেরিয়ে পরিবারকে ভুলে যায়না, কিংবা সারেং বৌদেরও পথচেয়ে অপেক্ষা করতে হয় না। নিয়মিত ফেসবুকে ছবি টবি দিয়ে দুনিয়া একাকার করে জানান দেয় আমরা আছি। কেউ আছি আটলান্টিকে কেউ প্যাসিফিকে কেউ আবার চিটাগাং আউটারে।

টানা ১৪ দিন কোন ল্যান্ডের দেখা পাইনি। জাহাজ জাপানের সুগারু চ্যানেল ছাড়ার পর কুয়াশা, সমুদ্রঝড় আর ঢেউয়ের দুলুনি খেয়ে আজ সকালে দিগন্তরেখায় হালকা ল্যান্ডের চিহ্ন দেখা গেলো। দুপুর গড়িয়ে বিকেলে পুরো পর্বতময় এক উপকূল চোখে ভেসে উঠলো। ছাই রঙের এই পাহাড়ী উপকূলই হলো ওয়েস্টার্ন মেক্সিকো। এ পাহাড়গুলির রঙ দেখেই আন্দাজ করা যায় এগুলি ভলকানো ইরাপশনে সৃষ্ট। কেমন ছাই ছাই একটা ভাব, আর পাহাড়গুলি খুব উঁচুও নয়। আমরা সন্ধ্যানাগাদ পোর্টের কাছাকাছি চলে আসলাম। গতকাল থেকেই একটা কনফিউশন ছিলো পোর্টে ঢুকবো কি ঢুকবো না। লোকাল এজেন্টের নামটায় একটা ইহুদী ইহুদী ভাব আছে, ইসরায়েল হার্নানদেজ। সে বারবার মেসেজ পাঠিয়ে বললো স্পীড কমাও, এতো তাড়াতাড়ি এসে লাভ নেই, আমরা রেডী না। আমরা কি আর তার কথা শুনি! আগে এসে তারপর জিজ্ঞেস  করলাম এখন কি করবো। সে পোর্ট থেকে পজিশন নিয়ে আমাদের নোঙর ফেলে বসে থাকতে বললো, বইসে থাক টাইপ। আমাদের মনে এখন প্যাসিফিক পাড়ি দেয়ার শান্তি, তীরের কাছে এসে শিপটাকেও একটু বিশ্রাম দেয়া হলো।

এই মুহূর্তে যে পোর্টের কাছাকাছি আছি তার নাম লাজারো কার্দেনাস, একজন মেক্সিকান জেনারেলের নামে নাম। সেন্ট্রাল আমেরিকার দেশগুলি আর মেক্সিকোর উপর আমেরিকার একটা প্রচ্ছন্ন আধিপত্য সবসময়েই ছিলো। এ কারনেই এখানে জেনারেলরা মাঝেমধ্যেই ক্ষমতায় বসে পরেন। লাজারো কার্দিনাস পোর্টে জনবসতি খুব একটা দেখতে পাচ্ছি না। হয়তো শুধুই একটা বন্দর আর তার প্রয়োজনীয় অবকাঠামো। তবে এর ধারে কাছেই সেই বিখ্যাত জালিস্কো প্রদেশ।

জালিস্কো পাহাড় পর্বতে ছেয়ে থাকা প্যাসিফিক ঘেষা প্রদেশ। জালিস্কো কেন এতো বিখ্যাত!!! ইন্টারেস্টিং বটে, বড় হয়ে যে টাকিলার নাম শুনেছি  সেই বিখ্যাত টাকিলার উৎপত্তিস্হল এই জালিস্কো। টাকিলা নামে যে জায়গাটি আছে এখানেই আগেভি পিনাস নামে বড় বড় আনারস হয়। এসব আনারসের মাঝে ব্লু আগেভি শুধুমাত্র ভলকানো সয়েলে হয়। আর এগুলো থেকে যে অ্যালকোহল হয় সেটাই পৃথিবীজোড়া খ্যাতি পেয়েছে। এই টাকিলা হলো মেক্সিকোর প্রাণভোমরা, একে আপনি টাকিলা বলেন আর তিকিলাই বলেন ওরা গর্ব করে এটা নিয়ে। এর পিছনেও আছে এক বড়সড় কাহিনী।

কোন এক ঝড়ের দিনে, অনেক অনেক দিন আগের গল্প বলছি, নুহারু গোত্রের কিছু মানুষ গিয়ে পাহাড়ের গুহায় আশ্রয় নেয়। প্রচুর বজ্রপাত হচ্ছিলো সেদিন, এখনও অবশ্য হচ্ছে। আজ রাতেও প্রচুর বজ্রসহ বৃষ্টি পড়ছে। তো সেদিনের সেই ঝড়ের রাতে একটা বজ্র গিয়ে পড়লো বিশাল আকারের ঐ ব্লু আভেগি আনারসের গায়ে। আনারস তো আগুনে পুড়ছে, পুড়ে পুড়ে রোস্টেড। ভোর হতেই ঝড় থেমে পরিষ্কার আকাশ, আনারসের চারপাশও পুড়ে বার বি কিউ। একজন গিয়ে একটু ধরে দেখলো, একটু ভেঙ্গে দেখলো, আরে ভিতরটা তো বেশ রসালো। একটু চেখে দেখলো খুব মিষ্টি, ঘ্রাণটাও মায়াবী। সবাইকে জুস করে খাওয়ালো সে সেটা। তারপর একটা পাত্রে কিছুটা রেখে ভুলে গেলো আভেগির জুসের কথা। পরে যখন ওখানটায় আবার এলো সে, দেখলো দারুণ একটা ঘ্রাণ, গিয়ে দেখলো সেই রসটার উপরে ফেনা জমে রঙটাও কেমন হয়ে গেছে। খেয়ে দেখলো সেরকম অ্যালকোহলিক আর টেস্টটাও দারুণ। সেই থেকে এ তল্লাটের মানুষ বিশ্বাস করে আজতেক গড তাদের এ বিশেষ পানীয় উপহার দিয়েছেন। আজতেক সভ্যতায় এ টাকিলার আছে বিশেষ স্হান। ঠাডা থেকেও হতে পারে অনেককিছু, প্রমাণ হলো টাকিলা।

এরপর যুগযুগ ধরে টাকিলা ছড়িয়ে পরেছে সারা পৃথিবী জুড়ে। এ টাকিলা নিয়ে দুটি পরিবারের লড়াইও হয়েছে কয়েকশত বছর। সাউজা আর কুয়েরবো পরিবার এ টাকিলার মালিকানা নিয়ে করেছে দীর্ঘ লড়াই। শেষমেশ সাউজা পরিবারের নাতি শিকাগো শহরে গিয়ে ভুলে বিয়ে করে বসে কুয়েরবো পরিবারের মেয়েকে। ব্যাস এ থেকেই মিলে যায় দু পরিবার। ওয়েস্টার্ন মুভির মতো ফাইট করতো এ দু’পরিবার, সিদ্ধান্ত হতো ডুয়েল ফাইটে। আজ এ দুটি নামই হয়ে আছে ব্রান্ডনেম অফ টাকিলা।

ট্রাম্প তার মেক্সিকো ওয়াল নাকি করেই ছাড়বে, মেক্সিকোও পরিকল্পনা এটেছে কৃত্রিম টাকিলা বৃষ্টি বানাবে। এতেই নাকি দুনিয়ার সব টুরিস্ট হুমড়ি খেয়ে পড়বে এখানে, তখন আমেরিকাকে তারা দেখে নেবে। সবই মেক্সিকানদের আকাশকুসুম কল্পনা। তবে টাকিলার মেঘ তারা বানিয়ে ফেলেছে, বৃষ্টিই নাকি হওয়া বাকি। এরপর আমেরিকানরাই মেক্সিকোতে হুমড়ি খেয়ে পরবে এটা তাদের বিশ্বাস। মেক্সিকানরা একটু বেশীই ক্ষেপে আছে। তাদের রিফিউজি বলে বেশ মনে কষ্ট দিয়েছে আমেরিকা। টেক্সাস, ক্যালিফোর্নিয়া এসব দক্ষিণের স্টেটগুলিতে ওরা যুগযুগ ধরে বাস করে আসছে। আর তারাই নাকি এখন রিফিউজি। আমেরিকার তাবাস্কো সস ওটাও তো মেক্সিকোর মরিচ দিয়েই হয়। এমন কোন রেস্টুরেন্ট নেই যেখানে আজকাল তাবাস্কো সস দেখা যায়না। মেক্সিকোর তাবাস্কো প্রদেশের মরিচ নিয়ে এখন এটার পেটেন্টই ডাকাতি করেছে লুজিয়ানা।
কতো বড় জোচ্চুরি। মেক্সিকোর মরিচ কিন্তু খুব বিখ্যাত। এখানকার ১২ পদের মরিচ সারা পৃথিবীজুড়ে পরিচিত। জালাপিনো, পোবলানো, হারবানেরো সব বহুলব্যবহৃত মরিচ।

মারিয়াচি গানের তালে তালে মেক্সিকান হ্যাট পরে এখানকার মানুষেরা ডান্স করতে বিশেষ পছন্দ করে। স্প্যানিশ আনন্দে মাতোয়ারা সংস্কৃতি আর মেক্সিকোর মারয়াচি মিউজিক মিলে অদ্ভুত আনন্দে ভাসে মানুষেরা। ওদের সঙ্গে মিশতে পারার আনন্দটাই অন্যরকম। এবার মারিয়াচি মিউজিক শুনতে হবে, হ্যাটটাও পরতে হবে। মেক্সিকো কী আজ জিতেই যাবে!!! মেক্সিকো তো জিতেই গেলো, মেক্সিকান ওয়েভই বলে দিচ্ছে মেক্সিকো জিতে গেছে। শুনেছি টাকিলা জার্মানদের খুব পছন্দের ড্রিংক।(চলবে)

ছবি: লেখক

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]