প্রশান্ত মহাসাগর পাড়ি

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

পোস্টবক্স। ফেইসবুকের একটি জনপ্রিয় গ্রুপ। এবার প্রাণের বাংলার সঙ্গে তারা গাঁটছড়া বাঁধলেন। প্রাণের বাংলার নিয়মিত বিভাগের সঙ্গে এখন থাকছে  পোস্টবক্স-এর রকমারী বিভাগ। আপনারা লেখা পাঠান পোস্টবক্স-এ। ওখান থেকেই বাছাইকৃত লেখা নিয়েই হচ্ছে আমাদের এই আয়োজন। আপনারা আমাদের সঙ্গে আছেন। থাকুন পোস্টবক্স-এর সঙ্গেও।

সুজল আহমেদ তালুকদার

পাঁচ

বিকেলে যখন পোর্ট ছাড়ছি সূর্য তখনও হেলে পড়েনি, গতকালের বৃষ্টির পর আজ আকাশ বেশ পরিষ্কার, লাভলি সানসাইন যাকে বলে।
পোর্ট ছাড়তে কেমন একটা মায়াবী অনুভূতি হলো, প্রায় একযুগ পরে মেক্সিকো এসেছি এবার।
উত্তর এমেরিকা আর সেন্ট্রাল এমেরিকার মেলবন্ধন এই মেক্সিকো।
জাহাজ পোর্ট থেকে বেরুতে মাত্র আধঘন্টা সময় নিলো, এরপরেই খোলা আকাশ, নীল সমুদ্র।

আমরা বামে টার্ণ নিলাম, সোজা দক্ষিণে যাবো।
পরের পোর্ট পুয়ের্তো কোয়েটজাল, নেটিভরা আদর করে ডাকে কেটসাল।
গুয়েতেমালা, ছোটবেলায় কেউ কেউ ফান করে বলতো তোরে এক্কেরে গুয়েতেমালা পাঠিয়ে দিবো,
এখন মেরিনের বন্ধুরা বলে হন্ডুরাস পাঠিয়ে দিবে।

হয়তো আমরা এটা মজা করেই বলি, কিন্তু প্রাচীন মায়া সভ্যতার উত্থান পতন এই গুয়েতেমালাতেই।
কতো হাজার বছর তা ঠিক বলা মুশকিল।
তবে প্রায় সাড়ে পাঁচ হাজার বছরের ইতিহাস পাওয়া যায় এ সভ্যতার।

কোয়াটজাল পাখির কথা বলেছিলাম এর আগে,
হ্যা পাখিটা খুব সুন্দর আর রহস্যময়।
কোয়েটজাল শব্দের অর্থ সেন্ট্রাল এমেরিকায় দাঁড়িয়েছে লিবার্টি।
মধ্য এমেরিকায় এ পাখিটি স্বাধীনতার প্রতীক, সার্বভৌমত্বের প্রতীক।
এ পাখিটি পৃথিবীর সুন্দরতম পাখিদের অন্যতম, সুন্দর লম্বা লেজ আর বাহারী রঙের কারুকাজ এ অপরূপ দেখতে।

তবে এ পাখিটির বিশেষত্ব হলো পুরো মায়া সভ্যতা জুড়ে এ পাখিটির অস্তিত্ব।
তারা কখনও এ পাখিটিকে বন্দী করতো না।
শুনেছি কোয়েতজাল বন্দীত্ব মেনে নেয় না, প্রয়োজনে আত্মাহুতি দিবে তাও বন্দীত্ব নয়।
মায়ানরা এ পাখির পালক পরে ঘুরে বেড়াতো, কিন্তু ওকে খাচায় বন্দী করতো না।

এবার নিয়ে যাই ১৫২৪ এ।
স্প্যানিশরা পুরো দুনিয়ায় রাজত্ব করছে তখন, বাকি আছে শুধু এই গুয়েতেমালা,  মায়ান রাজত্ব।
ধীরে ধীরে পাঁচ হাজার বছর পুরোনো সভ্যতা তখন সবকিছু হারিয়ে পুচকে এক ক্ষমতাহীন রাজ্য।
একসময়ের ইউকাতান উপদ্বীপ আর গুয়েতেমালা পাহাড়, সমতল মিলে বিশ্বের অন্যতম জনবহুল এক রাজ্য তখন জনশূন্য প্রায়।

অবিশ্বাস্য হলেও সত্য এ মায়ান রাজত্বে প্রায় শতাধিক শহর ছিলো, আর প্রতিটি শহরে ৫০ হাজারেরও বেশী জনসংখ্যা।
জনবহুল এক রাজত্ব এক সময়ে হঠাৎই জনশূন্য হয়ে পরে।
শেষদিকে মায়ানদের রাজা হন তিকুন উমান।
যুবরাজ থেকে রাজা, অল্পবয়েসী এ রাজা মায়ানদের রক্ষা করার চেষ্টা করেন জীবন দিয়ে।

স্প্যানিশদের সঙ্গে টিল দা দেথ লড়াই করেন এ যুবক রাজা।
শেষে পর্যন্ত একাই লড়াই চালিয়ে যান, লড়তে লড়তেই স্প্যানিশদের হাতে তিনি নিহত হন।

যুদ্ধের ময়দানে যখন তার দেহ লুটিয়ে মাটিতে পরে যায়, তখনও তিনি সম্মুখ সমরে ছিলেন, সামনে থেকেই মৃত্যুকে আলিঙ্গন করেন।
সেদিনও দৃশ্যপটে হাজির সেই কোয়েটজাল।
আচমকা উড়ে এসে তিকুন উমানের রক্তাক্ত বুকে এসে বুক মেলায় কোয়েটজাল পাখি।
তার বুকের রক্তে লাল হয়ে যায় কোয়েটজালের বুক।
মায়ান সভ্যতার শুরু থেকে পথচলা এ পাখিটি শেষদিনে এসে নিজেই রক্তাক্ত হয়ে যায়।
সেদিন থেকেই এ পাখিটির বুকের অংশ লাল।
লিবার্টি আর স্বাধীনতার মানেই কোয়েটজাল, তিকুন উমান।

তিকুন উমানের সেই রক্তলাল রঙ আজও বুকে নিয়ে ঘুড়ছে এ কোয়াটজাল।
আজও হার মানেনি সে।
প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম লিবার্টির মানেটা সে বুঝিয়ে দেয় এই মানুষগুলিকে।
তাইতো আবার স্বাধীন এ গুয়েতেমালা, পতাকায় কোয়েটজাল, মুদ্রায় কোয়েটজাল, হৃদয়ে কোয়েটজাল।

মায়ানদের বিশেষত্ব নিয়ে গল্প বলতে গেলে ফেসবুক ফুরিয়ে যাবে, গল্প ফুরোবে না।
তুতমেনখামুনের গল্প বলেছিলাম একবার।
মিশরের সেই সমুদ্রপাগল রাজা রানী তিয়াকে রাজকার্য বুঝিয়ে দিয়ে বেড়িয়ে পরেন সমুদ্র অভিযানে।
তিনিই হয়তো একসময় এ তল্লাটে এসে মানুষগুলিকে শিখিয়ে গেছেন পিরামিড আর মমির প্রযুক্তি।

মায়ানরা জ্যোতির্বিদ্যায় এতোটাই পারদর্শী ছিলেন যে আজকের ক্যালেন্ডার তাদেরই আবিষ্কার বলে ধারণা।
২৮ লক্ষ ৮০ হাজার দিনের ভবিষ্যত ওরা একে গিয়েছিলো ক্যালেন্ডারের পাতায়, শেষ হলো এইতো কিছুদিন আগে ২০১২ এ।
৩৬৫ এই সংখ্যাটাও ওরা বুঝিয়েছে পৃথিবীর মানুষকে।

অবাক সব কর্মকাণ্ড করতো এই মানুষেরা।
আজ যখন স্টীমবাথ নিতে আমরা ভাবি আহা কি শান্তি,
আর মায়ানরা এই স্টীমবাথের আবিষ্কার করে কয়েক হাজার বছর আগে।
প্লাস্টিক সার্জারি করে এরা নাক আর কপালের আকার পরিবর্তন করে নিতো।
চোখগুলি যেনো একটু লক্ষীটেরা টাইপের হয় এমন ছিলো তাদের পছন্দ।
কে জানে হয়তো এলিয়েনদের দেখে তাদেরও এলিয়েন হওয়ার ইচ্ছে হতো কিনা।

এখনও কিছু মায়ান নাকি বেঁচে আছে গুয়েতেমালায়, অনেকে তো বিশ্বাসই করে ওরা ইউকাতান উপদ্বীপে এখনও লোকচক্ষুর আড়ালে বসবাস করছে।
ওদের কাছে হয়তো অন্য কোন প্রযুক্তি চলে এসেছে, যা দিয়ে ওরা চলে গেছে অন্য কোন প্যারালাল ইউনিভার্সে।

ইউকাতানে নাকি ৫০ লক্ষেরও বেশী মায়ান আছে এমন হারিয়ে যাওয়া এক রাজত্বে।
কি সেই টেকনিক যাতে করে পৃথিবীতেই আছে ওরা, আর আমরা দেখিনা।
কল্পলোকের গল্পকথা শুনতে তো ভালোই লাগে, ভাবছি বসে গুয়েতেমালার কথা, মায়ানদের কথা।

একটু আগে বৌকে বললাম গুয়েতেমালায় টেবিল রানার খুব ভালো পাওয়া যায়,
মায়ানরা খাবার টেবিলে খুব সুন্দর এসব কাপড়ের রানার ব্যবহার করতো,
সেখান থেকেই এটা এখন হেরিটেজ এখানকার।
বলা শেষ হয়নি পুরোটা,
-তাহলে বাসার জন্য দুই সেট রানার নিয়া আসবা।
আমি মনে মনে ভাবি, এই না হলো ফিমেল জেন্ডার।
মাত্র কয়েকঘন্টা থাকবো এই পোর্টে,
বাইরে যাওয়া তো আকাশকুসুম কল্পনা, আর রানার সে তো দৌড়াচ্ছে।

কাল দুপুরে ইনশাল্লাহ্ পৌছে যাবো পুয়ের্তো কোয়েটজাল,
টুরিস্ট প্লেস হিসেবেই যার পরিচিতি।
জেড পাথরের অলংকারের জন্যও রয়েছে আলাদা পরিচিতি, তবে এটা আর বলিনি বৌকে,
তাহলে বলবে জেড পাথর তার বিশেষ পছন্দ, পাশে মেয়ে থাকলে বলবে, আমার জন্য না আনলে কিলামু…

ছবি: লেখক ও গুগল

 

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]